পাল্টাপাল্টি হামলা থামানোর ঘোষণা দিলো ইরান-ইসরায়েল

প্রকাশ : ০৯ জুন ২০২৬, ১০:২৫ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন:

কয়েক ঘণ্টার উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির পর পাল্টাপাল্টি হামলা থামানোর ঘোষণা দিয়েছে ইরান ও ইসরায়েল। সোমবার (৮ জুন) ভোর পর্যন্ত ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা চললেও পরে দুই পক্ষই নতুন কোনো বড় আক্রমণ চালায়নি। এতে মধ্যপ্রাচ্যে আরও বড় যুদ্ধের আশঙ্কা সাময়িকভাবে কমেছে, যদিও পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত নাজুক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

গত এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর এই প্রথম সরাসরি একে অন্যকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইরান ও ইসরায়েল। সংঘাতের সূত্রপাত হয় লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরায়েলের বিমান হামলার মধ্য দিয়ে। ইসরায়েলের দাবি, হামলার লক্ষ্য ছিল ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর একটি ঘাঁটি। তবে ওই হামলায় অন্তত দুজন নিহত ও ২০ জন আহত হন বলে জানিয়েছে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

বৈরুতে হামলার পরপরই তেহরান প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দেয়। এরপর ইরান কয়েক দফায় ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। তেল আবিবসহ বিভিন্ন এলাকায় সতর্ক সংকেত বেজে ওঠে ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়। ইসরায়েলের দাবি, অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্রই প্রতিহত করা হয়েছে।

ইরানের হামলার জবাবে ইসরায়েলও পাল্টা আক্রমণ চালায়। দেশটির বিমান বাহিনী ইরানের মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ও একটি গুরুত্বপূর্ণ পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে বা রাসায়নিক কারখানায় হামলা চালায়। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, হামলায় কারুন পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানির স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পরে ‘প্রতিশোধ’ হিসেবে ইসরায়েলের হাইফায় একটি পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে হামলা চালায় ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী (আইআরজিসি)। একই সময়ে ইরান দাবি করে, তারা দক্ষিণ ইসরায়েলের কয়েকটি বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন ইসরায়েল জানায়, ইয়েমেন থেকেও একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে, যা আকাশেই ধ্বংস করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠী ওই হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল।

তবে কয়েক দফা হামলা-পাল্টা হামলার পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে শান্ত হতে শুরু করে। সোমবার (৮ জুন) সকাল নাগাদ নতুন কোনো বড় আক্রমণের খবর পাওয়া যায়নি। উভয় পক্ষের বক্তব্যেও সরাসরি যুদ্ধ সম্প্রসারণের বদলে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার প্রবণতা দেখা গেছে।

সংঘাত থামাতে পর্দার আড়ালে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ইরান ও ইসরায়েল- দুই পক্ষকেই সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানান। এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরান তাদের বার্তা পৌঁছে দিয়েছে, এখন তাদের আলোচনার টেবিলে ফিরে আসা উচিত। একই সঙ্গে তিনি ইসরায়েলকেও উত্তেজনা আর না বাড়ানোর আহ্বান জানান।

যদিও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজন হলে সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, ভবিষ্যতে হামলা হলে তেহরান জবাব দিতে প্রস্তুত।

এই সংঘাতের পেছনে শুধু ইরান ও ইসরায়েলের বিরোধ নয়, লেবাননে হিজবুল্লাহকে ঘিরে চলমান উত্তেজনাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় লেবানন সীমান্তে একটি যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। হিজবুল্লাহ ও ইরান উভয়েই সেই সমঝোতা প্রত্যাখ্যান করেছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, সর্বশেষ সংঘর্ষ আপাতত থেমে গেলেও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনো অস্থির। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি, লেবানন সীমান্ত এবং ইরান-সমর্থিত আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোকে ঘিরে উত্তেজনা রয়ে গেছে। ফলে যেকোনো সময় নতুন কোনো ঘটনা আবারও সংঘাত উসকে দিতে পারে।

তবে কয়েক ঘণ্টার তীব্র উত্তেজনার পর ইরান ও ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি হামলা বন্ধ হওয়া মধ্যপ্রাচ্য এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার- উভয়ের জন্যই আপাতত স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল