ঈদ সামনে, তবু দরিদ্র মানুষের কষ্টের গল্প

প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০২৬, ১৩:১১ | অনলাইন সংস্করণ

  ফাইজা আহমেদ নাফসি

ঈদ মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। ঈদ মানেই হলো আনন্দ। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর পবিত্র ঈদ আসে খুশির বার্তা নিয়ে। এই দিনটি শুধু আনন্দের নয়, বরং ভালোবাসা, ক্ষমা, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের এক অনন্য উপলক্ষ। ঈদের চাঁদ দেখা মাত্রই যেন চারদিকে আনন্দের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে—শিশু থেকে বৃদ্ধ, সবার হৃদয়ে নেমে আসে এক অন্যরকম উচ্ছ্বাস। ঈদের সকালে নতুন পোশাক পরে মুসল্লিরা ঈদের নামাজ আদায় করতে যায়। নামাজ শেষে সবাই একে অপরকে কোলাকুলি করে ঈদের শুভেচ্ছা জানায়। ঈদের আনন্দ সকলে নতুন পোশাক, পছন্দের খাবার আর স্বজনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগির মধ্য দিয়ে উদযাপন করে। এই দিনকে ঘিরে মানুষের মনে থাকে নানা রকমের প্রত্যাশা। ঈদের আগেই মানুষের কেনাকাটার জন্য বাজারগুলো জমজমাট হয়ে উঠতে শুরু করে। সেই সাথে ঘরে ঘরে সুন্দরভাবে ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি চলতে থাকে।  কিন্তু এই উচ্ছ্বাসের মাঝেও সমাজের একটি বড় অংশের মানুষের বাস্তবতা পুরোপুরি ভিন্ন। সীমিত আয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতির দাম এবং অনিশ্চিত জীবিকার কারণে অনেক দরিদ্র পরিবারের কাছে ঈদ আনন্দের হয়না, বরং বাড়তি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই দরিদ্র পরিবারগুলোর কাছে ঈদ মানে আনন্দের চেয়ে বেশি চিন্তা ও কষ্টের সময়। প্রতিবছর ঈদ এলে বাকিরা যেমন এই দিনটি উদযাপন করে আনন্দ-উল্লাসের সাথে, তার বিপরীতে দরিদ্র মানুষেরা এই দিনটি পার করে দুঃখের সাথে। যেখানে অন্যরা উৎসবের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, সেখানে অনেক নিম্নআয়ের মানুষ ভাবেন—কীভাবে সন্তানদের জন্য একটি নতুন পোশাক জোগাড় করবেন, কীভাবে ঈদের দিনটিতে পরিবারের জন্য একটু ভালো খাবারের ব্যবস্থা করবেন। দারিদ্র্যের কঠিন বাস্তবতা তাদের কাছে ঈদের আনন্দকে অনেকটাই ম্লান করে দেয়।

রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরের ফুটপাত কিংবা গ্রামাঞ্চলে বসবাস করা অসংখ্য দরিদ্র মানুষ ঈদের আনন্দ থেকে অনেকটাই বঞ্চিত। দিনমজুর, রিকশাচালক, গরিব শ্রমিক, গৃহকর্মী কিংবা ছোটখাটো কাজ করা অসহায় ও গরিব মানুষের আয় এতটাই সীমিত যে সংসারের নিত্যদিনের খরচ মেটাতেই তাদের হিমশিম খেতে হয়। কাজ না থাকলে আয় নেই—এই বাস্তবতাকে তারা মেনে নেয়। যার ফলে ঈদের এতো বেশি খরচ চালানো তাদের জন্য হয়ে ওঠে এক বিরাট সমস্যা। ফলে ঈদ সামনে এলে নতুন কাপড় কেনা কিংবা বিশেষ খাবারের আয়োজন করা তাদের জন্য হয়ে ওঠে বিলাসিতা। ঈদের বাড়তি খরচ অনেক পরিবারের জন্য হয়ে ওঠে এক বড় চাপ। ঢাকা শহরের বিভিন্ন বস্তি এলাকায় ঘুরে দেখা যায় অনেক পরিবার এখনও নিশ্চিত নয় যে ঈদের দিন তাদের ঘরে ভালো কোনো খাবার রান্না করা হবে কি না। অনেক দরিদ্র বাবা-মা সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন। সন্তানেরা যখন নতুন জামা-কাপড় কিংবা ঈদের মিষ্টি, সেমাই, পোলাও, কোরমার কথা বলে, তখন তাদের চোখে-মুখে ফুটে ওঠে অপ্রকাশিত কষ্টের ছাপ। তাদের কাছে মনে হয় যে তাদের সন্তানেরা ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।  শিশুরা যখন আশপাশের বন্ধুদের নতুন পোশাক পরে ঈদের আনন্দ করতে দেখে, তখন তাদের চোখে-মুখে ফুটে ওঠে অপূর্ণতার ছাপ। সমাজের বৈষম্য যেন ঈদের সময় আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে—একদিকে ধনীরা পালন করে প্রাচুর্যের উৎসব আর অন্যদিকে দরিদ্র পরিবারগুলোতে দেখা যায় অভাবের দীর্ঘশ্বাস।

