রাজনৈতিক দলে নারীর প্রতিনিধিত্ব ৩৩ শতাংশ নিশ্চিতের দাবি মহিলা পরিষদের
প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২৬, ১৫:৫২ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

৪ বা ১০ শতাংশ নয়, প্রতিটি রাজনৈতিক দলে নারীর প্রতিনিধিত্ব ৩৩ শতাংশ নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। পাশাপাশি রাজনৈতিক ইশতেহার কতদিনে বাস্তবায়ন করা হবে তার সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নারী সমাজ জানতে চায়। সংসদের গতানুগতিক চেহারা পরিবর্তিত হতে হবে বলেও দাবি মহিলা পরিষদের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির উদ্যোগে নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় বৈষম্য নিরসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করো - এই স্লোগানের আলোকে রোববার সমাবেশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও র্যালি অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ থেকে এ দাবি জানায় সংগঠনটি।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ক্রমাগত নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে নারী আন্দোলনকে খাপ খাইয়ে চলতে হচ্ছে। নারী আন্দোলন একটি চলমান প্রক্রিয়া। যুগ পেরিয়ে নতুনভাবে, নতুন পরিবেশে নারী আন্দোলন প্রবেশ করে। অধিকার পেতে, আমাদের অ্যাকশন নিতে হবে। নারীর মর্যাদা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বড় বাধা নারীর প্রতি সহিংসতা। অধিকারের পাশাপাশি ন্যায়ের আন্দোলনকে জোরদার করতে হবে।
নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় আইন বাস্তবায়নের প্রকৃতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ধর্ষণের ঘটনায় ৯০টি ফাঁসির অর্ডার হলেও কোনো ফাঁসি কার্যকর হয়নি। তিনি এসময় সরকারের প্রতি নারীর প্রতি সহিংসতা নিরসনে টাস্কফোর্স গঠনের আহ্বান জানান।
নারী এমপিদের কাছে নারী ইস্যু সংসদে প্রতিদিন তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নারীর প্রতি ভয়ভীতি দেখানো নারীপ্রগতি বিরুদ্ধ গোষ্ঠী এখন তৎপর আছে- এবিষয়ে আমাদের সচেতন থাকতে হবে, তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখতে হবে। নারী আন্দোলন চলবে। এর বিপক্ষে যে ন্যারেটিভ আছে সেখানে নারী আন্দোলনের ন্যারেটিভ ঠিক করতে হবে; নারী আন্দোলনের অ্যাডভোকেসি কৌশল বদল করতে হবে। আজকের সমাবেশে নারী সাংসদদের নিয়ে কক্কাস তৈরির যে প্রস্তাব এসেছে তা নারী আন্দোলনেরই ফসল। নারী আন্দোলন মাঠ ছাড়বে না। জোট গড়ে তুলতে হবে। সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাবে।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, এখনো নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি, বৈষম্য নিরসন হয়নি, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় আইন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সুতরাং আমাদের প্রতিবাদ করতে হবে, প্রতিরোধেও জোর দিতে হবে। সেই ‘৫২ থেকে ’২৪ এর সব আন্দোলনে নারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। এখনো নারীকে মানুষ হিসেবেই বিবেচনা করা হয় না, ঘরে অবরুদ্ধ করে রাখার পদধ্বনি শুনতে পাই। গৃহকর্মী, যৌনকর্মীরা আজ আরেক নির্যাতিত জনগোষ্ঠী। এখনো যৌনকর্মীর শিশু স্কুলে ভর্তি হতে পারে না। তাহলে কীসের সমতা প্রতিষ্ঠিত হলো?
তিনি এসময় সমাবেশ থেকে দাবি জানান- সংসদ অধিবেশন হবে, সেখানে উইমেন কক্কাস তৈরি করতে হবে, এর মধ্য দিয়ে নারীর সমাজের দাবি দাওয়া পেশ করা সম্ভব পর হবে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, গত ৫৫ বছর ধরে নারী আন্দোলন নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় যে একটু একটু জায়গা তৈরি করেছিলো তা যেন ম্লান হচ্ছে। বর্তমানে নারীর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে, বিচার ব্যবস্থা তার পাশে নেই। সংসদে সরাসরি নির্বাচনে নারী পিছিয়ে গেছে, মনোনয়নে একই অবস্থা, স্থানীয় সরকারে নারীর প্রতিনিধিত্ব নেই। বাল্যবিয়ে বাড়ছে, অর্থনৈতিক কাজে নারী-পুরুষের সমান মজুরির কথা বলা না হলেও তা হয়নি। সামগ্রিকভাবে নারী পিছিয়ে যাচ্ছে। আইন থাকলেও যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। নারীর সুরক্ষা দিতে রাষ্ট্রীয় কোনো মেকানিজম আমরা তৈরি করতে পারিনি। আমরা ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছি। নারী আন্দোলনের ফলে যেসব আইন সংস্কার হওয়া প্রয়োজন তা হয়নি। যেসব আইন, আইন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা তা হয়নি। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক চর্চা নারীকে অগ্রসর করে নেওয়ার ক্ষেত্রে এখনো বাধা হিসেবে আছে। রাজনীতিকে মৌলবাদের উত্থান ঘটেছে। মৌলবাদ ও গণতন্ত্র পাশাপাশি থাকতে পারেনা। এই পরিস্থিতির উত্তরণে তিনি সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
নারী প্রগতি সংঘের পরিচালক শাহনাজ সুমী বলেন, প্রতিবছর আমরা ৮ মার্চ উদযাপন করি। কিন্তু এই দিন পর্যালোচনার জন্য, ঘুরে দেখার জন্য। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য যে নারীর অধিকার বাস্তবায়নের দিকটি কতটা অগ্রসর হলো। আমরা কর্মসূচি পালন শেষে ঘরে ফিরে গেলাম আর সহিংসতা চলতেই থাকবে এটি কাম্য নয়। অধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় প্রকৃত পদক্ষেপ গ্রহণ না হলে আমরা যে তিমিরে আছি সেই তিমিরেই থাকবো। সব আন্দোলনে নারীরা সামনে থাকে, পাশে থাকে কিন্ত ফলের সময় নারীর দিকটি কেউ তাকিয়ে দেখে না। সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নারী বিরুদ্ধ শক্তি ও নীতি নির্ধারণকারীদের মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন।
কেয়ার বাংলাদেশ এর উইমেন অ্যান্ড ইয়ুথ প্রোগ্রামের পরিচালক রওনক জাহান বলেন, সহিংসতার ঘটনায় আমরা নারী হিসেবে, পরিবার হিসেবে, রাষ্ট্র হিসেবে আমরা নীরব থাকছি। সহিংসতার ধরণ পাল্টেছে। নারীদের একজোট হয়ে কাজ করতে হবে, কাজের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। নারী প্রতিবাদ করলে ট্যাগিং করার কালচার বন্ধ করতে প্রতিবাদী হতে হবে। একটি কন্যা ও ধর্ষণের শিকার হবে না, সহিংসতার শিকার হবে না- এই দাবি জানাই।
আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সদস্য মনিরা ত্রিপুরা বলেন, যেসব নারী সংগ্রামের মাধ্যমে এদেশের জন্য লড়াই করেছেন তাদের অবদান স্বীকৃতি নয়, কল্পনা চাকমা অপহৃত হলেও তার খোঁজ মেলেনি। আদিবাসী নারীরা ধর্ষণের শিকার হলেও সঠিক বিচায় পায় না। তারা বিভিন্ন বৈষম্যের শিকার হন, সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে বৈষম্য দূরীকরণে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি এসময় আদিবাসী নারীদের মূলধারায় যুক্ত করতে কয়েকটি দাবি তুলে ধরেন।
দলিত নারী ফোরামের তামান্না বড়াইক বলেন, বহুবছর ধরে নারীরা বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। এর থেকে আমরা উত্তরণের উপায় বুঝে উঠতে পারছি না। দলিত সম্প্রদায়ের মানুষের কাজ সমাজে এখনো ছোট করে দেখা হয়, অথচ এসব কাজে নারীরা যুক্ত আছেন, তবে তাদের কাজের স্বীকৃতি নেই। স্বীকৃতি না পেলে দলিত নারীদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়েই থাকবে। নারীর অধিকারগুলোকে স্বীকৃতি দিতে সকলের সহযোগিতা দরকার।
নারী শ্রমিক রেহানা আক্তার বলেন, নারীরা দেশ গঠনে ভূমিকা রাখলেও নারীর অধিকার নেই। নারী দিবস ১৯৭৫ থেকে পালন করা হলেও এদিন সরকারি ছুটি ঘোষিত হয়নি। কেননা এটি নারীদের দিবস। শ্রমজীবী নারী হিসেবে আজও নিজের অধিকার আদায়ে লড়াই করে যাচ্ছি। তিনি এসময় নারীশ্রমিকের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি দেওয়ার বৈষম্য দূর করে ৪ মাস এর পরিবর্তে ৬ মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি দেওয়া, সম্পত্তিতে সম অধিকারের দাবি জানান সমাবেশ থেকে।
বক্তব্য শেষে ঘোষণা পাঠে একশন এইড বাংলাদেশ এর উইমেন রাইটস অ্যান্ড জেন্ডার ইক্যুইটি টিম লিড মরিয়ম নেছা কয়েকটি দাবি তুলে ধরেন।
দাবিগুলো হলো:
১. নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা ও সুরক্ষায় সব ধরনের বৈষম্য নিরসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পদক্ষেপ রাষ্ট্রকে নিতে হবে।
২. নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার প্রতিটি ঘটনার দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
৩. বিচারহীনতার সংস্কৃতি অবসান করে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
৪. বাল্যবিবাহ, যৌন হয়রানি, পারিবারিক সহিংসতা ও পাচার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
৫. নারীর মানবাধিকার বিরোধী যেকোনো বক্তব্য প্রচার প্রচারণার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
৬. নারী বিরোধী প্রথা সংস্কারের লক্ষ্যে সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানায় এ সমাবেশ।
৭. এই সমাবেশ বৈচিত্র্যকে ধারণ করে অন্তর্ভূক্তিমূলক নারী আন্দোলন গড়ে তোলার প্রত্যয় ঘোষণা করছে।
৮. জেন্ডার বাজেট প্রণয়ন।
আমার বার্তা/এমই
