হুমকি থেকে পদোন্নতি: বিসিএস ক্যাডারদের ডিঙিয়ে রেলওয়ের ‘শেখ ফরিদ’ সিন্ডিকেটের অবিশ্বাস্য উত্থান
প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৮:১৯ | অনলাইন সংস্করণ
ইমরান হোসেন

শাস্তির বদলে পুরস্কার! সরকারি চাকরি বিধিমালার সমস্ত রীতিনীতি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে (সিআরবি) একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে চলেছেন বিতর্কিত কর্মকর্তা শেখ ফরিদ।
প্রকাশ্য দিবালোকে এক ঠিকাদারকে কার্যালয়ের তিন তলা ভবন থেকে নিচে ফেলে দেওয়ার এবং 'জবাই' করার ঔদ্ধত্যপূর্ণ হুমকির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরও কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি তার বিরুদ্ধে। তীব্র গণঅসন্তোষের মুখে ঘটনা ধামাচাপা দিতে লোকদেখানো শাস্তিমূলক বদলি করা হলেও মাত্র তিন মাসের মাথায় ‘অদৃশ্য শক্তির’ জোড়ে পদোন্নতি (প্রমোশন) বাগিয়ে পুনরায় পূর্বাঞ্চলের মূলকেন্দ্রে ফিরে এসেছেন তিনি।
নয়িম অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার তালিকায় একাধিক সৎ ও দক্ষ বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা অপেক্ষমাণ থাকলেও তাদের ডিঙিয়ে শেখ ফরিদকে এই প্রমোশন ও আকর্ষণীয় পদায়ন দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে রেলওয়ের অভ্যন্তরে সাধারণ কর্মকর্তা ও বঞ্চিত ক্যাডারদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
ভিডিও ভাইরাল: শাস্তির নামে স্রেফ ‘আইওয়াশ’
অনুসন্ধানে জানা যায়, পাহাড়তলীর প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ে মালামাল সরবরাহকারী এক ঠিকাদারের সাথে বিল সংক্রান্ত দ্বন্দ্বে জড়ান শেখ ফরিদ। একপর্যায়ে তিনি সব ধরনের পেশাদারিত্ব ও আইনি তোয়াক্কা না করে ওই ঠিকাদারকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন এবং তিন তলার ছাদ থেকে নিচে ফেলে দেওয়ার সরাসরি হুমকি দেন। এই নৃশংস হুমকির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। ঠিকাদার সমিতি এবং সাধারণ কর্মচারীদের আন্দোলনের মুখে কর্তৃপক্ষ তাকে তাৎক্ষণিকভাবে চট্টগ্রাম থেকে বদলি করে। কিন্তু এই বদলি যে শাস্তি ছিল না, বরং পরিস্থিতি শান্ত করার একটি প্রশাসনিক ‘কৌশল’ বা ‘আইওয়াশ’ ছিল-তা প্রমাণিত হয় মাত্র ৯০ দিনের মাথায়।
বিসিএস ক্যাডাররা বঞ্চিত, নেপথ্যে ‘অদৃশ্য খুঁটি’
রেলওয়ের একাধিক প্রশাসনিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট শূন্য পদটিতে পদোন্নতির জন্য জ্যেষ্ঠতার ক্রমানুসারে নিয়মিত বেশ কয়েকজন বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা সম্পূর্ণ যোগ্য ছিলেন। কিন্তু রেলওয়ের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এবং মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন মহলের বিশেষ আশীর্বাদে যোগ্য কর্মকর্তাদের ফাইল আটকে রাখা হয়। নিয়মনীতি ও নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে অদৃশ্য এক প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে শেখ ফরিদকে পদোন্নতি দিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে (পূর্বাঞ্চল, পাহাড়তলী, চট্টগ্রাম)-এর সিনিয়র সহকারী বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী পদে পুনর্বাসিত করা হয়। রেলওয়ের অফিশিয়াল কর্মকর্তা তালিকায়ও বর্তমানে তার এই প্রভাবশালী পদের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
অতীতের দুর্নীতি ও বর্তমানের ‘লোভনীয়’ চেয়ার
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের কেনাকাটা ও সরঞ্জাম বিভাগে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম ও ভুয়া বিলের সাথে এই বলয়ের নাম অতীতেও একাধিকবার জড়িয়েছে। পাহাড়তলী সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক ও প্রকৌশল বিভাগের অধীনে থ্রি-ফেজ মোটর, বৈদ্যুতিক কন্ডেন্সার, ট্রেনের লাইটিং ও এসি বিভাগের খুচরা যন্ত্রাংশ ক্রয়ের নামে ভুয়া বিল তৈরি করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। ইতিপূর্বে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা কিছু অনুসন্ধানেও মালামাল না এনে অর্থ ছাড় করার নথিপত্র মিলেছে।
বর্তমানে সিনিয়র সহকারী বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী হিসেবে শেখ ফরিদের হাতে ন্যস্ত হয়েছে: আন্তঃনগর ও প্যাসেঞ্জার ট্রেনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (AC) সংস্কার ও নতুন বরাদ্দ। ট্রেনের লাইটিং-ফ্যান মেরামত ও কোটি কোটি টাকার বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনাকাটার সরাসরি তদারকি ও অনুমোদন। বিভিন্ন বড় বাজেটের বৈদ্যুতিক টেন্ডার প্রক্রিয়াকরণ।
রেলওয়ের ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের অভিযোগ, যে কর্মকর্তা প্রকাশ্য দিবালোকে ঠিকাদারকে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়ার হুমকি দিতে পারেন, তার অধীনে বর্তমান কেনাকাটার টেন্ডারগুলো একটি নির্দিষ্ট চক্রের কাছে পুরোপুরি জিম্মি হয়ে পড়েছে।
মুখ খুলছে না রেল কর্তৃপক্ষ
বিতর্কিত এক কর্মকর্তাকে কেন বিসিএস ক্যাডারদের ডিঙিয়ে প্রমোশন দেওয়া হলো এবং শাস্তিমূলক বদলির তিন মাসের মাথায় আবার চট্টগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ফিরিয়ে আনা হলো-এই বিষয়ে জানতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের উচ্চপদস্থ একাধিক কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে রাজি হননি। প্রশাসনের এই নীরবতা সিন্ডিকেটের উপস্থিতির দিকেই ইঙ্গিত করে।
সুশাসনের অভাব ও বিশেষজ্ঞ উদ্বেগ
সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেখ ফরিদের এই অবিশ্বাস্য পদোন্নতি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ রেলওয়েতে অপরাধের কোনো প্রকৃত শাস্তি হয় না; বরং তদবির ও সিন্ডিকেটের জোর থাকলে প্রমোশনই জোটে। যোগ্যতা ও সততা থাকা সত্ত্বেও বিসিএস ক্যাডারদের বঞ্চিত করার এই অপসংস্কৃতি রেলওয়েকে দিন দিন ধংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। প্রকাশ্য দিবালোকে ভিডিও ভাইরালের পরও যার গায়ে আইনি আঁচড় লাগে না, তার খুঁটির জোর এবং নেপথ্যের ‘অদৃশ্য প্রভাবশালীদের’ মুখোশ উন্মোচন করা এখন সময়ের দাবি।
শেখ ফিরিদদের সাথে মুটোফোনে যোগাযোগের এই বিষয় নিয়ে প্রতিবেদক যোগাযোগের চেষ্টা করিলে যোগাযোগে ব্যর্থ হন।
সুশাসন নিশ্চিত করতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অবিলম্বে এই বিতর্কিত পদোন্নতির ফাইল তলব করা এবং বঞ্চিত বিসিএস কর্মকর্তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া উচিত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
