বরাদ্দ নয়, বাস্তবায়নই হোক উন্নয়নের আসল হিসাব

প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩৩ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন:

সুপ্রভাত। বছরের প্রথম মাসের হিসাব দেখে মনে হচ্ছে, আমাদের উন্নয়ন খাতাটি এখনও কলমের অপেক্ষায় বসে আছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসে সরকারের ১০টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দের একটি টাকাও খরচ করতে পারেনি। পুরো বছরে তাদের জন্য শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ, অথচ প্রথম মাসের ব্যয়ের ঘরে শূন্য। সব মিলিয়ে জুলাই শেষে ৩ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকার এডিপির বিপরীতে খরচ হয়েছে মাত্র ২ হাজার ১২১ কোটি টাকা—অর্থাৎ ০.৬৯ শতাংশ। এক শতাংশও পূর্ণ হলো না।

হিসাবের খাতায় শূন্য দেখতে খারাপ লাগে না—যদি সেটি মাসের প্রথম দিন হয়। কিন্তু মাসের শেষেও যদি শূন্য থাকে, তখন হিসাবরক্ষক একটু কপাল কুঁচকান। উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি আরও গুরুতর। কারণ বরাদ্দের টাকা শুধু সরকারের কোষাগারে বসে থাকার জন্য নয়; তার সঙ্গে রাস্তা, সেতু, স্কুল, হাসপাতাল, পানি, বিদ্যুৎ এবং মানুষের প্রত্যাশাও বসে থাকে। টাকা খরচ হয়নি মানেই টাকা বেঁচে গেছে—রাষ্ট্রের উন্নয়ন খাতায় এই অঙ্কটি এত সরল নয়।

এই জায়গাতেই আজকের ‘পুরোনো খাতা, নতুন হিসাব’-এর প্রথম শিক্ষা। বরাদ্দ কত হলো—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কাজ কত হলো। বাজেটের অঙ্ক বড় করা সহজ; অঙ্ককে বাস্তবে পরিণত করাই প্রশাসনের পরীক্ষা। বছর শেষে পুরো বরাদ্দ খরচ করার তাড়া যেমন কাম্য নয়, তেমনি প্রথম কয়েক মাস কাগজপত্রের ঘুমে কাটিয়ে শেষ দিকে তাড়াহুড়ো করে খরচ করাও উন্নয়ন নয়। ভালো প্রশাসনের কাজ হলো বছরের শুরু থেকেই কাজের ঘড়িটি চালু রাখা।

এই ঘড়ির সঙ্গে পুঁজিবাজারের ঘড়িটিরও আশ্চর্য মিল আছে। বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা ও বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে বিএসইসি ব্রোকারেজ হাউসে ঝটিকা পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সন্দেহজনক লেনদেন কিংবা বিনিয়োগকারীর অর্থ ও সিকিউরিটিজ ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা থাকলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেছে নিয়ে পরিদর্শন করা হবে।  ঝটিকা পরিদর্শনের নামটি বেশ চমৎকার—অফিসে বসে কেউ ভাবছেন না, ‘আজ নিশ্চয়ই আসবে না’; কারণ ঝটিকার স্বভাবই হলো আগে খবর না দেওয়া। তবে বাজারের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের জন্য ঝটিকার পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারিও চাই।

অর্থনীতির আরেক পাতায় আরও বড় একটি প্রশ্ন। বাংলাদেশ গবেষণা ও উন্নয়নে জিডিপির মাত্র ০.৩ শতাংশ ব্যয় করে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এটিকে অত্যন্ত কম বলেছেন।  আমরা উন্নয়নের জন্য টাকা খরচ করতে চাই, কিন্তু ভবিষ্যৎ আবিষ্কারের জন্য টাকা রাখতে বেশ কৃপণ। সেতু বানানোর হিসাব আমরা বুঝি; নতুন প্রযুক্তি বানানোর হিসাবটি এখনও বুঝে উঠিনি। অথচ যে দেশ গবেষণায় বিনিয়োগ করে না, তাকে শেষ পর্যন্ত অন্য দেশের আবিষ্কার কিনতে হয়। তখন খরচের খাতাটি আরও মোটা হয়।

আজকের দ্বিতীয় কথাটি তাই: উন্নয়ন শুধু টাকা খরচের নাম নয়; সঠিক জায়গায়, সঠিক সময়ে, সঠিক কাজে টাকা খরচ করার নাম। আর গবেষণায় ব্যয় হলো সেই অদৃশ্য সেতু, যার ওপর দিয়ে আজকের অর্থনীতি আগামীকালের দিকে যায়।

বিশ্ব অবশ্য বসে নেই। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে; জাহাজ, প্রযুক্তি, বিমান চলাচল, স্বর্ণ ও ডিজিটাল সম্পদসহ বিভিন্ন খাতকে এর আওতায় আনা হচ্ছে।  অর্থনীতি এখন আর যুদ্ধের পেছনে হাঁটে না—অনেক সময় অর্থনীতিই যুদ্ধের প্রথম সারির সৈনিক। এর অভিঘাত বাংলাদেশেও আসে জ্বালানির দামে, আমদানি ব্যয়ে, পরিবহন খরচে।

অন্যদিকে ভারত ও চীন পুরোনো সীমান্ত-হিসাবের নতুন পাতা খুলতে বসেছে। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের বেইজিং সফরে সীমান্ত স্থিতিশীলতা নিয়ে বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠক হচ্ছে; সামনে ব্রিকস সম্মেলনও রয়েছে।  বড় দেশগুলোরও বুঝি মাঝে মাঝে পুরোনো খাতা বন্ধ করে নতুন করে হিসাব করতে ইচ্ছে হয়। সব হিসাব শক্তি দিয়ে মেলাতে হয় না; কিছু হিসাব আলোচনার টেবিলেও মেলে।

বাংলাদেশের খাতায়ও তাই আজ কয়েকটি প্রশ্ন লিখে রাখা যেতে পারে। উন্নয়ন বরাদ্দ আছে—কাজের গতি কোথায়? পুঁজিবাজার আছে—বিনিয়োগকারীর সুরক্ষা কতটা? বিশ্ববিদ্যালয় আছে—গবেষণার টাকা কোথায়? আর পৃথিবী যখন প্রতিদিন নতুন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সমীকরণ লিখছে, আমরা কি এখনও পুরোনো অঙ্ক কষেই সন্তুষ্ট?

পুরোনো খাতা ফেলে দেওয়ার দরকার নেই। তাতে অভিজ্ঞতা আছে, ভুলের শিক্ষা আছে, সাফল্যের স্মৃতিও আছে। শুধু নতুন পাতায় একই ভুলটি যেন আবার না লেখা হয়।

এই বছরের হিসাবটা তাই একটু অন্যরকম হোক—বরাদ্দের চেয়ে বাস্তবায়ন বড় হোক, ব্যয়ের চেয়ে ফল বড় হোক, আর আজকের উন্নয়নের সঙ্গে আগামী দিনের প্রস্তুতিটাও যেন হিসাবের মধ্যে থাকে।

শুভ সকাল। আসসালামুআলাইকুম ।