স্বীয় কর্মে নন্দিত আজও এক মহিয়ষী নারী : কে এই ভিকারুণ নেসা নুন?

প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫৭ | অনলাইন সংস্করণ

  জ. ই. বুলবুল

ভিকারুণ নিসা নুন স্কুল এন্ড কলেজ চিনেন না এমন কেউ বাংলাদেশে খুব কমই আছে। ঢাকার বেইলি রোডের এই বিখ্যাত মেয়েদের স্কুলটি আজ দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ। হাজার হাজার মেয়ে এখান থেকে পড়াশোনা করে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রশাসক, শিক্ষক হয়ে উঠছে। কিন্তু যাঁর নামে এই স্কুল, সেই মহীয়সী নারী ভিকার-উন-নিসা নুন (লেডি নুন) কে ছিলেন? কেমন ছিল তাঁর জীবন? কেন একজন অস্ট্রিয়ান নারী বাংলাদেশের শিক্ষা-ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন? আজ সেই অজানা, অবিশ্বাস্য গল্পটা বলছি—যা পড়তে পড়তে আপনি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যাবেন।

১৯২০ সালের জুলাই মাস। অস্ট্রিয়ার এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেন ভিক্টোরিয়া (কেউ কেউ বলেন ভিক্টোরিয়া রেখা)। শৈশব-কৈশোর কেটেছে ইংল্যান্ডে। তিনি নিজেকে “ইংরেজ মেয়ে” বলেই পরিচয় দিতেন। শিক্ষিত, স্বাধীনচেতা, আধুনিক। তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে, এই মেয়েটিই একদিন পাকিস্তান আন্দোলনের অগ্রণী নারী হয়ে উঠবেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী হবেন এবং দুই পাকিস্তানের (পূর্ব ও পশ্চিম) মেয়েদের শিক্ষার জন্য অমর কীর্তি রেখে যাবেন।

১৯৪৫ সাল। লন্ডনে ভারতীয় হাইকমিশনার স্যার ফিরোজ খান নুন-এর সঙ্গে পরিচয়। ফিরোজ খান তখন ব্রিটিশ ভারতের একজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ—নাইট উপাধিধারী, অক্সফোর্ডপড়ুয়া, পাঞ্জাবের বিখ্যাত নুন পরিবারের সন্তান। বয়সের পার্থক্য ২৭ বছর হলেও দুজনের মধ্যে গড়ে উঠল গভীর বন্ধন। বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) তে বিয়ে হলো। বিয়ের পর ভিক্টোরিয়া ইসলাম গ্রহণ করলেন। নাম বদলে হলো ভিকার-উন-নিসা—যার অর্থ “নারীদের শ্রেষ্ঠত্ব”। এরপর থেকে তিনি “লেডি নুন” বা “বেগম নুন” নামে পরিচিত।

স্বামীর সঙ্গে তিনি চলে এলেন লাহোরে। ফিরোজ খান তখন ভাইসরয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল থেকে পদত্যাগ করে মুসলিম লীগের হয়ে পাকিস্তান আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। আর ভিকার-উন-নিসা? তিনি শুধু স্ত্রী নন, হয়ে উঠলেন স্বামীর রাজনৈতিক সঙ্গী, সহযোদ্ধা, অনুপ্রেরণা। পাঞ্জাব প্রাদেশিক মুসলিম লীগের নারী শাখার সদস্যা হলেন। মেয়েদের নিয়ে দল গড়লেন। জেলায় জেলায় ঘুরে প্রচার চালালেন। ১৯৪৭ সালের সিভিল ডিসঅবিডিয়েন্স মুভমেন্টে (খিজর হায়াত তিওয়ানার ব্রিটিশ-সমর্থিত মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে) তিনি নেতৃত্ব দিলেন। মিছিল, প্রতিবাদ, আন্দোলন—তিনবার গ্রেফতার হয়েছেন, কিন্তু দমেননি একবারও। পার্টিশনের সময় লাখো শরণার্থীর সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। রেড ক্রস (পরে রেড ক্রিসেন্ট) এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচিয়েছেন।

