রোহিঙ্গা সংকটের ৯ বছর, অনিশ্চিত প্রত্যাবাসন
প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১১:০৪ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

রাখাইনে জ্বলতে থাকা ঘরবাড়ি, স্বজনের লাশ আর ভয়াবহ নির্যাতনের স্মৃতি পেছনে ফেলে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের যে ঢল নেমেছিল, তার নয় বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ মঙ্গলবার।
মানবিক কারণে সীমান্ত খুলে দিয়ে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছিল লাখো বিপন্ন মানুষকে। কিন্তু দীর্ঘ এই সময়ে ক্যাম্পের প্রজন্ম বদলালেও বদলায়নি তাদের ভাগ্য—মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের অপেক্ষাই রয়ে গেছে।
সাড়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গার সেই ঢলের পর কক্সবাজারে গড়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থীশিবির। এরই মধ্যে রাখাইনে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় ২০২৪ সাল থেকে আরও দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।
বর্তমানে কক্সবাজার ও ভাসানচর মিলিয়ে বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের বেশি। এর মধ্যে ২০২৪ সাল থেকে রাখাইনে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় আরও দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ফলে আগে থেকেই ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পগুলোতে চাপ আরও বেড়েছে।
নয় বছর ধরে প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে নানা উদ্যোগ ও আলোচনা হলেও বাস্তবে তার কোনোটি সফল হয়নি। ২০১৮ সালে প্রত্যাবাসন চুক্তি, পরবর্তী সময়ে তালিকা যাচাই এবং একাধিক দফায় প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও নিজ ভূমিতে ফেরার অধিকার নিয়ে রোহিঙ্গাদের আস্থার সংকট কাটেনি।
এর মধ্যে রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতিও আরও জটিল হয়েছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাতের কারণে সেখানে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হয়নি। ফলে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াও কার্যত অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
দীর্ঘদিন ক্যাম্পে বসবাসের কারণে রোহিঙ্গাদের জীবনেও দেখা দিয়েছে নানা সংকট। খাদ্য ও মানবিক সহায়তা কমে আসা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, নিরাপত্তাহীনতা এবং অপরাধ ও মানবপাচারের ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এই সংকটের প্রভাব পড়ছে উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় জনগোষ্ঠী, পরিবেশ ও অর্থনীতিতেও।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা-ইউএনএইচসিআরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের এই দিনে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর দমন-পীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন ৭ লাখ রোহিঙ্গা। এরপর ধাপে ধাপে বিভিন্ন সময় আরও রোহিঙ্গা নাফ নদ পেরিয়ে আসতে থাকে বাংলাদেশে। ২০২০ সালে প্রথমবারের মতো শরণার্থী শিবিরগুলোতে থাকা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা জানায় ইউএনএইচসিআর ও বাংলাদেশ সরকার। সে সময় ক্যাম্পগুলোতে ৮ লাখ ৬৬ হাজার ৪৫৭ জন রোহিঙ্গা ছিলেন। অন্যদিকে ইউএনএইচসিআরেরর ২০২৬ সালের ৩১ জুলাইয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্যাম্পে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের বেশি। এখন ৯ বছর পর বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রিত নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ ২ হাজার ৩৪ জন। সবশেষ ২০২৩ সালের শেষ দিকে রাখাইনে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর অন্তত দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। এর মধ্যে কক্সবাজারে ৩৩টি ক্যাম্পে আছে ১১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৭৫ জন এবং নোয়াখালীর ভাসানচরের শরণার্থী শিবিরে আছেন ৩৩ হাজান ৬৫৯ জন রোহিঙ্গা। ৯ বছরে একজন রোহিঙ্গাকে ফেরত না পাঠাতে পারলেও নতুন করে আশ্রয় নিয়েছেন আরও অন্তত সাড়ে চার লাখ রোহিঙ্গা। নিবন্ধিতদের বাইরেও আরও প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গা আছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তারা।
রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা এখন নতুন প্রজন্ম। ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া বিপুলসংখ্যক শিশুর অনেকেরই মিয়ানমারের সঙ্গে কোনো প্রত্যক্ষ স্মৃতি নেই। ফলে প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি প্রজন্ম শরণার্থী পরিচয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে উঠছে।
২০১৮ ও ২০১৯ সালে প্রত্যাবাসনের জন্য দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হলেও রোহিঙ্গাদের অনাগ্রহ, মিয়ানমারের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও নাগরিকত্বের নিশ্চয়তার ঘাটতির কারণে তা কার্যকর হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে অবশ্য কূটনৈতিক তৎপরতায় কিছুটা অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে।
