এনবিআর কর্মকর্তার সম্পদের পাহাড়: হাজার কোটি লুট করে পালালেন শহিদুল

পর্ব-১

প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২৬, ১৮:৩৮ | অনলাইন সংস্করণ

  ​মুনিরুল তারেক:

​# দেশে-বিদেশে সম্পদের ছড়াছড়ি

# ​আইনি ঝামেলা এড়াতে সপরিবারে দেশত্যাগ

# ​কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও দুবাইতে অর্থ পাচার

# সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে দুদকের তদন্তের আশ্বাস

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক ও আবগারি বিভাগের সাবেক সদস্য এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক শহিদুল ইসলামের যেন এক রূপকথার আলাদিনের চেরাগ রয়েছে। একজন সরকারি চাকুরিজীবী হয়েও নামে-বেনামে, স্ত্রী, সন্তান ও নিকট আত্মীয়দের ব্যবহার করে তিনি গড়ে তুলেছেন হাজার কোটি টাকার সম্পদের পাহাড়। ক্ষমতার অপব্যবহার, শুল্ক ফাঁকির সুযোগ তৈরি এবং পদ-পদবির অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে অর্জিত এই বিপুল বিত্তবৈভবের কাহিনী এখন সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে। অতি সম্প্রতি দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আইনি ঝামেলা ও দুদকের সম্ভাব্য চোখ এড়াতে তিনি এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করেন। হঠাৎ করেই গুরুতর অসুস্থতার বাহানা তৈরি করে তিনি নিজের স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বি এবং ছোট ছেলেকে নিয়ে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান। একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে যে তিনি মূলত দেশ থেকে পালিয়ে গেছেন এবং আইনি জটিলতার কারণে তার আর দেশে ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই।

​চাকরি জীবনে তিনি শুল্ক ও আবগারি বিভাগের সদস্য, কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিল ট্রাইব্যুনালের সদস্য এবং ঢাকার পশ্চিম জোনের কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারের মতো সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল নীতিনির্ধারণী পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। আর এসব লোভনীয় চেয়ারে বসেই তিনি মূলত ২০১০ সালের পর থেকে বিভিন্ন আমদানিকারক সিন্ডিকেট ও বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ শুল্ক রেয়াত বা কর ফাঁকির অবৈধ সুযোগ করে দিয়ে এই বিপুল সম্পত্তি অর্জন করেন। কাস্টমস ক্যাডারের একই গ্রেডের একাধিক প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তার বর্ণনায় জানা যায় যে দীর্ঘ চাকরি জীবনে সমস্ত বেতন, সরকারি স্কলারশিপ, বিদেশ সফর এবং অবসরকালীন সুযোগ-সুবিধা মিলিয়ে একজন সৎ কর্মকর্তার পক্ষে সর্বোচ্চ আড়াই থেকে তিন কোটি টাকা সঞ্চয় করা সম্ভব। কিন্তু শহিদুল ইসলাম ও তার স্ত্রীর নামে অর্জিত সম্পত্তি তাদের বৈধ আয়ের চেয়ে অন্তত একশত গুণ বেশি, যা কোনোভাবেই চাকরি জীবনের বৈধ আয় দিয়ে মেলানো সম্ভব নয়।

​শহিদুল ইসলামের এই লাগামহীন দুর্নীতি ও রাতারাতি শত কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়ার বিষয়টি দেশের সচেতন মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই বিষয়ে দুদকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট তথ্যসহ অভিযোগ পেলে অনুসন্ধান করে দেখা হবে।

​চতুর এই কর্মকর্তা কেবল দেশেই সম্পদ গড়েননি, বরং তার অর্জিত কালো টাকা হুন্ডির মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে পাচার করেছেন। তার দুই জমজ ছেলে কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষা শেষ করে সেখানেই স্থায়ীভাবে সেটেল হয়েছেন। মানুষের চোখ এড়ানোর জন্য তারা বিদেশে ভাড়া বাসায় থাকার নাটক করলেও বাস্তবে কানাডায় তাদের নিজেদের নামে দুটি বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে, যা থেকে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ টাকা ভাড়া বাবদ আয় হয়। এছাড়া অস্ট্রেলিয়াতেও তাদের নিজস্ব রাজকীয় আবাসন রয়েছে এবং দুবাইতে রয়েছে বড় ধরনের স্বর্ণের চোরাচালান ও জুয়েলারি ব্যবসা। এই আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের পেছনে শহিদুলের প্রভাব কাজ করেছে। শুধু তাই নয়, নিজের চেয়ার ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে আপন ভাই সেলিমকে চট্টগ্রামে সিঅ্যান্ডএফ এর দুটি লাইসেন্স পাইয়ে দিয়েছেন, যা দিয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমসে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ সিন্ডিকেট পরিচালনা করা হয়েছে। তার ছোট ভাই জাকিরের নামেও রয়েছে সমপরিমাণ বিপুল পরিমাণ অবৈধ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি।

​বিদেশে বিপুল অর্থ পাচারের পাশাপাশি দেশের মাটিতেও এই দম্পতি প্রথম পর্বের দৃশ্যমান সম্পদের বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। রাজধানীর অভিজাত আবাসিক এলাকা বসুন্ধরার জি ব্লকে ১০তলা একটি বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ করেছে এই সহিদুল দম্পতি, যার নাম দেওয়া হয়েছে শেল কবিতা। বর্তমানে দেশত্যাগের আগ পর্যন্ত তারা সেখানেই বসবাস করতেন। প্রতি ফ্লোরে আড়াই হাজার বর্গফুটের দুটি করে ফ্ল্যাট সম্বলিত এই ২০ ফ্ল্যাটের পুরো ভবনটিই তাদের নিজস্ব মালিকানাধীন। ফ্ল্যাট ব্যবসায়ীদের মতে জমিসহ এই পুরো ভবনের বর্তমান বাজারমূল্য কমপক্ষে একশত কোটি টাকা। এছাড়া বাংলামোটর এলাকার স্বজন টাওয়ারে সহিদুলের নিজ নামে দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে যার বাজারমূল্য প্রায় চার কোটি টাকা। শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় এবং নিউমার্কেটে তার নামে থাকা দুটি বাণিজ্যিক দোকানের বাজারমূল্য চার কোটি টাকারও বেশি। স্থাবর সম্পদের বাইরে তার স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বির নামে শেয়ারবাজারে একটি বিও অ্যাকাউন্টে প্রায় আশি কোটি টাকার বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে এবং সোনালী ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্টে নগদ প্যান্টান্ন লাখ টাকা জমা রয়েছে। এমনকি নিজের বড় ছেলে হাসিন ফারহানের ব্যবসার জন্য বসুন্ধরার বিলাসবহুল জেসিএক্স বিজনেস টাওয়ারে রাজকীয় অফিস খুলে দিয়েছেন এবং ভেলোসিটি গ্রুপের অধীনে মাল্টিপল এজেন্সির মূল পুঁজি হিসেবে নগদ পাঁচ কোটি টাকা প্রদান করেছেন। শহিদুল ইসলামের দুর্নীতির এই বিশাল ফাইল এখন তদন্তকারী সংস্থাগুলোর টেবিলে জমা পড়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

​সার্বিক বিষয়ে মন্তব্য জানতে শহিদুল ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যদের মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া মেলেনি।


আমার বার্তা/এমই