চাঁদাবাজদের ছাড়াতে তদবির করতে আসলে আইনগত ব্যবস্থা: ডিএমপি কমিশনার
প্রকাশ : ০৩ মে ২০২৬, ১৩:০৭ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন

ঢাকা মহানগরীতে চাঁদাবাজ, মাদক কারবারি, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ও অনলাইন জুয়াড়িদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান জোরদার করার কথা জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। ডিএমপি জানিয়েছে, শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে এখন পর্যন্ত ৫৮ জন তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজ এবং তাদের ৯৪ জন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
রোববার (৩ মে) ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার।
ভারপ্রাপ্ত ডিএমপি কমিশনার বলেন, ঢাকায় পুলিশের অভিযান জোরদার করা হয়েছে। তবে, আমাদের মূল গুরুত্ব থাকবে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে। অপরাধ দমনের অংশ হিসেবে ডিএমপি চাঁদাবাজি, মাদক, অবৈধ অস্ত্র, সন্ত্রাসী এবং অনলাইন জুয়াসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে একটি ‘সমন্বিত নিরাপত্তা কৌশল’ গ্রহণ করেছে। আমাদের লক্ষ্য একটাই— অপরাধীদের নির্মূল করা, নাগরিক জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা এবং ঢাকা মহানগরীকে আরও নিরাপদ নগরীতে পরিণত করা।
তিনি জানান, অপরাধ দমনে চিহ্নিত অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে বিশেষ অভিযান এবং আকস্মিক ‘ব্লক রেইড’ পরিচালনা করা হচ্ছে। এছাড়া, প্রয়োজন অনুযায়ী চেকপোস্ট বসানো, গোয়েন্দা নজরদারি এবং সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণের মাধ্যমে অপরাধীদের পালানোর পথ বন্ধ করা হচ্ছে। ডিএমপির ডিবি (গোয়েন্দা বিভাগ) ও সিটিটিসি (কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম)-এর সাদা পোশাকের সদস্য, সাইবার মনিটরিং টিম এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে অপরাধীদের গতিবিধি নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। অনলাইন জুয়া, প্রতারণা এবং প্রযুক্তিভিত্তিক অপরাধ তদন্তে জোর দেওয়া হয়েছে।
মো. সরওয়ার বলেন, বিভিন্ন কাঁচাবাজার, বড় মার্কেট, টার্মিনাল, ব্যবসায়িক কেন্দ্র এবং স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি বিশেষ ঝটিকা অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে থানা পুলিশ, ডিবি এবং সিটিটিসি টিম যৌথভাবে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৫৮ জন তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজ এবং ৯৪ জন সহযোগী চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলায় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে এবং তাদের কাছ থেকে চাঁদাবাজির বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়েছে, যা আদালতে উপস্থাপন করা হবে।
মাদকবিরোধী অভিযানের সাফল্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘শনিবার ৮০ কেজি গাঁজা উদ্ধারসহ গত এক সপ্তাহে বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ করা হয়েছে। আগে যেখানে ছোট পরিমাণের মাদকসেবী বা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করা হতো, গত কয়েক সপ্তাহে বড় বড় মাদকের চালান জব্দ করা হয়েছে। অভিযানে সক্রিয় মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের পেছনে থাকা গডফাদারদের চিহ্নিত করে মানি লন্ডারিংসহ অন্যান্য মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।’
