উন্নয়নের পরিসংখ্যান আর মানুষের বাস্তবতার দূরত্ব

প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৪ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন:

আজ সাপ্তাহিক ছুটির দিন হলেও অফিস খোলা। রাষ্ট্রের কাজের অবশ্য ছুটির দিন নেই; ছুটি আছে মানুষের, ফাইলের নয়। যদিও ফাইলেরও কখনো কখনো এমন বিশ্রাম হয় যে, তার ঘুম ভাঙাতে কয়েকটি সভা, একটি কমিটি এবং অন্তত দুটো স্মারকলিপি লাগে। আজকের খবরগুলো পাশাপাশি রাখলে বাংলাদেশের একটি পরিচিত ছবি চোখে পড়ে। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের জরুরি সিন্ডিকেট সভায় ১৫ জনের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ছয়জন; অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ডেঙ্গুর বাহক শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর মশার ফাঁদ তৈরির চেষ্টা করছেন। কোথাও উপস্থিতির ঘাটতি, কোথাও উদ্ভাবনের চেষ্টা। প্রতিষ্ঠান যখন নিজের কাজ ঠিকমতো করতে পারে না, তখন নাগরিকের ভোগান্তি বাড়ে; আর গবেষণার সাফল্য যখন বাস্তব সেবায় পৌঁছায়, তখন সেই নাগরিকই কিছুটা স্বস্তি পান।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের প্রশ্নটি অন্য ক্ষেত্রেও সামনে আসছে। দেশজুড়ে বিশেষ অভিযানে প্রতিদিন গড়ে এক হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তারের খবর দিয়েছে ঢাকা ট্রিবিউন। প্রতিবেদনে কারাগারগুলোর ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যাওয়ার কথাও বলা হয়েছে। অপরাধ দমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, কিন্তু গ্রেপ্তারই যদি সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হয়ে ওঠে, তবে অপরাধ প্রতিরোধ, ন্যায়বিচার এবং কারাগারের ধারণক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে হবে। আইনের শাসন মানে অপরাধীর জবাবদিহি নিশ্চিত করা, একই সঙ্গে প্রত্যেকের ন্যায়সংগত বিচার পাওয়ার অধিকার রক্ষা করা।

অর্থনীতির খবরেও আশার সঙ্গে শর্ত জুড়ে আছে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি অংশীদারিত্ব কাঠামোর শর্ত চূড়ান্ত করতে আলোচনা হবে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে বাংলাদেশের ঋণ প্রস্তাবের বাকি বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনা এগোবে। তবে কোনো চুক্তিই এখনো চূড়ান্ত হয়নি। উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন দরকার, কিন্তু অর্থের সঙ্গে অগ্রাধিকার ও শর্তও আসে; তাই চুক্তির অঙ্কের পাশাপাশি দেখতে হবে কোন খাতে অর্থ যাবে, কর্মসংস্থান কতটা বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে তার সুফল কীভাবে পৌঁছাবে। দ্য ফিন্যানশিয়াল এক্সপ্রেস-এর ‘The Growth We Can’t Feel’ শিরোনামের আলোচনাটি এই প্রশ্নই সামনে আনে। প্রবৃদ্ধির হার অর্থনীতির স্বাস্থ্য জানায়, কিন্তু বাজারে চাল-ডালের দাম, শ্রমিকের মজুরি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর বিক্রি জানায় সেই স্বাস্থ্যের সুফল কতটা মানুষের কাছে পৌঁছেছে। প্রবৃদ্ধি যদি পরিসংখ্যানে সুস্থ থাকে আর সংসারের বাজেট রোগা হয়ে যায়, তবে হিসাবের খাতায় কোথাও না কোথাও গরমিল আছে।

আজ ১৭ অক্টোবর আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস। একটি সম্পাদকীয়তে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাহীনতায় থাকা মানুষের কথা উঠে এসেছে। জাতিসংঘের এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘সবার জন্য নিরাপদ বাসস্থান’। বিষয়টি শুনতে আবাসননীতির মতো মনে হলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে চাকরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা। ঘরের ভাড়া দিতে গিয়ে যে পরিবার শিশুর পুষ্টিকর খাবার কমিয়ে দেয়, তার কাছে দারিদ্র্য কোনো বিমূর্ত অর্থনৈতিক ধারণা নয়; মাসের শেষ সপ্তাহের বাস্তবতা। একই সঙ্গে মাধ্যমিক পর্যায়ে ইংরেজি ও গণিতের শিক্ষকদের প্রাসঙ্গিক ডিগ্রির ঘাটতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন শিক্ষার মান সম্পর্কে উদ্বেগ বাড়ায়। আজকের শিশুর পুষ্টি ও শিক্ষায় ঘাটতি থাকলে আগামী দিনের কর্মশক্তির ওপর তার প্রভাব পড়বে। উন্নয়ন পরিকল্পনায় সেতু, সড়ক ও বিনিয়োগের হিসাব থাকবে, অবশ্যই; কিন্তু মানুষের মাথার ওপর নিরাপদ ছাদ, পাতে খাবার এবং শ্রেণিকক্ষে যোগ্য শিক্ষক না থাকলে সেই পরিকল্পনার সামাজিক ভিত্তি দুর্বলই থেকে যায়।

সামাজিক মাধ্যমে আজকের আলোচনার বড় অংশ জুড়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘গরুর মাংসের ভোজ’। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ক্যাম্পাসে পশু জবাই নিষিদ্ধ করার নোটিশের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা গরু কিনে মাংস ও খিচুড়ি বিতরণ করেছেন। বিষয়টি শুরু হয়েছিল ক্যাম্পাসে গরুর মাংস রান্না, মন্দিরসংলগ্ন স্থান এবং পরিচ্ছন্নতা নিয়ে আপত্তি থেকে; পরে তা প্রশাসনিক নির্দেশ, শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতার বিতর্কে রূপ নেয়। মত প্রকাশের অধিকার যেমন আছে, তেমনি সহাবস্থান ও জনস্বাস্থ্যের দায়িত্বও আছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিতর্কের সমাধান হওয়া উচিত যুক্তি ও আলোচনায়—কে কত বড় ভোজ দিলেন, সেই প্রতিযোগিতায় নয়। সামাজিক মাধ্যমে আরেকটি উদ্বেগ ভুয়া সংবাদ-ফটোকার্ড ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট নিয়ে। পরিচিত সংবাদমাধ্যমের লোগো বসালেই কোনো বক্তব্য সত্য হয়ে যায় না; যেমন সিলমোহর দেখেই সব কাগজকে আসল বলা যায় না। নির্দিষ্ট ভাইরাল কার্ড যাচাই না করে কোনো দাবিকে সত্য ধরে নেওয়া উচিত নয়। শেয়ার করার আগে মূল সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে খবরটি খুঁজে দেখা এখন নাগরিক দায়িত্বেরই অংশ।

জনস্বাস্থ্যের খবরটি আরও বেদনাদায়ক। রয়টার্সের ১৭ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, মার্চের মাঝামাঝি থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে হামের দুই লাখের বেশি সন্দেহভাজন সংক্রমণ এবং ১,১৪৭টি মৃত্যুর খবর নথিভুক্ত হয়েছে; মৃতদের ৯৪ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের নিচে। টিকাদানের আওতা কমে যাওয়া, স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি এবং দুর্গম এলাকায় শিশুদের কাছে পৌঁছাতে না পারাকে সংকটের কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। আগে বাদ পড়া ৩৪ লাখ শিশুকে টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনার উদ্যোগের কথাও এসেছে। এখানে প্রতিটি সংখ্যা একটি পরিবারের গল্প। তালিকায় শিশুর নাম না থাকলে রোগের তালিকায় তার নাম ওঠার আগেই রাষ্ট্রের খোঁজ নেওয়া দরকার। আন্তর্জাতিক পরিসরে ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক বৈঠকে ঋণের চাপ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। জ্বালানি ও সারের দাম বাড়লে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে দূরের যুদ্ধও বাজারের খরচ বাড়াতে পারে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির মানচিত্রে দূরত্ব যতই থাক, জ্বালানির দাম বাড়লে তার চিঠি পৌঁছে যায় রান্নাঘর পর্যন্ত।

ছুটির দিনে অফিস খোলা থাকুক, কাজও খোলা থাকুক। বিশ্বব্যাংকের চুক্তি হোক, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বাড়ুক, প্রযুক্তি নতুন সমাধান আনুক—সবই প্রয়োজন। কিন্তু সেই সঙ্গে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, শিশুকে টিকা দেওয়া, শ্রেণিকক্ষে যোগ্য শিক্ষক রাখা এবং দরিদ্র পরিবারের খাবার ও বাসস্থানের নিরাপত্তাও চাই। সভার কার্যবিবরণী, ঋণের শর্ত, প্রবৃদ্ধির হিসাব কিংবা সামাজিক মাধ্যমের লাখো শেয়ার—সবই খবরের উপাদান। কিন্তু খবরের বাইরেও একটি দেশ আছে, যেখানে মানুষ প্রতিদিন সংসার চালায়, সন্তানকে স্কুলে পাঠায় এবং অসুখ হলে চিকিৎসা খোঁজে। রাষ্ট্রের আসল পরীক্ষা সেখানেই। অফিস খোলা কি না, তা ক্যালেন্ডার জানায়; রাষ্ট্র জেগে আছে কি না, তা জানায় নাগরিকের জীবন।