যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে ইসলাম বেছে নিয়েছে বন্দীরা 

প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:৪১ | অনলাইন সংস্করণ

  আন্তর্জাতিক ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারগুলোতে বন্দীদের ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। কারাবাসের নিঃসঙ্গতা, মানসিক চাপ ও জীবনের অনিশ্চয়তার মধ্যে অনেকে ইসলামের শিক্ষা, ইবাদত ও শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপনের মাধ্যমে নতুন করে জীবন গড়ার অনুপ্রেরণা খুঁজে পান। তবে দেশটিতে প্রতিবছর কতজন বন্দী কারাবাসের সময় ইসলাম গ্রহণ করেন, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য জাতীয় পরিসংখ্যান নেই।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০১২ সালের এক জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের ১ হাজার ৪৭৪ জন পেশাদার কারা-যাজকের মতামত নেওয়া হয়। জরিপে অংশ নেওয়া ৭৭ শতাংশ যাজক জানান, তাঁদের কারাগারে বন্দীদের ধর্ম পরিবর্তনের ঘটনা ঘটে। আর ধর্মান্তরের ঘটনা প্রত্যক্ষ করা যাজকদের মধ্যে ৫১ শতাংশ বলেন, তাঁদের কারাগারে মুসলিম বন্দীর সংখ্যা বাড়ছে।

কারাগারে মুসলিম বন্দীদের উপস্থিতি সম্পর্কেও বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখযোগ্য তথ্য উঠে এসেছে। নাগরিক অধিকার সংস্থা মুসলিম অ্যাডভোকেটসের ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ মুসলিম হলেও ৩৪টি অঙ্গরাজ্য ও ওয়াশিংটন ডিসির তথ্য বিশ্লেষণে স্টেট কারাগারগুলোতে মুসলিম বন্দীদের হার প্রায় ৯ শতাংশ পাওয়া যায়। ফেডারেল কারাগারে এ হার প্রায় ১২ শতাংশ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তবে কারাগারে মুসলিম বন্দীর সংখ্যা এবং কারাবন্দী অবস্থায় ইসলাম গ্রহণকারীর সংখ্যা এক বিষয় নয়। এসব তথ্য থেকে কতজন বন্দী কারাগারে এসে ইসলাম গ্রহণ করেছেন, তা নির্দিষ্টভাবে জানা যায় না।

যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারগুলোতে প্রতিবছর ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার বন্দী ইসলাম গ্রহণ করেন—এমন দাবি বিভিন্ন বই ও পুরোনো প্রতিবেদনে পাওয়া যায়। কিন্তু দেশব্যাপী পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য জরিপের মাধ্যমে এ সংখ্যা নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে এসব দাবিকে প্রতিষ্ঠিত পরিসংখ্যান হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।

২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সিবিএস নিউজের ‘সিবিএস মর্নিংস’ অনুষ্ঠানে প্রচারিত একটি প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে ইসলাম গ্রহণকারী বন্দীদের বিষয়ে আলোচনা করা হয়। প্রতিবেদনে বন্দীদের ইসলামি শিক্ষা ও ধর্মীয় সহায়তা প্রদানকারী অলাভজনক সংস্থা তাইবা ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম তুলে ধরা হয়।

সংস্থাটির পরিচালকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাইবা ফাউন্ডেশন ১৩ হাজারের বেশি বন্দীকে সেবা দিয়েছে। সংস্থাটির দাবি, এসব সেবাগ্রহীতার ৯০ শতাংশ কারাগারে থাকাকালে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তবে এই হিসাব কেবল সংস্থাটির সেবাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যুক্তরাষ্ট্রের সব কারাগারে ইসলাম গ্রহণের সামগ্রিক প্রবণতা নির্ধারণে এটি যথেষ্ট নয়।
কেন কারাগারে ইসলাম গ্রহণ করেন বন্দীরা?

কারাগারে ইসলাম গ্রহণের পেছনে প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি আলাদা। কারও ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আবার কেউ জীবনের সংকট, অতীতের ভুল নিয়ে আত্মসমালোচনা কিংবা ভবিষ্যৎ জীবন নতুনভাবে সাজানোর আকাঙ্ক্ষা থেকে ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

ইসলামের নিয়মিত ইবাদত অনেক বন্দীর দৈনন্দিন জীবনে শৃঙ্খলা ও আত্মসংযম গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের নির্দিষ্ট সময়, রোজা পালন এবং ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের চর্চা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে একটি সুশৃঙ্খল রুটিন তৈরি করতে পারে।

পাশাপাশি জামাতে নামাজ, ধর্মীয় আলোচনা ও সহবন্দীদের সঙ্গে পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে অনেকে সামাজিক বন্ধন এবং মানসিক সমর্থন লাভ করেন। কারাগারের বিচ্ছিন্ন পরিবেশে এসব সম্পর্ক একাকিত্ব মোকাবিলায় সহায়তা করতে পারে।

ধর্মীয় শিক্ষার সংস্পর্শে এসে কেউ কেউ নিজেদের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে ভাবেন। জীবনের উদ্দেশ্য খোঁজার পাশাপাশি মুক্তির পর সৎ ও দায়িত্বশীল জীবনযাপনের প্রত্যয়ও তাঁদের মধ্যে তৈরি হতে পারে। তবে এসব অভিজ্ঞতা সবার ক্ষেত্রে এক রকম নয়। ইসলাম গ্রহণের পেছনে ব্যক্তিগত বিশ্বাস, উপলব্ধি ও পরিস্থিতি ভিন্ন ভিন্নভাবে কাজ করে।

কারাগারে বন্দীদের পুনর্বাসনে ধর্মীয় কার্যক্রমের গুরুত্ব নিয়েও গবেষণা ও আলোচনা রয়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০১২ সালের জরিপে ৭৩ শতাংশ কারা-যাজক মনে করেন, বন্দীদের সফল পুনর্বাসনের জন্য ধর্মভিত্তিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই ফলাফল কারাগারে ধর্মীয় কার্যক্রমের সম্ভাব্য ভূমিকা তুলে ধরে। তবে এটি বন্দীদের পুনর্বাসনের বাস্তব ফলাফল সরাসরি পরিমাপ করা কোনো গবেষণা নয়; বরং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের মতামত।

বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে পুনর্বাসন নিয়ে আলোচনায় ধর্মীয় শিক্ষা ও অনুশীলনের পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষা, পেশাগত প্রশিক্ষণ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং মুক্তির পর কর্মসংস্থানের সুযোগকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। এসব উদ্যোগ বন্দীদের সমাজে ফিরে আসার প্রস্তুতি এবং স্বাভাবিক জীবনে পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারগুলোতে মুসলিম বন্দীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতির তথ্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কারাবাসের সময় ইসলাম গ্রহণকারী বন্দীদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিয়েও সংবাদমাধ্যমে আলোচনা হয়েছে। তবে প্রতিবছর ঠিক কতজন বন্দী ইসলাম গ্রহণ করেন, তা নিশ্চিত করার মতো নির্ভরযোগ্য জাতীয় পরিসংখ্যান এখনো নেই।

তাই এ বিষয়ে প্রচলিত বড় অঙ্কের দাবিগুলো যাচাই ছাড়া নিশ্চিত তথ্য হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারগুলোতে ইসলাম গ্রহণের প্রকৃত চিত্র জানতে প্রয়োজন দেশব্যাপী আরও বিস্তৃত, পদ্ধতিগত ও নির্ভরযোগ্য গবেষণা।