এলাকাভিত্তিক নিরাপত্তা জোরদার এবং নাগরিকদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বসিলা এবং কারওয়ান বাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দুটি পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে বলে জানান কমিশনার। তিনি বলেন, ‘আরও কয়েকটি জায়গায় শিগগিরই পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। নতুন নতুন এলাকা চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হবে। মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, বাজার, সড়ক ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নতুন করে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের কাজ চলমান আছে, যাতে দ্রুত আসামি শনাক্ত এবং অপরাধ প্রতিরোধ করা যায়।’
সন্দেহজনক ব্যক্তি, চাঁদাবাজ, মাদক বা অনলাইন জুয়া ও প্রতারণা সংক্রান্ত তথ্য পুলিশকে দিতে জনসাধারণের প্রতি অনুরোধ জানান ডিএমপি কমিশনার। তিনি বলেন, ‘অপরাধী যেই হোক, তার পরিচয় বা প্রভাব বিবেচ্য নয়; তাকে আইনের আওতায় আসতেই হবে। চাঁদাবাজ, মাদক কারবারি, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী এবং অনলাইন জুয়াড়ি ও প্রতারকদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।’
তদবির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, “বিভিন্ন অপরাধীকে ছাড়ানোর জন্য যদি কেউ তদবির করে, কোনোক্রমেই সেই তদবির গ্রহণ করা হবে না। ধরে নেওয়া হবে, যারা তদবির করবে তারাও এই অপরাধী চক্রের সাথে জড়িত। অতএব, এ ক্ষেত্রে ডিএমপির অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’ (শূন্য সহনশীলতা)।”
চাঁদাবাজদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ভারপ্রাপ্ত কমিশনার বলেন, চাঁদাবাজ শুধুই চাঁদাবাজ। তাদের পরিচয় বা অন্য কিছু আমাদের কাছে মুখ্য নয়। মুখ্য হলো সে চাঁদাবাজি করে, অপরাধ করে। সে যেই হোক, আমাদের কাছে অপরাধী। যারা চাঁদাবাজ, তাদেরকে আমরা গ্রেপ্তার করছি।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই অভিযানে শুধু থানা পুলিশ নয়, পাশাপাশি ডিবি এবং সিটিটিসি-ও কাজ করছে। আসামিদের তালিকা তিন সংস্থার কাছে এবং র্যাবের কাছেও আছে। অপরাধী কোনো না কোনোভাবে ধরা পড়বেই। আমরা তাকে চাঁদাবাজির স্থান থেকে, তার বাড়ি থেকে, এমনকি সে যদি দিনাজপুর বা রংপুরেও পালিয়ে যায়, সেখান থেকেও ধরে নিয়ে আসব। ওদের পার পাওয়ার কোনো উপায় নেই।
চাঁদাবাজদের তালিকার বিষয়ে তিনি বলেন, এই তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে। গ্রেপ্তার হওয়া ৫৮ জন তালিকাভুক্ত অপরাধী। এর বাইরে ৯৪ জনকে ধরা হয়েছে, যারা তালিকায় ছিল না কিন্তু চাঁদাবাজিতে জড়িত। এই ৯৪ জনের নামও এখন তালিকায় উঠে যাবে।
শীর্ষ সন্ত্রাসীদের উপদ্রব প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বলা যায়, এখন তেমন শীর্ষ সন্ত্রাসীদের উপদ্রব নেই। তবে কিছু মিডিয়াম লেভেল (মাঝারি সারির) বা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ভাঙিয়ে কিছু সন্ত্রাসী কাজ করে। তারা নিজেদের মধ্যে মারামারি করলেও জনসাধারণের ওপর আক্রমণের ঘটনা তেমন নেই। তারপরও আমরা তাদেরকে মনিটরিং করছি এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া চলছে।’
মোহাম্মদপুর এলাকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ডিএমপি কমিশনার বলেন, বসিলায় ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে এপিবিএনের (আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন) ৬৬ জন সদস্য থাকে। তাদের দিয়ে দিনে-রাতে যেকোনো সময় যেকোনো জায়গায় ‘ব্লক রেইড’ দেওয়া হচ্ছে। মোহাম্মদপুরে আরও দুটি ক্যাম্প আছে। এ ছাড়া মোহাম্মদপুরে একটি নতুন থানা স্থাপনের প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হচ্ছে এবং রায়েরবাজার থানা স্থাপনের প্রস্তাব অলরেডি মন্ত্রণালয় পর্যায়ে আছে।
আমার বার্তা/এমই
