“মসজিদের পাশে কবর”: নজরুলের স্বপ্ন, আমাদের দায়বোধ

প্রকাশ : ২৬ মে ২০২৬, ১১:৪১ | অনলাইন সংস্করণ

  বিল্লাল বিন কাশেম

আজ জাতীয় কবি Kazi Nazrul Islam- এর জন্মদিন। বাংলা সাহিত্য, সংগীত, মানবতা ও বিদ্রোহী চেতনার এক অবিস্মরণীয় নাম তিনি। যিনি সাম্য, প্রেম, দ্রোহ, মানবমুক্তি ও ধর্মীয় সম্প্রীতির অমর কণ্ঠস্বর হয়ে আজও বেঁচে আছেন কোটি মানুষের হৃদয়ে। কিন্তু প্রতি জন্মদিনেই একটি প্রশ্ন আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়- আমরা কি সত্যিই নজরুলকে ধারণ করতে পেরেছি? আমরা কি কেবল তাঁর গান গাই, কবিতা আবৃত্তি করি, নাকি তাঁর মানবিক ও বিদ্রোহী দর্শনের প্রতিও দায়বদ্ধ?

কবি একদিন লিখেছিলেন-
“মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই,
যেন গোর থেকে মুয়াজ্জিনের আযান শুনতে পাই।”

এ কেবল একটি গানের পঙ্‌ক্তি নয়; এটি ছিল তাঁর অন্তরের এক গভীর আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা। একজন শিল্পীর শেষ ইচ্ছা, একজন বিশ্বাসী মানুষের অন্তর্গত আবেদন। ১৯৭৬ সালে তাঁর মৃত্যুর পর সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে তাঁকে সমাহিত করা হয় Dhaka University Central Mosque- এর পাশে, University of Dhaka প্রাঙ্গণে। স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় কবির জন্য এটি ছিল সম্মানের স্থান, জাতির হৃদয়ের কেন্দ্রস্থলে এক চিরশায়িত বিদ্রোহীর আবাস।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্নও জন্ম নেয়। শ্রদ্ধা, নীরবতা, পরিবেশ ও মর্যাদার যে আবহ একজন জাতীয় কবির সমাধিস্থলের জন্য কাম্য- তা কি সবসময় বজায় থাকে? নানা আয়োজন, কোলাহল, রাজনৈতিক প্রদর্শন, অব্যবস্থাপনা কিংবা অসচেতনতার কারণে মাঝে মাঝে এমন অনুভূতি জাগে- আমরা কি নজরুলকে যথাযথ সম্মান দিতে পারছি?

মৃতরা কথা বলতে পারেন না। কিন্তু যদি পারতেন? যদি কবি আজ তাঁর কবরের নীরবতা ভেঙে কথা বলতেন? এই প্রশ্নটি নিছক কল্পনা নয়, বরং আত্মসমালোচনারও একটি ভাষা। হয়তো তিনি বলতেন- “আমার কবর নয়, আমার চেতনাকে রক্ষা করো।” হয়তো আরেকটি গান লিখতেন মানুষের অসচেতনতা, ভণ্ডামি কিংবা বিস্মৃতির বিরুদ্ধে। কারণ নজরুল কখনো নীরব কবি ছিলেন না; তিনি প্রতিবাদের কবি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চারণের কবি।

আজকের বাংলাদেশে নজরুলকে স্মরণ মানে শুধু ফুল দেওয়া নয়; তাঁর দর্শনের পুনর্পাঠ। সাম্য ও মানবতার যে বাণী তিনি উচ্চারণ করেছিলেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক। তিনি লিখেছিলেন-

“গাহি সাম্যের গান-

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।”

ধর্মীয় বিভাজন, রাজনৈতিক মেরুকরণ, অসহিষ্ণুতা ও সামাজিক বৈষম্যের এই সময়ে নজরুল যেন আমাদের বিবেক হয়ে সামনে দাঁড়ান। তিনি ছিলেন এমন এক কবি, যিনি একইসঙ্গে হামদ-নাত লিখেছেন, আবার শ্যামাসঙ্গীতও রচনা করেছেন। ইসলামের প্রেম যেমন তাঁকে আলোড়িত করেছে, তেমনি হিন্দু পুরাণ থেকেও নিয়েছেন কাব্যিক উপাদান। তাঁর কণ্ঠে ধর্ম ছিল বিভেদের নয়, মানবতার।

জাতীয় কবির সমাধিস্থলকে কেন্দ্র করে আমাদের দায়িত্ব কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটিকে হতে হবে এক নীরব ভাবনার স্থান, সাহিত্য ও চেতনার তীর্থভূমি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতীয় কবি ও মনীষীদের সমাধিস্থল শুধু দর্শনের জায়গা নয়- এগুলো ইতিহাসচর্চা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক দায়বোধের প্রতীক। সেখানে মানুষ নীরবে দাঁড়ায়, ইতিহাসকে অনুভব করে, নিজেদের প্রশ্ন করে। আমাদের এখানেও কি তা সম্ভব নয়?

নজরুলের সমাধির চারপাশে এমন পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে একজন তরুণ গিয়ে বুঝতে পারবে- এখানে শুয়ে আছেন কেবল একজন কবি নন; একজন বিপ্লবী চেতনার মানুষ। একজন শিল্পী, যিনি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন, কারাবরণ করেছেন, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন এবং নিপীড়িত মানুষের পক্ষে কথা বলেছেন।

দুঃখজনকভাবে, আমরা অনেক সময় মনীষীদের স্মরণ করি নির্দিষ্ট দিবসে, তারপর ভুলে যাই। জন্মদিনে ফুল, মৃত্যুবার্ষিকীতে আলোচনা- এর বাইরে তাঁরা যেন আমাদের চিন্তার অংশ হয়ে উঠতে পারেন না। অথচ নজরুলকে জানতে হলে তাঁর বিদ্রোহ বুঝতে হবে, প্রেম বুঝতে হবে, মানবতা বুঝতে হবে।

আজকের তরুণ সমাজের কাছে নজরুলকে নতুনভাবে তুলে ধরা জরুরি। ডিজিটাল যুগে তাঁর কবিতা, গান ও দর্শনকে আধুনিক উপস্থাপনার মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নজরুল পাঠ হতে হবে আরও প্রাণবন্ত। শুধু পরীক্ষার জন্য মুখস্থ নয়, বরং জীবনবোধের অংশ হিসেবে।

একটি বিষয় মনে রাখতে হবে- নজরুলের “মসজিদের পাশে কবর” চাওয়ার মধ্যে কেবল ধর্মীয় আকাঙ্ক্ষা ছিল না; ছিল আত্মিক শান্তির আকুলতা। তিনি ছিলেন আধ্যাত্মিক মানুষ। তাঁর ইসলামী গান, হামদ, নাত, গজল তার সাক্ষ্য দেয়। কিন্তু একইসঙ্গে তিনি ছিলেন সর্বজনীন মানবতার কবি। তাই তাঁর স্মৃতির প্রতি সম্মান দেখানো মানে সংকীর্ণতা নয়, বরং উদারতার চর্চা।

আজ জন্মদিনে আমরা যদি সত্যিই তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে চাই, তাহলে নিজেদেরও প্রশ্ন করতে হবে-
আমরা কি তাঁর সাম্যের দর্শন ধারণ করছি?
আমরা কি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নির্মাণে তাঁর স্বপ্ন অনুসরণ করছি?
আমরা কি তাঁর সমাধির নীরবতার মর্যাদা রক্ষা করছি?
আমরা কি তাঁকে কেবল পাঠ্যবইয়ের কবি বানিয়ে ফেলছি না?

কবি হয়তো আজ বেঁচে থাকলে আবার লিখতেন- বিদ্রোহের গান, মানবতার গান, বৈষম্যের বিরুদ্ধে গান। হয়তো আমাদের উদাসীনতা দেখেও আঘাত পেতেন। কিন্তু তিনি নিশ্চয়ই আশা হারাতেন না। কারণ নজরুল ছিলেন আশার কবি। শৃঙ্খল ভাঙার কবি।

জাতীয় কবির জন্মদিন তাই কেবল উৎসবের দিন নয়; আত্মজিজ্ঞাসারও দিন। তাঁর সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের ভাবতে হবে- আমরা তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশ কতটা গড়তে পেরেছি?

মসজিদের পাশে তিনি কবর চেয়েছিলেন-সেই ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। এখন প্রশ্ন, তাঁর চেতনার পাশে আমরা দাঁড়াতে পেরেছি কি?

শুভ জন্মদিন, চির বিদ্রোহী নজরুল।

আপনি ঘুমিয়ে আছেন, কিন্তু আপনার কবিতা এখনো জাগিয়ে রাখে একটি জাতির বিবেক।

লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন

[email protected]