কালীগঞ্জে গভীর রাতে ব্যবসায়ী বাড়িতে দুর্বৃত্তদের হামলা, গৃহবধূ নিহত
প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ১৮:১৫ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

বৃষ্টিভেজা গভীর রাত। চারদিকে বিদ্যুৎহীন অন্ধকার। ঘড়ির কাঁটায় তখন প্রায় রাত ৩টা। গাজীপুরের কালীগঞ্জে একটি ব্যবসায়ী পরিবারের বাড়িতে ঢুকে তাণ্ডব চালিয়েছে একদল দুর্বৃত্ত। ডাকাতির উদ্দেশ্যে আসা ওই দলের সদস্যরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে পরিবারের তিন সদস্যকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে। এতে কামরুন নাহার (৩৫) নামে এক গৃহবধূ নিহত হয়েছেন। গুরুতর আহত হয়েছেন তাঁর স্বামী রড-সিমেন্ট ব্যবসায়ী মঞ্জুর মিয়া (৪১) ও মেয়ে সানজিদা আক্তার মিম (১৬)।
শনিবার (১৫ আগস্ট) ভোররাত ৩টার দিকে উপজেলার নাগরী ইউনিয়নের নগরভেলা গায়েনবাড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, রাতের বৃষ্টির মধ্যে ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল মুখে গামছা পেঁচিয়ে ও হাফপ্যান্ট পরা অবস্থায় এলাকায় প্রবেশ করে। তারা প্রথমে আশপাশের কয়েকটি বাড়ির বাসিন্দাদের বাইরে বের হতে বাধা দেয়। পরে মঞ্জুর মিয়ার বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে বাড়ির টয়লেটের ভেন্টিলেটর ভেঙে তারা ঘরে প্রবেশ করে।
ঘরে ঢুকেই দুর্বৃত্তরা চাপাতি ও ছুরি দিয়ে মঞ্জুর মিয়া, তাঁর স্ত্রী কামরুন নাহার ও মেয়ে সানজিদা আক্তার মিমের ওপর হামলা চালায়। তাঁদের চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসার চেষ্টা করলে হামলাকারীরা গুলি করার হুমকি দেয়। একই সঙ্গে বাইরে থাকা লোকজনকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছুড়তে থাকে।
একপর্যায়ে আশপাশের মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকলে হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
পরে স্বজন ও স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কামরুন নাহারকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। গুরুতর আহত মঞ্জুর মিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়েছে। স্বজনদের দাবি, তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক। আহত মেয়ে সানজিদা আক্তার মিমকেও ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
মঞ্জুর মিয়ার বড় ভাবি ষাটোর্ধ্ব আসমা বেগম বলেন, রাত আনুমানিক ৩টার দিকে দেবরের বাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে তাঁর স্বামী ও ছেলে ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তাঁর জা কামরুন নাহার মারা যান। গুরুতর আহত মঞ্জুর মিয়া ও মিমকে পরে ঢাকায় নেওয়া হয়।
মঞ্জুর মিয়ার চাচা সত্তরোর্ধ্ব নাছির ব্যাপারী বলেন, গভীর রাতে চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে হাতে টর্চ নিয়ে তিনি বাড়ির বাইরে বের হন। এ সময় একজন দুর্বৃত্ত তাঁকে দ্রুত ঘরের ভেতরে চলে যেতে বলে। বাইরে থাকলে গুলি করার হুমকিও দেওয়া হয়। পরে দুর্বৃত্তরা ইট ছুড়লে একটি ইট তাঁর ডান পায়ে লাগে। আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসতে শুরু করলে একপর্যায়ে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।
মঞ্জুর মিয়ার ভাই মোহন মিয়া বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি তাঁর ভাই ও ভাবিকে আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। দ্রুত তাঁদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক কামরুন নাহারকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে মঞ্জুর মিয়া ও তাঁর মেয়ে সানজিদাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়।
মোহন মিয়ার ধারণা, ডাকাতির উদ্দেশ্যেই দুর্বৃত্তরা বাড়িতে হামলা চালিয়েছে। তিনি জানান, একটি প্লট কেনার জন্য একটি সমিতি থেকে ২০ লাখ টাকা উত্তোলনের কথা ছিল। ওই টাকা উত্তোলন করা হয়েছিল কি না, তা তিনি নিশ্চিত নন। তবে টাকা উত্তোলনের খবর দুর্বৃত্তরা জেনে থাকতে পারে বলে তাঁদের ধারণা।
কালীগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান জানান, একদল দুর্বৃত্ত বাড়িতে প্রবেশ করে মঞ্জুর মিয়া, তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করে। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর মঞ্জুর মিয়ার স্ত্রী মারা যান। গুরুতর আহত মঞ্জুর মিয়া ঢাকার একটি হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
তিনি বলেন, বাড়ি থেকে কোনো অর্থ বা মালামাল লুট হওয়ার তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনাটি অত্যন্ত নৃশংস। খবর পেয়ে গাজীপুরের পুলিশ সুপার, জেলা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট, পিবিআই, ডিবি, সিআইডি ও কালীগঞ্জ থানা পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ঘটনার প্রকৃত কারণ ও জড়িতদের শনাক্তে তদন্ত চলছে।
নিহত কামরুন নাহারের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক দল কাজ করছে।
