বহুপাক্ষিকতা, ফিলিস্তিন ও বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের নতুন আহ্বান

জাতিসংঘে মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বার্তা

প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩৯ | অনলাইন সংস্করণ

  রানা এস এম সোহেল

বিশ্বব্যাপী আস্থা সংকট, সংঘাত, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, প্রযুক্তিগত বৈষম্য ও আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের প্রশ্নে যখন জাতিসংঘ নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, ঠিক সেই সময়ে ৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে মালয়েশিয়া বহুপাক্ষিকতার পুনর্গঠন ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় অধিকতর জবাবদিহিতার জোরালো আহ্বান জানিয়েছে। 

গত ২৬ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে সাধারণ বিতর্কে মালয়েশিয়ার পক্ষে জাতীয় বিবৃতি উপস্থাপন করেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাতুক সেরি উতামা হাজি মোহামাদ হাসান।

এবারের সাধারণ পরিষদের প্রতিপাদ্য ছিল —“Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All”—এই প্রতিপাদ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মোহামাদ হাসানের বক্তব্যে উঠে আসে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতি আস্থা পুনর্গঠন, আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখা এবং জাতিসংঘকে আরও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার প্রয়োজনীয়তা। তিনি বলেন, বিশ্বের অধিকাংশ দেশই বড় শক্তি নয়; কিন্তু অল্প কয়েকটি দেশের সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে বিশ্বের সব দেশের ওপর। তাই মধ্যম শক্তির দেশ এবং আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও সক্রিয় ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। 

মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ব্যবস্থা সংস্কারের দাবি। তাঁর মতে, শুধু নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য সংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; বিশেষ করে মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে ভেটো ব্যবহারের বিষয়টি কঠোরভাবে প্রশ্নের মুখে আনতে হবে। তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের রেজুলেশন ৭৬/২৬২-কে ভেটো ব্যবহারের বিষয়ে জবাবদিহি বাড়ানোর একটি ভিত্তি হিসেবে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল—নিরাপত্তা পরিষদের অচলাবস্থা যেন জাতিসংঘের সামগ্রিক অচলাবস্থায় পরিণত না হয়।

ফিলিস্তিন প্রসঙ্গ ছিল বক্তব্যের কেন্দ্রীয় বিষয়। মালয়েশিয়া ফিলিস্তিনের পূর্ণাঙ্গ জাতিসংঘ সদস্যপদের পক্ষে তার  অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং গাজা ও অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক নীতিমালা কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। মালয়েশিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক আইন নির্বাচিতভাবে প্রয়োগ করার সুযোগ নেই; জবাবদিহি ও মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে একই নীতি সবার জন্য প্রযোজ্য হওয়া উচিত। 

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়েও সতর্ক করেছেন মোহামাদ হাসান। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও জ্বালানি রুটে অস্থিরতার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না; খাদ্য, জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে এর প্রভাব দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাধারণ পরিবার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। উত্তেজনা কমিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের পথে যাওয়ার আহ্বানও জানায় মালয়েশিয়া।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা। মালয়েশিয়া মনে করে, কয়েকটি রাষ্ট্র বা করপোরেশনের হাতে কেবল এআই-সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণ সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এআই প্রযুক্তির নীতিনির্ধারণ ও উদ্ভাবনে অংশীদার করার ওপর জোর দেন মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণের জন্য ব্যবহারের এবং গ্লোবাল সাউথকে শুধু তথ্যকেন্দ্র বা বাজারে পরিণত না করার আহ্বান উঠে আসে।

সব মিলিয়ে ৮১তম সাধারণ পরিষদে মালয়েশিয়ার বক্তব্যে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়েছে—আন্তর্জাতিক আইনের সার্বজনীন প্রয়োগ, জাতিসংঘের সংস্কার এবং গ্লোবাল সাউথের অধিকতর অংশগ্রহণ। একই সঙ্গে ASEAN-কে বৈশ্বিক আলোচনায় আঞ্চলিক স্বার্থ ও মতামত তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরেছে কুয়ালালামপুর। মোহামাদ হাসানের ভাষ্যমতে, মধ্যম শক্তির দেশগুলো শুধু অন্যদের সিদ্ধান্তের ফল ভোগ করবে না; বরং বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গঠনের প্রক্রিয়ায় নিজেদের ভূমিকা আরও জোরদার করবে।

এই অবস্থান আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে মালয়েশিয়ার বহুপাক্ষিক ও সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকার ধারাবাহিকতাকেই তুলে ধরে। বিশেষ করে ফিলিস্তিন, আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ সংস্কার, এআই শাসন ও গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে কুয়ালালামপুর যে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক আলোচনায় নিজের কণ্ঠ আরও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরছে, ৮১তম সাধারণ পরিষদে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য তারই একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন।