যমুনা অয়েলে বরখাস্ত মিল্টন, তদন্তের বাইরে জিএম এইচআর মাসুদুল ইসলাম?

প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০২৬, ১৫:৩২ | অনলাইন সংস্করণ

  মোস্তফা সারোয়ার:

মিল্টন বরখাস্ত হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে জিএম এইচআর মাসুদুল ইসলাম

" যমুনা অয়েলে দ্বৈতনীতির বিস্ফোরক অভিযোগ, ডাকাতি মামলার আসামিকে বাঁচাতে তৎপর জিএম এইচ আর - - ডিপো ইনচার্জ " শিরোনামে ৫ মার্চ আমার বার্তায় একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়৷ সেদিনই তড়িঘড়ি ঘরে নিজেদের বাঁচাতে মানব সম্পদ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো: মাসুদুল ইসলাম ও বাঘাবাড়ি ডিপো ইনচার্জ আবুল ফজল মো: সাদেকিন দুজনের সমন্বয়ে  সেই আলোচিত কর্মচারী ( এক মাস সতের দিন হাজত বাস) অফিস সহকারী হোসাইন মো: ইসহাক মিল্টনকে ( দৈনিক হাজিরা ভিত্তিক) চাকরী থেকে বরখাস্ত করে। অবশ্য "নৌ ওয়ার্ক নৌ পে " এধরনের কর্মচারীদের বরখাস্তের বেলায় মৌখিক নির্দেশেই যথেষ্ট। তেমনটাই করা হয়েছে ইসহাক মিল্টনের বেলায়। দীর্ঘদিন হাজত বাস অতঃপর চাকরিতে যোগদান,  এতবড় জালিয়াতির ঘটনার সাথে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে  মানব সম্পদ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক  ও বাঘাবাড়ি ডিপো ইনচার্জের  বিরুদ্ধে। কিন্তু দুই কর্মকর্তার  বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।  এমনকি ওদের বিরুদ্ধে করা হয়নি কোন তদন্ত কমিটিও।  অবশ্য যমুনা অয়েলে এধরণের ঘটনা নতুন কিছু নয়। জেল হাজত থেকেও ছুটির আবেদন করে, আবার সেই ছুটি মন্জুর করার দৃষ্টান্ত রয়েছে এই জিএম এইচ আর মাসুদুল ইসলামের বেলায় । 

ক্ষমতাধর মাসুদুল ইসলাম, একসাথে পাঁচ পদের দায়িত্বে 

২০২৩ সালের ২৭ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটির জিএম এইচ আর পদে দায়িত্ব পান মো: মাসুদুল ইসলাম। সেই থেকে প্রতিষ্ঠানটিতে সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর কর্মকর্তা হিসেবে  নিজেকে পাকাপোক্ত করে তুলে।  তার ইশারায়  চলছে যমুনা ওয়েলের সকল  প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড। মার্কেটিং কিংবা হিউম্যান রির্সোস ম্যানেজম্যান্টের উপর নুন্যতম কোন ডিগ্রী নেই, শিক্ষাগত যোগ্যতা বিকম তৃতীয় শ্রেনী,শুধু মাত্র  চাটার্ড একাউন্টেসী কোর্স কমপ্লিট অথচ তিনি একই সাথে মহাব্যবস্থাপক মানবসম্পদ, মহাব্যবস্থাপক বিপনন, কোম্পানি সচিব,   বিটুমিন সরবরাহ  এবং অর্থ বিনিয়োগ কমিটির আহবায়কও। এছাড়া অল্প কয়দিন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের রুটিন  দায়িত্বও পালন করেছে৷ যমুনা অয়েলের প্রধান কার্যালয়ে আছে এই কর্মকর্তার পৃথক পৃথক তিনটি চেম্বার। অফিসারদের চেম্বার বন্টনের দায়িত্বেও তিনি ।এর সব কিছুর মুলে প্রতিষ্ঠানটির সদ্য বিদায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুস্তফা কুদরুত -ই ইলাহির আর্শীবাদে। অবশ্য প্রকৌশলী আমির মাসুদ নতুন এমডির দায়িত্ব নেয়ার পরেও সেই আগের মতোই রয়ে গেছে মাসুদুল ইসলামের ক্ষমতা। প্রতিষ্ঠানটিতে  নুন্যতম হেরফের ঘটেনি তার প্রভাব প্রতিপত্তি । এদিকে  ২০১৬ সালে যমুনা ওয়েলের আভ্যন্তরিন একটি তদন্ত কমিটি রিপোর্টে  মাসুদুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে।  তৎকালীন সময়ে তদন্ত কমিটি তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সুপারিশও করেছিল। কিন্তু যেই লাউ সেই কদু৷  এদিকে গত ২৭ নবেম্বর ২০২৫ তিনি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের রুটিন এর দায়িত্বও পায়,  ছিলেন ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত। দায়িত্ব পেয়েই প্রথমে তিনি প্রতিষ্ঠানটির সব চেয়ে বেশী দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ডিপো অপারেশন ইনচার্জ শেখ জাহিদ আহমেদকে পদায়ন করে এজিএম (ডি, বি) ইনচার্জের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে। 

