লাতিন আমেরিকায় মাদক চক্রে আড়াল ‘নারীদের গোপন মিশন’

প্রকাশ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১১:০৮ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন

লাতিন আমেরিকার মাদক চক্রের আড়ালের প্রভাবশালী ভূমিকায় রয়েছেন নারীরা। অঞ্চলটি পুরুষ প্রধান হলেও এ জগতের মূল নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন নারীরা। মেক্সিকোর সেনাবাহিনী চলতি বছরের এক দুঃসাহসিক অভিযানে বিশ্বের অন্যতম মোস্ট-ওয়ান্টেড মাদক পাচারকারী নেমেসিও ওসেগুরা কারভ্যান্টস ওরফে এল মেনচোকে খুঁজে বের করে। জিলাস্কো অঞ্চলের একটি গোপন আস্তানায় বিশেষ বাহিনী অভিযান চালিয়ে তাকে খুঁজে বের করা হয়।

শনিবার (২৫ এপ্রিল) সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এ মাদকচক্রে নারীদের প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এল মেনচোর বিরুদ্ধে চালানো অভিযানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বছরের পর বছর পলাতক থাকা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো উভয় দেশের কাছে ওয়ান্টেড অপরাধীকে খুজে পাওয়া। এ অভিযুক্তের যার মাথার নির্ধারণ করা হয়েছিল দাম ১৫ মিলিয়ন ডলার। শেষ পর্যন্ত সেনারা তার এক প্রেমিকাকে অনুসরণ করেই পশ্চিম মেক্সিকোর তাপালপা এলাকার পাহাড়ি একটি গোপন আস্তানায় পৌঁছে যায়। এ এলাকাতেই তিনি লুকিয়ে ছিলেন।

কর্তৃপক্ষ ওই নারীর পরিচয় গোপন রাখলেও এই ঘটনা দেখায় যে লাতিন আমেরিকার মাদক চক্রের ভেতরের স্তরে নারীদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এই আন্ডারওয়ার্ল্ডে ‘মাচো’ সংস্কৃতি প্রবল অঞ্চলে নারীরা নানা ভূমিকায় জায়গা করে নিচ্ছে। ট্রফি স্ত্রী থেকে শুরু করে পাচারকারী, এমনকি অপরাধ সাম্রাজ্যের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

প্রতিবেদেন বলা হয়েছে, বন্দুকধারী বা মাঠপর্যায়ের সদস্যরা সাধারণত পুরুষ হলেও, কার্টেলের লজিস্টিকস ও আর্থিক দিক সামলাতে নারীরা অনেক সময় বেশি দক্ষ। বিশেষ করে যদি তারা কোনো শীর্ষ নেতার স্ত্রী হন তাহলে আরও প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন।

‘কোকেইনের রানি’

লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে আলোচিত নারী অপরাধীদের একজন হলেন গ্রিসেলডা বলাঞ্চো। তাকে ‘কোকেইনের রানি’ বলা হতো এবং নেটফ্লিক্সের সিরিজ গ্রিসেলডার মূল চরিত্র তিনি। ১৯৭০ ও ৮০-এর দশকে মিয়ামিরর ড্রাগ যুদ্ধে তার উত্থান ঘটে। তিনি একাধিক স্বামীর সঙ্গে মিলে অপরাধ সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। তার নেতৃত্বে কলম্বিয়া থেকে মায়ামিতে টন টন কোকেইন পাচার করা হতো।

তার কুখ্যাত মাদক সম্রাট পালবো এস্কোবার ও মেডেলিন কার্টেলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। তিনি বহু হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ছিলেন এবং তার নিষ্ঠুরতার জন্য কুখ্যাত ছিলেন। তবে শুধু সহিংসতা নয়, তার আসল শক্তি ছিল সংগঠন দক্ষতা। অর্থপাচার, সরবরাহ ব্যবস্থা, এমনকি লুকানো পকেটযুক্ত অন্তর্বাস তৈরির কারখানাও চালাতেন তিনি। মাদক পাচার সহজ করতে এসব কৌশল নিয়েছিলেন তিনি।

১৯৮৫ সালে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০০৪ সালে মুক্তির পর তাকে কলম্বিয়ায় পাঠানো হয়। এরপর ২০১২ সালে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

পরিবারভিত্তিক অপরাধে নারীর নেতৃত্ব

চিলির অ্যান্টনেলা মার্চেন্ট তার পরিবারের কার্টেল পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাদের চক্র বলিভিয়া থেকে কোকেইন এনে সান্টিয়াগোতে বিতরণ করত।

২০২৩ সালে আদালত তাকে এবং তার বাবাকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়। আদালত জানান, দলের নেতৃত্ব মূলত তার হাতেই ছিল। এটি প্রমাণ করে যে শুধু ছেলেরা নয়, মেয়েরাও পারিবারিক অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনা করতে পারে।

‘লা জেফা’- পর্দার আড়ালের ত্রাস

এল মেনচোর স্ত্রী রোজালিন্ডা গনজালেস ভালেনসিয়া ‘লা জেফা’ নামে পরিচিত ছিল। তিনি কার্টেলের আর্থিক কাঠামোর মূল ব্যক্তিদের একজন বলে ধারণা করা হয়। তার পরিবারের লস কুইনিস কার্টেল এবং জালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেলের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থার মতে, এই গ্রুপটি অর্থপাচার ও লজিস্টিক কার্যক্রম পরিচালনা করত।

২০১৮ সালে অর্থপাচারের অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও প্রমাণের অভাবে মুক্তি দেওয়া হয়। পরে ২০২১ সালে আবার গ্রেপ্তার এবং ২০২৩ সালে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। যদিও ২০২৫ সালে ভালো আচরণের জন্য মুক্তি পান।

‘বুচোনা’ সংস্কৃতি

‘বুচোনা’ শব্দটি মেক্সিকোর সিনালোয়া অঞ্চল থেকে এসেছে, যা কার্টেল নেতাদের গ্ল্যামারাস সঙ্গিনীদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। এর সবচেয়ে জলন্ত উদাহরণ হলো ইমা কর্নেল অ্যাস্পোরো। তিনি কুখ্যাত মাদক সম্রাট জোয়াকুইন ‍গুজমানের স্ত্রী। তিনি মডেলিং, ফ্যাশন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় থাকলেও, ২০২১ সালে তাকে অর্থপাচার ও মাদক সংক্রান্ত অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তাকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।