ভূমি ও কৃষিজমির অপব্যবহারের সর্বোচ্চ শাস্তি তিন বছরের জেল
অধ্যাদেশ জারি
প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:০১ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন

ভূমি ও কৃষিজমি অপব্যবহারের সর্বোচ্চ শাস্তি তিন বছরের জেল বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রেখে 'ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৬' জারি করা হয়েছে।
গত ১৯ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি এ অধ্যাদেশ জারি করেছেন। আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ থেকে অধ্যাদেশের গেজেট জারি করা হয়েছে। রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় এ অধ্যাদেশ প্রযোজ্য হবে না।
যে অপরাধে যে শাস্তি
অধ্যাদেশে বলা হয়, অনুমোদন ছাড়া কোনো ভূমির জোন পরিবর্তন করলে সর্বোচ্চ ছয় মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড পেতে হবে।
অনুমোদন ছাড়া কৃষিভূমি অকৃষি কাজে ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ এক বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে।
কৃষিভূমি, জলাধার বা জলাভূমিতে বাণিজ্যিক আবাসন, রিসোর্ট, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কারখানা বা অনুরূপ স্থাপনা কিংবা অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ চার লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
ইটভাটায় বা অন্য কোনো কাজে ব্যবহারের জন্য কৃষিভূমির উপরিভাগের মাটি (টপ সয়েল), পাহাড় ও টিলা অথবা জলাধারের পাড়ের মাটি ক্রয়, বিক্রয়, অপসারণ, পরিবহন বা ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ দুই বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে।
বিশেষ কৃষি অঞ্চলের ভূমির ক্ষতিসাধন, ভূমিরূপ পরিবর্তন বা কৃষি ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ তিন বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের পাশাপাশি অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ ও সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া যাবে বলে অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
জলাধার, জলাভূমি, পাহাড় ও টিলা এবং বন ও বনভূমির ক্ষতিসাধন ও ভূমিরূপ পরিবর্তনের অপরাধগুলোকে অ-আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য ও অ-আপসযোগ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইনের একই প্রকৃতির অপরাধের জন্য নির্ধারিত দণ্ডের বিধান অনুসরণ করা হবে। পাশাপাশি অতিরিক্তভাবে ক্ষতিপূরণ আদায়, ভূমির প্রকৃতি পুনঃস্থাপন, অবৈধভাবে ভরাট করা মাটি ও স্থাপনা অপসারণ এবং বৃক্ষরোপণসহ প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে অধ্যাদেশে।
ভূমিকে ১৮টি জোনে ভাগ করে হবে জোনিং ম্যাপ
সরকার কৃষিভূমি সুরক্ষা এবং ভূমির পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে সারাদেশে ভূমি ব্যবহার জোনিং ম্যাপ প্রণয়ন করবে। এই অধ্যাদেশ কার্যকর হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব মৌজা, দাগ বা নির্দিষ্ট সীমারেখা অনুযায়ী জোনিং ম্যাপ তৈরি করা হবে। একই সঙ্গে এ–সংক্রান্ত একটি ডাটাবেজ তৈরি, সংরক্ষণ ও নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে বলে জানানো হয়েছে অধ্যাদেশে।
জোনিং ম্যাপ একযোগে পুরো দেশের জন্য বা প্রয়োজন অনুযায়ী কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দিয়ে ধাপে ধাপে প্রণয়ন করা যাবে। ম্যাপ তৈরির সময় মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের গবেষণা ও পরীক্ষার ফল বিবেচনায় নেওয়া হবে।
ভূমিকে ১৮টি জোনে ভাগ করে এ ভূমি জোনিং ম্যাপ করা হবে। জোনগুলোর মধ্যে রয়েছে- কৃষি অঞ্চল, বিশেষ কৃষি অঞ্চল, কৃষি-মৎস্য চাষ অঞ্চল, নদী ও খাল অঞ্চল, জলাশয়, জলাধার ও জলাভূমি অঞ্চল, পরিবহন ও যোগাযোগ অঞ্চল, শহুরে আবাসিক অঞ্চল, গ্রামীণ বসতি অঞ্চল, মিশ্র ব্যবহার অঞ্চল, বাণিজ্যিক অঞ্চল, শিল্প অঞ্চল, প্রাতিষ্ঠানিক ও নাগরিক সুবিধা অঞ্চল, বন ও রক্ষিত এলাকা অঞ্চল, প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা বা প্রতিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকা, সাংস্কৃতিক-ঐতিহ্য অঞ্চল, পাহাড় ও টিলা অঞ্চল, পতিত ভূমি অঞ্চল এবং অন্যান্য অঞ্চল।
খসড়া জোনিং ম্যাপ প্রস্তুত হলে জনসাধারণের মতামত জানার জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে। ডেটা সংরক্ষণের ওয়েবলিংক উল্লেখ করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ওয়েবসাইট ও নোটিশ বোর্ডে তা প্রকাশ করা হবে। বিধি অনুযায়ী ফি দিয়ে যে কেউ খসড়া ম্যাপের কপি সংগ্রহ করতে পারবেন। পাশাপাশি এসব কার্যালয়ে খসড়া ম্যাপ জনসাধারণের পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে।
বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে যে কেউ খসড়া ম্যাপের বিষয়ে লিখিত আপত্তি বা মতামত জেলা প্রশাসকের কাছে দিতে পারবেন। এসব আপত্তি বা মতামত নিষ্পত্তির জন্য জেলা কমিটির কাছে পাঠানো হবে। জেলা কমিটি প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতিবেদন নেবে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির শুনানি করবে এবং সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সিদ্ধান্ত দেবে।
জেলা কমিটির সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ হলে সিদ্ধান্তের তারিখ থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সরকারের কাছে আপিল করা যাবে। সরকার নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আপিল নিষ্পত্তি করবে এবং সে সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। সব প্রক্রিয়া শেষে সরকার গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে চূড়ান্ত জোনিং ম্যাপ প্রকাশ করবে।
সরকার স্পারসোর সহায়তায় ও নিজস্ব প্রযুক্তি ব্যবহার করে জোনিং ম্যাপের তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করবে এবং প্রতি ১০ বছর অন্তর ম্যাপ হালনাগাদ করবে। জোনিংয়ের পর স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে এবং জোনিং ম্যাপের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা হবে। এ কাজে নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনাবিদ, ভূমি ব্যবহার বিশেষজ্ঞ, আইটি, জিআইএস ও রিমোট সেন্সিং বিশেষজ্ঞ, কৃষি ও মৎস্য বিশেষজ্ঞ, আইন ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করা হবে বলেও জানানো হয়েছে অধ্যাদেশে।
খসড়া জোনিং ম্যাপের আপত্তি নিষ্পত্তির জন্য জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে জেলা কমিটি গঠন করা হবে।
কৃষিভূমি সুরক্ষা
অধ্যাদেশে বলা হয়, জোনিংয়ের ভিত্তিতে কৃষিভূমি সুরক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। খাদ্য নিরাপত্তার গুরুত্ব বিবেচনায় বিশেষ কৃষি অঞ্চল ঘোষণা করা যেতে পারে। এসব অঞ্চলে ভূমির ব্যবহার পরিবর্তন বা অকৃষি কাজে ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকবে। বিশেষ কৃষি অঞ্চল না হলেও দুই বা ততোধিক ফসলি কৃষিভূমি অকৃষি কাজে ব্যবহার করা যাবে না। তিন বা ততোধিক ফসলি জমিতে তামাক চাষ নিষিদ্ধ থাকবে এবং এক ও দুই ফসলি জমিতেও ধাপে ধাপে তামাক চাষ সীমিত করা হবে।
জাতীয় প্রয়োজনে জ্বালানি, খনিজ বা প্রত্নসম্পদ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ প্রভাব নিরূপণের শর্তে সীমিত পরিমাণ কৃষিভূমি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। তবে আগে অধিগ্রহণ করা অব্যবহৃত জমি ব্যবহারে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং মোট কৃষিভূমির ১০ শতাংশের বেশি অকৃষি কাজে ব্যবহার করা যাবে না।
কৃষিভূমি, পাহাড়, টিলা বা জলাধারের উপরিভাগের মাটি ক্রয়-বিক্রয়, অপসারণ বা ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে জলাধার বা জলাভূমি ভরাট, পাহাড় কাটা কিংবা প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করা যাবে না। এসব কাজে জড়িত হলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং দায়ীদের ক্ষতিগ্রস্ত জমি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে বা অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করতে হবে।
সরকার উপকূলীয় ও সাগরসংলগ্ন ভূমি সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। বিধি অনুযায়ী কৃষিভূমি অকৃষি কাজে ব্যবহারের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা যাবে। কোনো ভূমির রেকর্ডীয় শ্রেণি পরিবর্তন করতে হলে পূর্বানুমোদন নিতে হবে।
কৃষিভূমিতে আবাসন-অবকাঠামো নির্মাণ
সরকারি বা বেসরকারি সব প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এ অধ্যাদেশের বিধান মানা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
অধ্যাদেশে বলা হয়, নির্ধারিত অনুমতি সাপেক্ষে কেউ নিজস্ব কৃষিভূমিতে বসতবাড়ি, উপাসনালয়, কবরস্থান, গুদামঘর, পারিবারিক পুকুর বা কুটির শিল্প স্থাপন করতে পারবেন। অনুমতির শর্ত ভঙ্গ হলে তা বাতিল করা যাবে। অনুমতি ছাড়া কৃষিভূমিতে স্থাপনা নির্মাণ করলে তা অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হবে।
কৃষিভূমি, পাহাড়, টিলা, জলাধার ও জলাভূমি ছাড়া অন্য জমির জোন পরিবর্তন বা জোনিং বহির্ভূত ব্যবহার করতে হলে নির্ধারিত পদ্ধতিতে অনুমোদন নিতে হবে। অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে জনস্বার্থ, পরিবেশ ও এই অধ্যাদেশের উদ্দেশ্য অক্ষুণ্ন থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে বলেও অধ্যাদেশে জানানো হয়েছে।
আমার বার্তা/জেএইচ