গ্রামের অনেক কৃষক ও নিম্নআয়ের মানুষ সারা বছর কষ্ট করে জীবিকা নির্বাহ করে আর তাদের পরিবার চালায়।বাজারে ফলমূল, শাকসবজি, তেল, ডিম, চিনিসহ দৈনন্দিন বিভিন্ন দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধির কারণে তাদের জীবনযাপন আরও কঠিন হয়ে উঠে। ঈদের আগে তেমন বাড়তি আয়ের সুযোগ না থাকার জন্য অনেক পরিবারই স্বাভাবিক ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে না। বাজারের কোলাহলে, চকচকে পোশাকের পেছনে দরিদ্র মানুষেরা লুকিয়ে রাখে তাদের আশা আর হতাশার মিশ্র অনুভূতি। দরিদ্র পরিবারের ছোট্ট ছেলে-মেয়েরা প্রায়শই ভাবতে বাধ্য হয়—“আমাদের কি এবারও ঈদ হবেনা?”। আবার বড়রা কিছুটা চেষ্টা করে তাদেরকে সামান্য আনন্দ দিতে, যেন তাদের মুখে হাসি ফোটে, যদিও নিজেরা ভীতিবাহুল্য বেদনা লুকিয়ে রাখে। তাদের কষ্ট ঈদের উল্লাসের সঙ্গে যেন বিরোধ সৃষ্টি করে। অর্থের অভাবে তাদের ভাগ্যে জোটে না ঈদের আনন্দ। তাই তারা ঈদ দেখতে পায় কেবল অন্যের খুশিতে।

ঈদের মানে শুধুই নতুন জামাকাপড়, মিষ্টি আর আনন্দ নয়; বরং এটি মানুষের প্রতি দয়া, সাহায্য এবং সম্প্রীতির উপলক্ষ। ঈদ আসলে সেই আনন্দ, যা সমাজের সকল ধনী-গরিব মানুষ মিলে ভাগাভাগি করার মাধ্যমেই পূর্ণ হয়। ছোট্ট উপহার, খাবার, ঈদের জামা বা আর্থিক সাহায্য—এসব মাধ্যমে অনেক দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটানো যায়। এ ধরনের সহায়তা শুধু তাদের জীবনকে স্বস্তিদায়ক করে না, বরং সমাজের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ ও সম্প্রীতির সেতুবন্ধনও গড়ে তোলে। অনেক প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি ঈদের আগে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অসংখ্য দরিদ্র পরিবারের পাশে দাঁড়ান। তাদের উদ্যোগের মাধ্যমে হাজার হাজার শিশু ও পরিবার ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে। সামান্য দান, খাবার, পোশাক বা অন্যান্য সহায়তা অসংখ্য দরিদ্র পরিবারের ঈদকে আনন্দময় করে তুলতে পারে। কারণ সত্যিকারের ঈদ হলো সবাই মিলে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া।


ফাইজা আহমেদ নাফসি
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।