১৯৫০ সালে ফিরোজ খান নুন পূর্ববাংলার (পূর্ব পাকিস্তানের) প্রথম পাকিস্তানি গভর্নর নিযুক্ত হন। লেডি নুনও চলে আসেন ঢাকায়। এখানেই তাঁর জীবনের অন্যতম বড় অবদান শুরু হয়। তিনি দেখলেন—পূর্ববাংলার মেয়েদের আধুনিক শিক্ষার সুযোগ খুবই কম। ১৯৫০ সালে রমনা জিমখানায় একটি ছোট প্রিপারেটরি স্কুল দেখতে গিয়ে মুগ্ধ হন। তিনি নিজে পৃষ্ঠপোষকতা নেন। ১৯৫২ সালের ১৪ জানুয়ারি স্কুলটি বেইলি রোডে স্থানান্তরিত হয় এবং তাঁর নামে নামকরণ হয়—ভিকারুণ নিসা নুন স্কুল। প্রথমে মাত্র কয়েকজন শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু। আজ সেই স্কুলটি ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় শাখা নিয়ে হাজার হাজার মেয়েকে আলোকিত করছে। ১৯৭৮ সালে কলেজ শাখা চালু হয়। আজ এটি বাংলাদেশের সেরা মেয়েদের বিদ্যাপীঠগুলোর একটি।

শুধু ঢাকায় নয়। পশ্চিম পাকিস্তানেও (রাওয়ালপিন্ডিতে) তিনি আরেকটি মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। মেয়েদের উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি “ভিকি নুন এডুকেশনাল ফাউন্ডেশন” গড়ে তোলেন। এর মাধ্যমে অসংখ্য পাকিস্তানি ছাত্রী অক্সফোর্ড-ক্যামব্রিজে পড়ার সুযোগ পায়। তাঁর স্বপ্ন ছিল—পূর্ববাংলার মেয়েরাও যেন বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারে।

রাজনীতিতে শুধু স্বামীর ছায়া নন, তিনি নিজেই ছিলেন কূটনীতিক। ১৯৫৬ সালে গোয়াদর বন্দরকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার পেছনে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। লন্ডনে গিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট, হাউস অব লর্ডস এবং এমনকি উইনস্টন চার্চিলের সঙ্গে লবিং করেন। ওমানের সুলতানের কাছ থেকে গোয়াদর কেনার চুক্তি সম্পন্ন হয় তাঁরই অক্লান্ত প্রচেষ্টায়। ১৯৫৭-৫৮ সালে স্বামী পাকিস্তানের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হলে তিনি প্রথম মহিলা হিসেবে দেশের প্রথম লেডি হন।

স্বামীর মৃত্যুর (১৯৭০) পরও তিনি থেমে যাননি। ১৯৭৮ সালে পাকিস্তান ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের চেয়ারপার্সন ও মন্ত্রী পদে দায়িত্ব পালন করেন। “ফ্রম মেমরি” নামে আত্মজীবনী লিখেছেন। ১৯৫৯ সালে পাকিস্তান সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার নিশান-ই-ইমতিয়াজ প্রদান করে।

২০০০ সালের ১৬ জানুয়ারি ইসলামাবাদে তিনি পরলোকগমন করেন। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন আজও বেঁচে আছে—প্রতিদিন ভিকারুণ নিসা নুন স্কুলের মেয়েরা যখন ক্লাসে বসে, যখন তারা বিশ্ব জয় করতে বের হয়, তখন সেই অস্ট্রিয়ান নারীর হৃদয়ের স্পন্দন অনুভব করা যায়।

ইতিহাস শুধু রাজা-বাদশাহ আর যুদ্ধের কথা বলে না। ইতিহাস বলে সেইসব মানুষের কথা, যাঁরা নীরবে দেশ গড়েন, সমাজ বদলান, ভবিষ্যৎ তৈরি করেন। ভিকার-উন-নিসা নুন সেই মানুষ। একজন বিদেশিনী হয়েও তিনি পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মেয়েদের শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের জন্য যা করেছেন, তা অতুলনীয়।

তাই পরের বার যখন ভিকারুণ নিসা নুন স্কুলের সামনে দিয়ে যাবেন, একটু থেমে ভাববেন—এই স্কুলের পেছনে একজন অসাধারণ নারীর স্বপ্ন, সাহস ও ত্যাগ লুকিয়ে আছে। আমাদের ইতিহাস পড়া জরুরি, কারণ প্রত্যেক মহৎ কাজের পেছনে থাকে কোনো না কোনো অদেখা নায়ক-নায়িকা। ভিকারুণ নেসা নুন তাঁদেরই একজন।

জয় হোক তাঁর স্মৃতির। জয় হোক মেয়েদের শিক্ষার।
 

তথ্য উপাত্ত নিয়ে লিখেছেন
 *জ. ই, বুলবুল।( সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক)