স্তন ক্যানসার: সম্মেলিত আধুনিক চিকিৎসা ও সচেতনতা
প্রকাশ : ০৬ জুন ২০২৬, ১০:১৩ | অনলাইন সংস্করণ
অধ্যাপক ডা. ইয়াকুব আলী

স্তন ক্যানসারের সম্মেলিত আধুনিক চিকিৎসা রয়েছে। এর কারণ, লক্ষণ, শ্রেণীবিন্যাস, পারিবারিক ইতিহাস ইত্যাদি নিয়ে সচেতনে সম্যক জ্ঞান থাকা ও সচেতনতা তৈরি করা উচিত -
স্তন ক্যানসার কী?
স্তন ক্যানসার শুধু নারীর রোগ নয়, পুরুষেরও। তবে নারীর তুলনায় পুরুষের আক্রান্তের হার কম। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এ রোগের ঝুঁকি বাড়ে। আক্রান্তের প্রায় ৮০ শতাংশের বয়স ৫০ বছরের বেশি।
লক্ষণ :
স্তন ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ অনেক সময় শ্রেণিবিন্যাস স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে না। তবু কিছু সাধারণ উপসর্গ রয়েছে, যেগুলোর প্রতি সতর্ক থাকা প্রয়োজন। স্তনের কোনো অংশে চাকা চাকা ভাব বা গাঁট অনুভব হওয়া, স্তনের আকার বা আকৃতির পরিবর্তন, স্তনবৃন্ত ভেতরে ঢুকে যাওয়া বা এর আকৃতিতে অস্বাভাবিক পরিবর্তন, স্তনবৃন্ত থেকে রক্ত বা অন্য কোনো তরল নির্গমন, স্তনের ত্বকে র্যাশ বা কমলার খোসার মতো চামড়া হয়ে যাওয়া কিংবা বগলের নিচে গাঁট বা ফোলা এসবই সতর্ক সংকেত হতে পারে। এ ধরনের কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
শ্রেণিবিন্যাস :
চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে স্তন ক্যানসারকে কোষের উৎপত্তিস্থল ও গাঠনিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্যানসার দুধ উৎপাদনকারী লোবিউল আবৃত এপিথেলিয়াল কোষ থেকে উৎপন্ন হয়। সে অনুযায়ী এগুলোকে ডাক্টাল কারসিনোমা বা লোবুলার কারসিনোমা বলা হয়। এছাড়া ক্যানসারের গ্রেড দ্বারা কোষ কতটা অস্বাভাবিক তা বোঝানো হয় এবং স্টেজ দ্বারা শরীরের অন্য অংশে ক্যানসার ছড়িয়েছে কিনা, তা নির্ধারণ করা হয়। এই শ্রেণিবিন্যাস চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্তন ক্যানসারের ঝুঁকির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। নারী হওয়াই প্রধান ঝুঁকি, তবে বয়স বৃদ্ধি, পারিবারিক ইতিহাস, স্থূলতা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ, মেনোপজ-পরবর্তী হরমোন প্রতিস্থাপন থেরাপি, সন্তান না থাকা বা দেরিতে সন্তান গ্রহণ ইত্যাদিও ঝুঁকি বাড়ায়। কিছু জেনেটিক কারণও গুরুত্বপূর্ণ; যেমন পুরুষের ক্ষেত্রে কষরহবভবষঃবৎ ংুহফৎড়সব থাকলে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। এছাড়া ইজঈঅ১ ও ইজঈঅ২ জিনের পরিবর্তন থাকলেও ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
চিকিৎসা :
রোগ নির্ণয়ে আধুনিক চিকিৎসায় বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। ম্যামোগ্রাফি হলো এক্স-রে ভিত্তিক একটি বিশেষ পরীক্ষা, যার মাধ্যমে স্তনের ভেতরের অস্বাভাবিক পরিবর্তন শনাক্ত করা যায়। অনেক সময় ক্যানসার এত ছোট থাকে যে, হাতে অনুভব করা যায় না, কিন্তু ম্যামোগ্রাফিতে তা ধরা পড়ে। আল্ট্রাসনোগ্রাফি বিশেষ করে তরুণীর ক্ষেত্রে বা গাঁটের প্রকৃতি নির্ধারণে সহায়ক। সন্দেহজনক টিস্যু থেকে নমুনা সংগ্রহ করে বায়োপসি করার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে ক্যানসার নির্ণয় করা হয়। প্রয়োজনে এমআরআই-ও ব্যবহার করা হয়। ৫০ থেকে ৭০ বছর বয়সী নারীর নিয়মিত বিরতিতে ম্যামোগ্রাম করার পরামর্শ দেওয়া হয়, যদিও দেশভেদে নির্দেশিকা ভিন্ন হতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার সফলতার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। গড় হিসেবে স্তন ক্যানসারের পাঁচ বছর বেঁচে থাকার হার প্রায় ৮৫ শতাংশ বা তারও বেশি, বিশেষ করে যদি রোগটি প্রথম বা দ্বিতীয় পর্যায়ে ধরা পড়ে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে রোগের ধরন ও পর্যায় অনুযায়ী বিভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ক্যানসারযুক্ত অংশ অপসারণ করা হতে পারে, যা কখনও আংশিক (লাম্পেকটমি), আবার কখনও সম্পূর্ণ স্তন অপসারণ (মাস্টেকটমি) হিসেবে করা হয়। এর পাশাপাশি রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি, হরমোনাল থেরাপি এবং টার্গেটেড থেরাপি ব্যবহৃত হয়। এবং নিয়মিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এর ফলোআপে থাকতে হয়।
লেখক : অধ্যাপক ডা. মো. ইয়াকুব আলী, রেডিয়েশন ও মেডিক্যাল অনকোলজিস্ট, এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। থানা দরোগা রোড,,সাভার।
চেম্বার : আল-রাজি হাসপাতাল, (দ্বিতীয় তলা) ১২,ফার্মগেট, ঢাকা।
হটলাইন :০১৭৪৫৩৪৯৪১০, ০১৭৩২৪২৯৩৯০
