যুদ্ধ বন্ধে ইরানের নতুন শর্ত থেকে বিলিয়ন ডলার আয়ের সুযোগ
প্রকাশ : ২৯ মার্চ ২০২৬, ১৭:৩০ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ করতে চলতি সপ্তাহে কয়েকটি দাবি তুলে ধরেন ইরানের একজন কর্মকর্তা। এর মধ্যে একটি দাবি ইরান আগে কখনো তোলেনি। সেটি হলো- হরমুজ প্রণালির ওপর তাঁদের একক নিয়ন্ত্রণকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া।
অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি এখন ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। তারা এই পথটিকে শত কোটি ডলার আয়ের (বাৎসরিক) উৎস বানাতে চাইছে। পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপের ক্ষেত্র হিসেবেও প্রণালিটিকে ব্যবহার করতে চায় তেহরান।
বিশ্ব বাণিজ্যকে ব্যাহত করার ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালি কতটা কার্যকর তা চলমান যুদ্ধে প্রমাণ হয়েছে। ফলে এটি এখন তেহরানের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক প্রধান দিনা এসফান্দিয়ারি বলছেন, হরমুজ ঘিরে সফলতা দেখে সম্ভবত ইরান নিজেও কিছুটা অবাক হয়ে গেছে। এই যুদ্ধ থেকে তারা নতুন একটি শক্তির খোঁজ পেয়েছে। ভবিষ্যতে ঝামেলা তৈরি হলে হরমুজ প্রণালি বন্ধের সম্ভাবনাও প্রবল। এই শক্তিকে অর্থে রূপান্তর করাটা তাদের নতুন সামর্থ্য আবিষ্কারের অংশ।
ওয়াশিংটনও এই ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত শুক্রবার সতর্ক করে বলেছেন, ‘যুদ্ধ পরবর্তী অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হবে হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের টোল ব্যবস্থা চালুর প্রচেষ্টাকে মোকাবিলা করা।’ ফ্রান্সে জি-৭ বৈঠকের পর রুবিও বলেন, এটি (টোল ব্যবস্থা) শুধু অবৈধই নয়, বরং অগ্রহণযোগ্য এবং বিশ্বের জন্য বিপজ্জনক। সবার উচিত এটি মোকাবিলায় পরিকল্পনা তৈরি করা।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিও তাঁর আনুষ্ঠানিক প্রথম ভাষণে হরমুজের কৌশলগত গুরুত্বের প্রতি ইঙ্গিত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এই জলপথ অবরোধ করার সক্ষমতা বা সুবিধা অবশ্যই কাজে লাগানো উচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আগের দফার আলোচনাগুলোতে ইরান মূলত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির অধিকারের ওপর জোর দিয়েছিল। তখন হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি দাবিতে ছিল না।
ইরান এখন হরমুজ ঘিরে চাপ তৈরির কৌশলকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। দেশটির আইনপ্রণেতারা টোল আদায়ের উপায় সংক্রান্ত একটি বিল তৈরির কথা বিবেচনা করছেন। পাশাপাশি, সর্বোচ্চ নেতার একজন উপদেষ্টা যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে হরমুজ প্রণালির জন্য একটি নতুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলেছেন। এই নতুন ব্যবস্থার ফলে তেহরান তাদের শত্রুপক্ষীয় দেশগুলোর নৌ-চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারবে।
যুক্তরাষ্ট্রের নেভাল ওয়ার কলেজের আন্তর্জাতিক সমুদ্র চালাচল আইনের অধ্যাপক জেমস ক্রাস্কা বলছেন, আইন অনুযায়ী হরমুজ প্রণালির মতো কোনো আন্তর্জাতিক জলপথে উপকূলীয় রাষ্ট্রের ফি আদায়ের আইনি ভিত্তি নেই। এই প্রণালিতে ইরানের পাশাপাশি ওমানের জলসীমাও আছে। যেহেতু এটি আন্তর্জাতিক প্রণালি তাই সব দেশের জন্য ‘ট্রানজিট প্যাসেজ’ এর অধিকার প্রযোজ্য। এই অধিকার অনুযায়ী, কোনো বাধা ছাড়াই চলাচল করা যায়।
এই নিয়মগুলো মূলত জাতিসংঘের সমুদ্র আইন বিষয়ক কনভেনশনে নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের কেউই এই কনভেনশনের পক্ষ নয়। ফলে ইরান এখন সদস্যপদ না থাকার সুবিধাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে বলে মনে করছেন জেমস ক্রাস্কা।
আন্তর্জাতিক প্রণালি দিয়ে যাতায়াতের ক্ষেত্রে একক কোনো রাষ্ট্রের টোল আদায়ের নজির খুব একটা নেই। অধ্যাপক ক্রাস্কা জানান, উনবিংশ শতাব্দীতে ডেনমার্ক তাদের প্রণালিগুলো দিয়ে যাতায়াতের ওপর ট্রানজিট ফি আরোপ করেছিল। কিন্তু বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রতিবাদের মুখে তারা ১৮৫৭ সালে কোপেনহেগেন কনভেনশনে সম্মত হওয়ার মাধ্যমে টোল ব্যবস্থা স্থায়ীভাবে বিলুপ্ত করে।
সুয়েজ খালকে টেক্কা দিতে পারে
বিশেষজ্ঞরা হরমুজের টোল ব্যবস্থা কার্যকর হওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন। তবে এটি কার্যকর হলে ইরান যে রাজস্ব পাবে তা মিশরের সুয়েজ খালের আয়কে টেক্কা দিতে পারে। সম্ভাব্য আয়ের একটি হিসাব করার চেষ্টা করেছে সিএনএন। তারা দেখিয়েছে, স্বাভাবিক সময়ে হরমুজ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা হয়। যা বহন করতে বড় আকারের অন্তত ১০টি জাহাজ দরকার। প্রতিটি ট্যাঙ্কারের জন্য যদি ২০ লাখ ডলার ফি ধরা হয়, তাহলে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ডলার এবং মাসে প্রায় ৬০ কোটি ডলার আয় হতে পারে।
এর সঙ্গে এলএনজির চালানগুলো যোগ করলে রাজস্ব আয় মাসে ৮০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই পরিমাণ অর্থ ইরানের ২০২৪ সালে মাসিক তেল রপ্তানির প্রায় ১৫-২০ শতাংশের সমান। একটি স্বাভাবিক বছরে মিশর তাদের সুয়েজ খাল থেকে মাসে ৭০ থেকে ৮০ কোটি ডলার আয় করে। কিন্তু লোহিত সাগরে অস্থিরতার কারণে গত এক বছর এই আয় নাটকীয়ভাবে কমে গিয়েছিল।
ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক প্রধান দিনা এসফান্দিয়ারি বলছেন, হরমুজকে আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহারের পেছনে ইরানের অর্থনৈতিক চাপও একটি বড় কারণ হতে পারে। নানা নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের অর্থনৈতিক ঘাটতি তৈরি হয়েছে। টোল আদায়কে হয়তো তারা সেই ঘাটতি মেটানোর একটি পথ হিসেবে দেখছে।
বর্তমানে যেসব দেশের ওপর আন্তর্জাতিক নানা নিষেধাজ্ঞা আছে, সেগুলোর মধ্যে ইরান অন্যতম। তাদের ওপরে আছে রাশিয়া। দেশটি তেহরানের মিত্র হিসেবে পরিচিত।
আমার বার্তা/এমই