মাসুদুল ইসলামের মহা জালিয়াতি

প্রতিষ্ঠানটিতে  নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলী সব কিছুতে  মাসুদুল ইসলামের একক নিয়ন্ত্রণ। কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারীদের অফিসে উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির বিষয়টি দেখভালের দায়িত্বও তিনিই করে থাকেন । চলতি বছরের ২৬ ফেব্রয়ারী ডিজিএম এইচ আর মোহাম্মদ হাসান ইমামের স্বাক্ষরে তিন সিবিএ নেতাকে সাময়িক  বরখাস্ত করা হয়েছে।  এই তিন সিবিএ নেতার বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে একাদিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে  আমার বার্তা। এদের বিরুদ্ধে গঠিত হয়েছে একাধিক তদন্ত কমিটিও।  তবে বরাবরই এই তিন সিবিএ নেতার হয়ে প্রকাশ্যে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে জিএম এইচ আর মাসুদুল ইসলামের বিরুদ্বে। কিন্ত মন্ত্রনালয়ের নির্দেশে শেষ পর্যন্ত এদেরকে এযাত্রায় বাঁচাতে পারেনি তিনি। বরখাস্তকৃত সিবিএ নেতাদের একজন আবুল হোসেন। তিনি যমুনা অয়েল লেবার ইউনিয়নের সভাপতি ও নিষিদ্ধ সংগঠন জাতীয় শ্রমিকলীগ বন্দর থানা শাখার সাধারণ সম্পাদক। সাময়িক বরখাস্তকৃত  সিবিএ এই নেতাকে দেয়া  চিঠিতে বলা হয়েছে  ২১ জুলাই হতে ৯ আগষ্ট ২০২৫ পর্যন্ত বিশেষাধিকার ছুটি ভোগ করেন। এরপর অনুপস্থিত,প্রাপ্ত তথ্য মতে কোতোয়ালী থানার জি আর মামলা নাম্বার ৪১৫/২০২৫ আবুল হোসেনকে গ্রেফতার করে ২১ জুলাই  চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজেষ্টেটের আদালতে প্রেরন করে। পরবর্তীতে আদালতের মাধ্যমে তাকে  কারাগারে প্রেরণ করে। এমতাবস্থায় সাময়িক বরখাস্ত করা হলো। অনুরুপ যমুনা ওয়েলের অপর  সিবিএ নেতা  এয়াকুবের বেলায়। এই সিবিএ নেতার বরখাস্তের চিঠিতে বলা হয়েছে ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে ১২ জানুয়ারী ২০২৬ পর্যন্ত ছুটি ভোগ করেছে, এর পর অনুপস্থিত। প্রাপ্ত তথ্যমতে চান্দাগাও থামায় একটি মামলায় তাকে  ১৩ ডিসেম্বর গ্রেফতার হয়ে, ১৪ ডিসেম্বরে আদালতের মাধ্যমে জেল খানায় প্রেরন করেছে ৷ এমতবস্থায় তাকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয় । মজার বিষয় হলো এই দুই সিবিএ নেতা যেদিন গ্রেফতার হলেন, সেদিন থেকেই ছুটি মন্জুর হলো কিভাবে?  তাছাড়া পুলিশ হেফাজতে থেকে তারা ছুটির আবেদনই বা  করলো কিভাবে?  অভিযোগ উঠেছে মাসুদুল ইসলাম  নিজেই এদের স্বাক্ষর দিয়ে ছুটির আবেদন করে এবং পরবর্তীতে তিনি নিজেই তা মন্জুর করেন৷ এছাড়া আবুল হোসেন বরখাস্ত হলো গ্রেফতারের দীর্ঘ আট মাস পর আর এয়াকুব বরখাস্ত হয়েছে মাত্র দুই মাসের মাথায় । 

