সিলভার ইকোনমি: বার্ধক্য কি বোঝা, নাকি বাংলাদেশের নতুন সম্ভাবনা

প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৫:৫৭ | অনলাইন সংস্করণ

  সাকিফ শামীম:

বাংলাদেশকে আমরা প্রায়ই একটি তরুণ দেশের গল্প হিসেবে তুলে ধরি। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কিংবা ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা—এই শব্দগুলো আমাদের আলোচনায় বারবার ফিরে আসে। কিন্তু এই আশাবাদী বয়ানের আড়ালে একটি নীরব পরিবর্তন ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে, যা নিয়ে আমরা এখনো খুব কম কথা বলছি। বাংলাদেশ ক্রমেই একটি বয়স্ক জনগোষ্ঠীর দেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আর এই পরিবর্তিত বাস্তবতার ভেতরেই জন্ম নিচ্ছে একটি নতুন অর্থনৈতিক ধারণা—‘সিলভার ইকোনমি’।

গত কয়েক দশকে দেশে মানুষের গড় আয়ু অভাবনীয়ভাবে বেড়েছে। স্বাধীনতার সময় যেখানে গড় আয়ু ছিল মাত্র ৪৭ বছর, বর্তমানে তা ৭২ বছর অতিক্রম করেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি, টিকাদান কর্মসূচির বিস্তৃতি এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের ফলে মানুষ এখন দীর্ঘায়ু লাভ করছে। তবে এই সাফল্যের উল্টো পিঠে যে বাস্তবতা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তা হলো প্রবীণ জনগোষ্ঠীর দ্রুত বৃদ্ধি। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এই জনমিতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো এখনো বাংলাদেশে পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠেনি।

বিশ্বজুড়ে প্রবীণ জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়, তাকে বলা হচ্ছে ‘সিলভার ইকোনমি’ বা রুপালি অর্থনীতি। সাধারণভাবে ৫০ বা ৬০ বছরোর্ধ্ব মানুষের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, জীবনযাপন ও আর্থিক সুরক্ষাকে ঘিরেই এই অর্থনীতির আবর্তন। উন্নত দেশগুলোতে এই সিলভার ইকোনমি এখন আর কোনো সামাজিক কল্যাণমূলক ধারণা নয়; এটি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। অথচ বাংলাদেশে প্রবীণদের এখনো মূলত ‘নির্ভরশীল গোষ্ঠী’ হিসেবেই দেখা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গিই আমাদের বড় দুর্বলতা।

সিলভার ইকোনমির গুরুত্ব বোঝার জন্য আমাদের বিশ্ব বাস্তবতার দিকে তাকানো প্রয়োজন। জাপানে জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রবীণ হলেও দেশটি এটিকে সংকট নয়, বরং সুযোগ হিসেবে দেখেছে। রোবটিক কেয়ার, প্রবীণবান্ধব প্রযুক্তি, বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা ও বিনোদন—সব মিলিয়ে সেখানে একটি বিশাল বাজার গড়ে উঠেছে। ইউরোপের দেশগুলোতে ‘অ্যাক্টিভ এজিং’ ধারণাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে, যেখানে অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণরাও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকছেন। এর ফলে তারা যেমন মানসিকভাবে সুস্থ থাকছেন, তেমনি অর্থনীতিতেও অবদান রাখছেন।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চিত্রটি দ্রুত বদলাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটির বেশি। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা ৪ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। অর্থাৎ, প্রতি চারজন মানুষের মধ্যে একজন হবেন প্রবীণ। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে অবহেলা করা কিংবা কেবল দয়া-দাক্ষিণ্যের মাধ্যমে দেখার প্রবণতা টেকসই উন্নয়নের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

রুপালি অর্থনীতির প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো হেলথকেয়ার। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, অস্থিসন্ধি ও স্নায়ুবিক সমস্যার মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ বাড়ে। অথচ বাংলাদেশে এখনো প্রবীণদের জন্য বিশেষায়িত জেরিয়াট্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রায় অনুপস্থিত। সিলভার ইকোনমি বিকশিত হলে দক্ষ কেয়ারগিভার, ফিজিওথেরাপিস্ট, পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞ এবং প্রবীণ চিকিৎসকদের একটি নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হবে। ঘরে বসে নার্সিং সেবা, টেলিমেডিসিন কিংবা নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের যে সম্ভাবনাময় বাজার, তা মূলত এই রুপালি অর্থনীতিরই অংশ। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রবীণদের জন্য সাশ্রয়ী ও সমন্বিত চিকিৎসা মডেল চালু করা গেলে এটি স্বাস্থ্য খাতে বড় বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে।

এই অর্থনীতির দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো আবাসন। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী যৌথ পরিবার ব্যবস্থা ভেঙে গিয়ে একক পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে। নগরায়ন ও কর্মসংস্থানের কারণে সন্তানদের বিদেশে বা দূরবর্তী শহরে চলে যাওয়ার প্রবণতায় অনেক প্রবীণ আজ একাকী জীবনযাপন করছেন। আমাদের সমাজে ‘বৃদ্ধাশ্রম’ শব্দটির সঙ্গে এখনো নেতিবাচক মানসিকতা জড়িয়ে আছে। কিন্তু সিলভার ইকোনমির ধারণায় এটি কোনো করুণার স্থান নয়; বরং ‘সিনিয়র লিভিং’ বা ‘অ্যাসিস্টেড লিভিং’ কমিউনিটি—যেখানে প্রবীণরা সম্মানের সঙ্গে বসবাস করবেন, পাবেন চিকিৎসা সহায়তা, নিরাপত্তা ও সামাজিক সংযোগ। এই ধরনের আবাসন ব্যবস্থা রিয়েল এস্টেট খাতের জন্য যেমন নতুন দিগন্ত খুলে দেবে, তেমনি প্রবীণদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতাও নিশ্চিত করবে।

তৃতীয় এবং সবচেয়ে সংবেদনশীল স্তম্ভ হলো ইনসুরেন্স ও পেনশন ব্যবস্থা। বাংলাদেশের প্রবীণদের বড় একটি অংশের প্রধান উদ্বেগ আর্থিক অনিশ্চয়তা। সরকারের সর্বজনীন পেনশন স্কিম একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ হলেও এর পূর্ণ বাস্তবায়ন ও গ্রহণযোগ্যতা পেতে সময় লাগবে। সিলভার ইকোনমির বিকাশে বেসরকারি বিমা কোম্পানিগুলোর জন্য রয়েছে বড় সুযোগ। বয়সভিত্তিক স্বাস্থ্য ইনসুরেন্স, দীর্ঘমেয়াদি কেয়ার কভারেজ এবং অবসর-পরবর্তী সুরক্ষা স্কিম চালু হলে একদিকে বিমা খাতে দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি প্রবাহ তৈরি হবে, অন্যদিকে প্রবীণরা তাদের শেষ জীবনে আর্থিক নিরাপত্তা পাবেন।

সিলভার ইকোনমি মানে কেবল প্রবীণদের জন্য ব্যয় বাড়ানো নয়। এর অর্থ হলো তাদের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও সামাজিক মূলধনকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা। অনেক প্রবীণ অবসরের পরও মানসিক ও শারীরিকভাবে কর্মক্ষম থাকেন, কিন্তু সুযোগের অভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। খণ্ডকালীন কাজ, পরামর্শক ভূমিকা কিংবা সামাজিক উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করা গেলে তা ব্যক্তি ও রাষ্ট্র—উভয়ের জন্যই লাভজনক হবে।

পরিশেষে বলতে চাই, বার্ধক্য কোনো ব্যাধি নয়—এটি জীবনের স্বাভাবিক পরিণতি। প্রশ্ন হলো, এই জীবনের শেষ অধ্যায়টি আমরা কেমনভাবে দেখতে চাই। অনিশ্চয়তা ও নির্ভরতার মধ্যে, নাকি নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে। সিলভার ইকোনমি আমাদের সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। প্রবীণদের কেবল অতীতের মানুষ হিসেবে না দেখে সম্ভাবনাময় একটি মানবসম্পদ হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে। হেলথকেয়ার, আবাসন ও ইনসুরেন্সের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই রুপালি অর্থনীতি শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই আনবে না, বরং আমাদের সমাজকে আরও মানবিক ও সংবেদনশীল করে তুলবে।

লেখক : ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল এন্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টার, ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড গ্রুপ।

আমার বার্তা/সাকিফ শামীম/এমই