তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গে একমত দলগুলো: আলী রীয়াজ
প্রকাশ : ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫:১১ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রিয়াজ। মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) গণভোটের প্রচারে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এ কথা জানান তিনি।
ড. আলী রীয়াজ বলেন, ‘বাংলাদেশের সংবিধানের ভেতরেই এখনো এমন ব্যবস্থা বিদ্যমান আছে, যার ফলে নাগরিকদের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার-ভোট দেওয়ার অধিকার—কার্যত বাতিল হয়ে যেতে পারে। ভোট দেওয়ার অধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা কেবল জনগণের নয়, ব্যক্তিগতভাবেও আমিও শিকার হয়েছি। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকবে নাকি পরিবর্তনের পথে যাবে—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ এখন জনগণের হাতেই রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতার সবচেয়ে বড় উদাহরণগুলোর একটি হলো নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়া। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি, কিন্তু রাষ্ট্রপতিকে প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করতে হয়। প্রধান বিচারপতি ও প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ ছাড়া অন্য সব বিষয়ে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে বাধ্য। ফলে নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত বাস্তবে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তেই পরিণত হয়।’
ড. আলী রীয়াজ বলেন, ‘এক সময় নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য সার্চ কমিটি গঠনের বিধান করা হয়েছিল, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে নাম নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে আসে যে, একটি নির্দিষ্ট নির্বাচনে যিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন, তার নাম কোনো রাজনৈতিক দলই প্রস্তাব করেনি; বরং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাব উপেক্ষা করে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া নামেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই ধরনের ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ কোনোভাবেই গণতন্ত্রের জন্য স্বাস্থ্যকর নয়। টানা ১৬ বছর ধরে একজন ব্যক্তির শাসনে দেশ কী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে, তা জনগণ প্রত্যক্ষ করেছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই রাজনৈতিক দলগুলো স্বচ্ছ আলোচনার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, কোনো ব্যক্তি জীবদ্দশায় সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। এই সিদ্ধান্ত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং প্রায় ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোট প্রকাশ্য আলোচনার মধ্য দিয়ে এই অবস্থানে এসেছে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হলে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কার অপরিহার্য, আর সেই সংস্কার নিশ্চিত করতে হলে জুলাই জাতীয় সনদ গণভোটের মাধ্যমে গ্রহণ করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করার বিষয়েও ব্যাপক ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। অতীতে দেখা গেছে, ক্ষমতাসীন দলই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নিয়োগ করত, যা বিশ্বাসযোগ্যতা সংকট তৈরি করেছিল। ভবিষ্যতে যাতে এই সমস্যা না থাকে, সে জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে যে জাতীয় সংসদের একটি কমিটির মাধ্যমে—যেখানে ক্ষমতাসীন দল ও প্রধান বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা থাকবেন—আলোচনার মাধ্যমে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য একজন ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। তিনি বলেন, এই ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হলে ‘হ্যাঁ’ ভোটের কোনো বিকল্প নেই।’
ভোটাধিকারের গুরুত্ব তুলে ধরে ড. আলী রীয়াজ বলেন, ‘ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার হলো মানুষের ভোটের অধিকার। অন্তত পাঁচ বছরে একবার নাগরিক যেন বলতে পারেন—তিনি কাউকে চান বা চান না। কিন্তু সেই ন্যূনতম ব্যবস্থাটুকুও এই দেশে রক্ষা করা হয়নি। তিনি আরও বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে কার্যত কোনো ভিন্নমত নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত বিচার বিভাগ প্রকৃত অর্থে স্বাধীন না হবে, ততক্ষণ রাজনৈতিক ও অন্যান্য প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব নয়। গত ৫৪ বছরের অভিজ্ঞতায়, বিশেষ করে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে, বিচার বিভাগের ওপর রাজনৈতিক প্রভাবের সবচেয়ে নগ্ন রূপ দেখা গেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।’
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ বলেন, ‘দায়িত্ব শেষে বিদায়ী বক্তব্যে একাধিক সাবেক প্রধান বিচারপতি প্রকাশ্যে বলেছেন যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে তার অভাব রয়েছে। সে কারণেই জুলাই জাতীয় সনদে সুপ্রিম কোর্টের জন্য আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়েছে এবং অর্ন্তর্বতী সরকার ইতিমধ্যেই সেই সচিবালয় গঠন করেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সাংবিধানিক স্বীকৃতি না পেলে ভবিষ্যতের কোনো সংসদ চাইলে এই ব্যবস্থাকে বাতিল করে দিতে পারবে, এমনকি সংসদে উপস্থাপন না করলেও তা কার্যত অকার্যকর হয়ে যেতে পারে।’
আলী রীয়াজ আরও বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পাশাপাশি জনগণের ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাও জরুরি। সে জন্য বিভাগীয় পর্যায়ে হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ এবং উপজেলা পর্যায়ে আদালত স্থাপনের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে একটি জামিনের জন্য ঢাকায় আসতে গিয়ে মানুষ যে আর্থিক ও শারীরিক ক্ষতির মুখে পড়ে, তা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই অগ্রহণযোগ্য। স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা না থাকলে গায়েবি মামলা ও হয়রানির সুযোগ তৈরি হয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
গণতন্ত্র কোনো দয়ার নয় মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের গণতন্ত্র কোনো দয়ার দান নয়; এটি মানুষের রক্ত ও প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত। ১৯৯০ সালে যেমন রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের পথে ফেরার সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তেমনি ২০২৪ সালেও নতুন করে গণতন্ত্রের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে মানুষের আত্মত্যাগের মাধ্যমে। যারা প্রাণ দিয়েছেন এবং যারা আহত অবস্থায় রয়েছেন, তারা কেবল সুযোগই তৈরি করে দেননি, বরং একটি দায়িত্বও দিয়ে গেছেন। সেই দায়িত্ব হলো—যেন আর কখনো স্বৈরাচারী ব্যবস্থা ফিরে না আসে। এই প্রশ্নের মুখোমুখি না হলে এবং সুস্পষ্ট অবস্থান না নিলে দেশ কার্যত স্থিতাবস্থা রক্ষার পথে থাকবে, যার অর্থ হবে ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তনের পথ খোলা রাখা, পরাধীন বিচার ব্যবস্থা বহাল রাখা এবং ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে জনগণকে বঞ্চিত করা।’
তিনি সরকারি কর্মকমিশনের উদাহরণ টেনে বলেন, ‘রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতার সুযোগ নষ্ট হয়েছে। সে কারণেই জুলাই জাতীয় সনদে পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত কোনো ছোট গোষ্ঠী বা কয়েকজন ব্যক্তির ইচ্ছায় নয়, বরং জাতীয় সংসদের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের আলোচনার ভিত্তিতে নিতে হবে, যাতে রাষ্ট্র পরিচালনা ব্যক্তিকেন্দ্রিক না হয়ে গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।’
আমার বার্তা/এমই