এদিকে বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের সুবিধাবাদীদের ভালো জায়গায় পোষ্টিং ও পদোন্নতি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে মাসুদুল ইসলামের  বিরুদ্ধে৷  কোন নীতিমালা ও বিভাগীয় প্রধানদের সুপারিশ তোয়াক্কা না করে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে গত বছরের আগষ্টে  তার ইচ্ছে মতো পাঁচ জনের নামের প্রস্তাব পাঠায় পদোন্নতি সভায়। পরবর্তীতে সকলেই পদোন্নতিও পায়৷  যমুনা অয়েল সুত্রে জানা গেছে ২০২৫ সালের ৩১ আগষ্ট মাসুদুল  ইসলামের স্বাক্ষরিত পদোন্নতি প্রাপ্ত তালিকাদের মধ্যে অন্যতম হলো কুতুবউদ্দিন হোসেন৷ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থেকে জুনিয়র অফিসার পদে পদোন্নতি পাওয়া কুতুবউদ্দিন হলো নিষিদ্ধ সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামিলীগ  চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক, সাবেক মেয়র আজম নাসিরের চাচাতো ভাই । বিগত আওয়ামিলীগ  সরকারের আমলে আজম নাসিরের হাত ধরেই  তার চাকরীতে যোগদান।  তবে চাকরিতে যোগ দেয়ার পর থেকেই  অফিসের কোন শৃঙ্খলা তোয়াক্কা করেননি।  ইচ্ছে হলে অফিসে এসেছে  ইচেছ না হলে আসেনি। তার এহেন কর্মকাণ্ডের জন্য একবার খুলনা বিভাগীয় অফিসে বদলী করা হলেও আজম নাসিরের ক্ষমতার দাপটে সেই বদলি স্থগিত হয়ে যায়৷  কিন্তু বিতর্কিত এই কর্মচারীকে নিজের ইচেছমতো পদোন্নতি দিয়েছে জিএম এইচ আর মাসুদুলু ইসলাম। দ্বিতীয় পদোন্নতির তালিকায় আছে মো: সহীদুল আলম, তাকেও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থেকে জুনিয়র অফিসার পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে । তার চাকরিও হয়েছে বিগত আওয়ামিলীগ  সরকারের আলমে, তাও আবার  রাউজানের সাবেক এমপি ফজলে করিম চৌধুরীর আর্শীবাদে। এছাড়া সহীদুল আলম ছিল ছাত্রলীগের সাবেক দুর্ধর্ষ ক্যাডার ও রাউজান ডিগ্রি কলেজ ছাত্র সংসদের ছাত্রলীগের মনোনীত সাবেক ভিপি । বিগত সরকারের আমলে একদিনের জন্যও অফিসে যেতে হয়নি তাকে। কিন্তু  তাকে দেয়া হয়েছে পদোন্নতি । পদোন্নতির তালিকায় আরও আছে  ছাত্রলীগের ক্যাডার শেখ কামাল,  ইকরাম ও মীর আরিফ। তাদের প্রত্যেককে  কেরানি থেকে জুনিয়র অফিসার পদোন্নতি দেয়া হয়েছে । 

