বাংলাদেশে বিদেশি গোয়েন্দা প্রভাব, দুর্নীতি ও আসন্ন বিপর্যয়

প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ১৪:৪৬ | অনলাইন সংস্করণ

  রহমান মৃধা:

বাংলাদেশ এক গভীর সংকটের সম্মুখীন। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা “র” (রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং)-এর অনুপ্রবেশ এখন স্পষ্ট। শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে এই সংস্থাটি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী কাঠামোয় সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে, যা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য চরম হুমকি।

শুধু প্রশাসন নয়, প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি, কূটনীতি, নিরাপত্তা—সব জায়গায় ভারতের প্রভাব বাড়ানোর নীলনকশা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বহু প্রতিষ্ঠানের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভারতীয় প্রশিক্ষণ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যেন তারা “সঠিক” পথে চলেন। পদোন্নতির শর্ত হিসেবে এই প্রশিক্ষণকে ব্যবহার করা হয়েছে, যা স্পষ্টতই বাংলাদেশকে পরনির্ভরশীল ও নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রে পরিণত করার এক সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।

দুর্নীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে “র”-এর প্রভাব

সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্নীতি আজ এমন এক স্তরে পৌঁছেছে, যেখানে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে গ্রহণ করা প্রায় অসম্ভব।
•    বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতিগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যেন একটি নির্দিষ্ট বিদেশি শক্তির স্বার্থ রক্ষা হয়।
•    উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে কারা কাজ পাবে, কোন খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে—এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থের বদলে বৈদেশিক হস্তক্ষেপই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে।
•    প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতেও ভারতের উপস্থিতি নীতি-নির্ধারণের ওপর ছায়ার মতো পড়েছে।

এই বাস্তবতায় দেশ কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে গভীর সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

নির্বাচনী উন্মাদনা: দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র?

এমন এক সময়ে, যখন রাষ্ট্র দুর্নীতির বেড়াজালে বন্দি এবং বিদেশি প্রভাবের শৃঙ্খলে আটকে গেছে, তখন হঠাৎ কিছু রাজনৈতিক শক্তি নির্বাচনের জন্য তাড়াহুড়ো করছে। প্রশ্ন হচ্ছে—

এরা কি ভারতের স্বার্থ রক্ষা করতে চায়, নাকি দুর্নীতির নতুন এক পর্ব শুরু করতে চায়?

যারা আজ জনমতের তোয়াক্কা না করে একটি তড়িঘড়ি নির্বাচন আয়োজনের জন্য লড়ছে, তারা কি সত্যিই দেশকে বাঁচাতে চায়? নাকি তারা বিদেশি শক্তির হাতের পুতুল হয়ে আরও বড় দুর্নীতির চক্র তৈরি করতে চাইছে? যদি তারা দেশপ্রেমিক হয়ে থাকে, তবে তাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করা।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ভুল পদক্ষেপ নিলে বাংলাদেশ একটি রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হবে। এটি হবে মায়ানমার বা থাইল্যান্ডের সম্প্রতি ধসে পড়া ভবনের মতো—একটি দুর্বল কাঠামো যা যে কোনো মুহূর্তে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

ড. ইউনূসের কূটনৈতিক শক্তির সঠিক ব্যবহার প্রয়োজন

এমন সংকটে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো ব্যক্তিত্বকে কাজে লাগানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

•    তিনি বিশ্বজুড়ে গ্রহণযোগ্য এবং সম্মানিত একজন ব্যক্তি, যার সঙ্গে আন্তর্জাতিক কূটনীতির সংযোগ রয়েছে।
•    তার অবস্থান ও নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বাংলাদেশকে “র”-এর প্রভাবমুক্ত করার একটি কৌশলগত উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।
•    দেশের সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের জন্য অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক খাতকে পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে বিদেশি নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়।

প্রথমে মুক্তি, তারপর নির্বাচন

বাংলাদেশের সমস্যা এখন কে ক্ষমতায় আসবে, সেটি নয়। আসল সংকট হলো—রাষ্ট্র কি আদৌ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে?

নির্বাচন তখনই অর্থবহ হবে, যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সত্যিকার অর্থে দেশীয় স্বার্থে কাজ করবে। তাই, প্রথমে “র”-এর প্রভাবমুক্ত হওয়া এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি নির্মূল করা প্রয়োজন। এরপরই গণতন্ত্রের কথা বলা যেতে পারে।

আশার বাণী : বাংলাদেশ এখনো জাগতে পারে

এই সংকটময় পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশ সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হয়নি। ইতিহাস সাক্ষী, যখনই দেশ বড় সংকটের সম্মুখীন হয়েছে, তখন জনগণের প্রতিরোধ ও সচেতনতা সেই সংকটকে অতিক্রম করেছে।

•  সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি।
•  দেশপ্রেমিক ও নৈতিক নেতৃত্বকে সমর্থন দেওয়া এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
•  বিদেশি নিয়ন্ত্রণ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা ছাড়া বাংলাদেশ বাঁচবে না।

এখনো সময় আছে। যদি জনগণ সচেতন হয়, যদি সঠিক নেতৃত্ব দেশকে মুক্ত করার জন্য এগিয়ে আসে, তবে বাংলাদেশ আবারো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।


লেখক: সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।

আমার বার্তা/এমই