চলতি মাসে মিয়ানমার জানিয়েছে, বাংলাদেশের পাঠানো ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকা থেকে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য তারা যাচাই করেছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের নিবন্ধিত বাসিন্দা হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে প্রত্যাবাসনের বাস্তব পরিবেশ নিয়ে এখনো বড় প্রশ্ন রয়েছে। রাখাইনের বড় অংশ এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। সেখানে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাত অব্যাহত রয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন, চলাচলে বাধা এবং খাদ্য ও জীবিকার সংকটও রয়েছে। ফলে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হয়েছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের নীতি নতুন করে সাজানোর পরামর্শ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। এজন্য দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগের বাইরে গিয়ে ‘আরাকান স্টেবিলাইজেশন প্ল্যান’ বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় নানা উদ্যোগের মাধ্যমে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের চেষ্টা করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ কোনো কাজে আসেনি। ফলে ‘আরাকান স্টেবিলাইজেশন প্ল্যান’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাব দিয়েছেন। এই করিডর বাস্তবায়িত হলে তা স্বাভাবিকভাবেই রাখাইনের ওপর দিয়েই যাবে।
ইমতিয়াজ আহমেদ আরও বলেন, এই ইকোনমিক করিডরের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট সমস্যার সমাধানও সম্ভব। চীন যেহেতু ইকোনমিক করিডরের প্রস্তাব দিয়ে সেই সুযোগটা তৈরি করে দিয়েছে তা কাজে লাগানো দরকার। তবে তার আগে গবেষণা করে দেখা দরকার এর মাধ্যমে বাংলাদেশের কী লাভ হবে এবং রোহিঙ্গা সমস্যা কীভাবে সমাধান হতে পারে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, ৯ বছর অনেক ধরনের চেষ্টাই তো করা হলো। এখন নতুনভাবে চিন্তা করার সময় এসেছে। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আমরা মূলত জাতিসংঘকেন্দ্রিক চেষ্টা করেছি। আন্তর্জাতিকভাবে এটা অনেক বড় পরিসর হলেও এই সমস্যার সমাধানে দুই-তিনটা শক্তির প্রভাব সবচেয়ে বেশি। তারা একটু সক্রিয় হলেই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান সম্ভব। এর মধ্যে চীন ও আশিয়ান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম গতকাল বলেছেন, সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের পথেই হাঁটছে বাংলাদেশ। রোহিঙ্গাদের সমস্যা সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। রোহিঙ্গাদের এই বিপর্যয়ের কথা আন্তর্জাতিক ফোরামে বারবার বলে আসছি। রোহিঙ্গাদের যাতে সম্মানজনক ও নিরাপদে প্রত্যাবাসন করা হয় সেই দাবি জানানো হচ্ছে।রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অনিশ্চিত জীবনের কথা তুলে ধরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, দশ বছর অনেক লম্বা সময়। কিন্তু ক্যাম্পে বেড়ে ওঠা শিশুর জন্য দশ বছর হচ্ছে তার শৈশব। একজন যুবকের জন্য এটা পড়াশোনাহীন থাকা। একটি পরিবারের জন্য এটা ঘরবাড়িহীন একটি দশক। আর একটি সম্প্রদায়ের জন্য এটি অনিশ্চয়তায় জন্ম নেওয়া প্রজন্ম। আমরা দশ বছরকে বিশ বছর হতে দিতে পারি না।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় সূত্র জানায়, দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর। প্রায় এক দশক ধরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে গিয়ে খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা, পানি, স্যানিটেশন ও অবকাঠামো খাতে ব্যাপক ব্যয় করতে হচ্ছে। জাতিসংঘ ও সহযোগী সংস্থাগুলো ২০২৬ সালে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জরুরি প্রয়োজন মেটাতে ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার সহায়তার আবেদন জানিয়েছে। এই অর্থ দিয়ে কক্সবাজার, ভাসানচর এবং উখিয়া-টেকনাফের আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীসহ প্রায় ১৬ লাখ মানুষের প্রয়োজন মেটানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় সংকট আরও জটিল হচ্ছে। খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে অর্থের সংকট তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা জানিয়েছে, অর্থায়নের ঘাটতির কারণে রোহিঙ্গা শিবিরে জরুরি সেবাগুলোও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
শরণার্থী শিবিরের রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশ নিজ দেশে ফিরতে চায়। বিশেষ করে মধ্য বয়সি যুবকরা বলছেন, এটা মানুষের জীবনযাত্রা হতে পারে না। আমার পূর্বের আরাকানের পরিবেশে ফিরতে চাই। তাদের চাওয়া, ফিরে গিয়ে যেন আবারও নির্যাতন, বাস্তুচ্যুতি কিংবা নাগরিকত্বহীনতার শিকার হতে না হয়। রোহিঙ্গারা বলছে, মিয়ানমারে নিরাপদ পরিবেশ, নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা, নিজেদের জাতিগত পরিচয়ের স্বীকৃতি এবং ভিটেমাটি ও সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত হলেই তারা মর্যাদার সঙ্গে স্বদেশে ফিরতে প্রস্তুত।