গেল বছরের শেষের দিকে ফতুল্লা ডিপোতে পৌনে চার লাখ লিটার  ডিজেল গায়েব হওয়ার ঘটনায় একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমাও দেয়া হয়েছে।  সব কটি তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হয়ে কথা বলেছে ফতুল্লা ডিপোর অফিসার ( অপারেশন)  ইমরান হোসেন। তিনি তুলে ধরার চেষ্টা করেছে মাসুদুল ইসলাম সিন্ডিকেটের অন্যতম খলিফা জয়নাল আবেদীন টুটুলের বিভিন্ন অনিয়মের ফিরিস্তি ও তেল চুরির কাহিনি। তবে তার এই প্রতিবাদই শেষ পর্যন্ত তার জন্য কাল হয়ে দাড়ায় । ২৪ নভেম্বর ২০২৫  মাসুদুল ইসলামের স্বাক্ষরে তাকে বদলী করা হয়েছে ঢাকা বিভাগীয় বিক্রয় অফিসে ( অফিসার সেলস পদে)। 

এদিকে ২০২০ সালের ২১ জুনে মাসুদুল ইসলাম  ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির ডিজিম ( একাউন্টস)। সেসময় জিএম অপারেশন বরাবর তার দেয়া একটা চিঠির বিষয়বস্তু হলো তেলের ক্ষতি প্রসঙ্গে। সেই চিঠিতে  বলা হয়, মংলা অয়েল ইনষ্টেশন ডিপোর এপ্রিল ২০২০ মাসের এফও এর ট্যাংকে মজুদ এবং লাভ / ক্ষতির সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা করে দেখা যায় যে, তেলের কোনো ধরনের অপারেশন বিহীন ২০ এপ্রিল ২০২০ তারিখে ৩১° সে: তাপমাত্রায় মোট ২৯৯২৫ লিটার কার্যকালীন ক্ষতি দেখানো হয়েছে। উল্লেখিত ক্ষতি কিভাবে সমন্বয় করা হবে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা এবং সদয় সিদ্ধান্ত প্রদানের জন্য অনুরোধ করা হলো । তবে এই ঘটনার পাঁচ বছর  হয়ে গেলেও কোন সুরাহা হয়নি । অভিযোগ উঠেছে এই ঘটনার সাথে অভিযুক্ত তৎকালীন মংলা ডিপো ইনচার্জ আনিসুর রহমানকে বরিশাল ডিপোর মতো ভালো জায়গায় পোষ্টিংয়ের ব্যবস্থা করে দেয় এই মাসুদুল ইসলাম। এরকম অসংখ্য অভিযোগ মাসুদুল ইসলামের বিরুদ্ধে। 

প্রতিষ্ঠানটিতে তার চাকরি জীবন শুরু ১৯৯৬ সালের ১৪ অক্টোবর। কর্মরত অবস্থায় গাড়ি কেনার ঋন পায় একবার কিন্তু মাসুদুল ইসলাম পেয়েছি দুবার। সিনিয়র একাউন্টস অফিস সময়কালী গাড়ি কিনতে ঋন নিয়েছে । এদিকে জিএম এইচ আর হওয়ার পর আগের ঋন সারেন্ডার করে নতুন করে আবেদন করে। পেয়েও যায় বিশ লাখ টাকার ঋন, কিন্তু গাড়ি না কেনে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে সেই টাকা । অবশেষে বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে বছর খানিক পরে সেই টাকা  ফেরত দেয় মাসুদুল ইসলাম। চাকরি জীবনে মালিক হয়েছে শত কোটি টাকার। চট্টগ্রাম হালিশহরের ব্লক এল, লেইন -১ রোড -১ বাড়ি নং ২২ দ্বিতীয় তলায় একটি ফ্ল্যাট রয়েছে তার । চউক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বাকলিয়ার কম্পোলেক আবাসিক প্রকল্পে  আছে দুটো প্লট। ইতিমধ্যে একটি প্লটে ভবন নির্মাণ শুরু করেছে। একই এলাকায় আছে বৃহৎ একটি ডেইরি ফার্ম। বিনিয়োগ করে রেখেছে  চট্টগ্রাম ষ্টক এক্সচেঞ্জে নামে বেনামে শত কোটি শেয়ার ।


আমার বার্তা/এমই