উন্নয়নের আসল মাপকাঠি মাসের শেষের স্বস্তি

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৭ | অনলাইন সংস্করণ

  শামসুল আলম

সেপ্টেম্বরের সকাল। রোদ উঠেছে—এটি অবশ্য আমাদের কৃতিত্ব নয়; সূর্য মহাশয় বহু যুগ ধরেই বিনা টেন্ডারে এই কাজটি করে আসছেন। তবে আজ বাংলাদেশের জন্য খবরটি দারুন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে বসেছে বাংলাদেশ; ডক্টর খলিলুর রহমান এক বছরের জন্য বিশ্বকূটনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চটি পরিচালনা করবেন। এদিকে সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রপাতি আমদানিতে ছয় মাসের কর-শুল্ক ছাড় এবং ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুতের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। অর্থাৎ এক হাতে পৃথিবী, অন্য হাতে সূর্য—এখন শুধু মাঝখানে একটু বাংলাদেশ থাকলেই হয়।

কিন্তু সকালের চায়ের কাপটি ঠান্ডা হওয়ার আগেই বাস্তবতা এসে কানে কানে বলে গেল—“ভাই, এত তাড়াতাড়ি আনন্দিত হবেন না।” ডেঙ্গুতে এক দিনে নয়জনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ১ হাজার ৫৭১ জন; এ বছরের মৃত্যুসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩০-এ। ১২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে তিন মাসের দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ অভিযান। অভিযান হবে, মাইক বাজবে, ওষুধ ছিটবে, সভা হবে—সবই হবে। কিন্তু মশাটি সভার কার্যবিবরণী পড়ে না। সে বরং জমে থাকা পানিতে বসে থাকে এবং আমাদের সভ্যতার ওপর ব্যক্তিগত গবেষণা চালায়। অতএব ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সরকারের পাশাপাশি নাগরিকেরও একটু নড়াচড়া দরকার।

অর্থনীতির পাতায় এসে আনন্দ আরও সংযত হয়ে যায়। মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত মাথাপিছু সরকারি ঋণ প্রায় ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে বটে, কিন্তু মজুরি সেই গতিতে বাড়েনি; ফলে মানুষের প্রকৃত আয় এখনও চাপে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের খাতায় ঋণ একটি সংখ্যা—একটি বেশ ভদ্র, নিরীহ সংখ্যা। কিন্তু সংসারের খাতায় সেই সংখ্যা ভাড়া, বাজার, সন্তানের পড়াশোনা আর মাসের শেষ সপ্তাহের দীর্ঘশ্বাস হয়ে দেখা দেয়। তাই উন্নয়নের আসল পরীক্ষা বড় অঙ্কের প্রকল্পে নয়; সাধারণ মানুষের মাসের শেষ সাত দিন কতটা স্বস্তিতে কাটে, সেখানেই।

এই জায়গায় মাগুরার সেই সেতুটি আমাদের জাতীয় চরিত্রের ওপর একখানা চমৎকার প্রবন্ধ লিখে বসে আছে। ১৬ কোটির বেশি টাকা খরচ করে সেতু বানানো হয়েছে; সেতু দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু সংযোগ সড়ক নেই। অর্থাৎ নদী পার হওয়ার ব্যবস্থা আছে, নদীর কাছে যাওয়ার ব্যবস্থা নেই। এ এক অভিনব প্রশাসনিক দর্শন—গন্তব্য প্রস্তুত, পথ অনুপস্থিত। আবার ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতি ঠেকাতে জামানতের মূল্যায়নের জন্য ১৩১টি প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত করা এবং ব্যাংক কর্মকর্তাদের শিক্ষাগত সনদ যাচাইয়ের নির্দেশ এসেছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র ধীরে ধীরে আবিষ্কার করছে—সংস্কার মানে শুধু নতুন দরজা বসানো নয়, দরজার তালাটিও মাঝে মাঝে পরীক্ষা করা।

সামাজিক মাধ্যমে গতকাল দুটি বাংলাদেশ পাশাপাশি দাঁড়িয়েছে। ভেনিসে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনকে কয়েকজন দুবৃত্ত কতৃক শারীরিকভাবে হেনস্তার ঘটনা সম্পর্কে সরকারের গৃহীত ব‍্যবস্থাদি সংসদকে অবহিত করা হয়েছে। বিদেশের মাটিতে গিয়ে দেশের রাজনৈতিক রাগ-অনুরাগ সঙ্গে নিয়ে ঘোরার এই অভ্যাসটি বড়ই আশ্চর্য—পাসপোর্ট বদলায়, ভূগোল বদলায়, কিন্তু রাগের ব্যাগেজটি বদলায় না। আবার সেই একই সামাজিক মাধ্যমে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট দলের এশিয়া কাপের সেমিফাইনালে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ৩৪ রানে হারানোর আনন্দ। একদিকে লজ্জা, অন্যদিকে গর্ব—দুটিই আমাদের। জাতি বড় বিচিত্র প্রাণী; একই দিনে নিজের হাতে নিজের মুখে চড়ও মারে, আবার নিজের হাতেই নিজের পতাকা উড়ায়।

বিশ্বও আমাদের খুব বেশি স্বস্তি দেওয়ার অবস্থায় নেই। মার্কিন দূতেরা মস্কো ও কিয়েভে শান্তির রাস্তা খুঁজে বেড়াচ্ছেন, আর রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সেই রাস্তার ওপরই যেন নতুন করে গর্ত খুঁড়ছে। কিয়েভে হামলায় প্রাণহানি ও আহতের খবর এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যেও আগুনের আঁচ কমেনি; হুথিদের সৌদি জ্বালানি স্থাপনায় হামলার পর তেলের দাম ছয় সপ্তাহের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে, আর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিমান খাতে নতুন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। যুদ্ধ শুরু পর জর্ডানে আমেরিকান ঘাঁটিতে সর্ববৃহৎ হামলা করেছে ইরান। যুদ্ধের মজার একটি ব্যাপার আছে—যারা যুদ্ধ করে তারা কখনো কখনো দূরে থাকে, কিন্তু তার বিলটি আসে পৃথিবীর প্রায় সব মানুষের ঘরে। তেলের দাম বাড়ে, পরিবহন বাড়ে, বাজার বাড়ে; শেষে গৃহস্থের মুখটাই ছোট হয়ে আসে।

তাই আজকের কথাটি খুব বড় কোনো রাষ্ট্রদর্শন নয়—দেশটাকে প্রতিদিন একটু একটু করে মেরামত করি। রাষ্ট্রকে প্রতিদিন কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রাখলে রাষ্ট্রও একসময় কাজের চেয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনে বেশি মন দেয়; আবার রাষ্ট্রের সব দায় জনগণের ঘাড়ে চাপিয়েও পার পাওয়া যায় না। সেতুর আগে রাস্তা, হাসপাতালের আগে রোগী, ঘোষণার আগে বাস্তবায়ন, আর পরিসংখ্যানের আগে মানুষ—এই সামান্য বুদ্ধিটুকুই আপাতত যথেষ্ট। মশাটি যেমন রাষ্ট্রের সভা মানে না, তেমনি মানুষও আর শুধু সভার ভাষণ মানতে চায় না। সে ফল চায়। একটু স্বস্তি চায়। একটু ভরসা চায়। আর সবচেয়ে বেশি চায়—রাষ্ট্র ও জনগণ দুজনেই যেন একই দিকে ছুটে, পরস্পরের বিপরীতে নয়। 

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র সচিব