বিসিবিতে কি রদবদল? আদালতের রায়েই ঝুলছে বুলবুলের ভবিষ্যৎ
প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮:৩২ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

নিয়ম তো নয়, তবে রীতি বলা যায়। সরকার পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের অন্যান্য ক্ষেত্রের মত ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোয় পরিবর্তন আসে। ছাত্র-জনতার উত্তাল আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিসিবিসহ ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোয় এবং জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে।
এবার দীর্ঘ ১৭ বছর পর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল বিজয় ও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও আপসহীন নেত্রী ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। খুব স্বাভাবিকভাবেই ক্রীড়াঙ্গনে সেই পুরোনো প্রশ্নই নতুন করে দেখা দিয়েছে-বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশনে কি রদবদল ঘটবে?
যেহেতু বিসিবির নির্বাচনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েই ছিল নানা প্রশ্ন, তাই এই সংস্থা নিয়েই গুঞ্জন-কানাঘুষা বেশি। অনেকের প্রশ্ন, কী হবে বিসিবিতে? বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ কি বহাল থাকবে? নাকি ভেঙে যাবে? আমিনুল ইসলাম বুলবুল কি বোর্ড প্রধান থাকতে পারবেন? নতুন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক কী ভাবছেন?
সরকার পরিবর্তনের পর কিংবা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগে কোনো বোর্ড ভেঙে দিলে আইসিসির নিষেধাজ্ঞা জারি হতে পারে। বোঝাই যাচ্ছে, খেলার মাঠ থেকে মন্ত্রী হওয়া আমিনুল ইসলামের মাথায় তা খুব ভালোভাবে আছে। তিনি খুব ভালো করেই জানেন, আইনের পরিপন্থি কিছু করে বিসিবি, বাফুফেতে পরিবর্তন আনা মানেই আইসিসি-ফিফার নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়া।
নতুন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের কথাবার্তা ও আচরণে সে বার্তাই মিলেছে। তাই ক্রীড়ামন্ত্রী হওয়ার পর তিনি এখনো বিসিবি পরিচালনা পর্ষদ ভাঙা নিয়ে একটি কথাও বলেননি। বিএনপির ক্রীড়া সম্পাদক হিসেবে বিসিবি নির্বাচনের আগে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে অনেকের সঙ্গে আমিনুল হকও প্রশ্ন তুলেছিলেন। নির্বাচনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে সংশয় প্রকাশের পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টাসহ সরকারি প্রভাবের তীব্র সমালোচনাও ছিল আমিনুলের কণ্ঠে।
কারও কারও ধারণা ছিল, প্রশ্নবিদ্ধ ও অসচ্ছতার অভিযোগে দুষ্ট বিসিবি কমিটি ভাঙার চেষ্টাই হয়তো করবেন আমিনুল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কমিটি ভাঙার কথা বলা তো বহুদূরের কথা, ক্রীড়ামন্ত্রী হওয়ার পর আমিনুল হক বিসিবির কমিটি নিয়েই সেভাবে কোনো মন্তব্য করেননি।
মন্ত্রী হওয়ার রাতে নিজের বাসায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে এবং একাধিক সাক্ষাৎকারে বিসিবি নিয়ে অনেক সতর্ক, সাবধানী আচরণ আমিনুল হকের। কথাবার্তায় পরিষ্কার, তিনি আইসিসি, বিসিবি ও এনএসসির গঠনতন্ত্র পর্যালোচনা করে এবং আইনের ভেতরে থেকে সব কিছু করার কথা ভাবছেন। কাজেই ধরে নেওয়া যায় যে, নতুন ক্রীড়ামন্ত্রী হুট করে বা চটজলদি বিসিবি পরিচালক পর্ষদ ভাঙার কথা ভাবছেন না।
তবে ভেতরের খবর, পুরো বোর্ড না ভাঙলেও জেলা ও বিভাগ কোটা থেকে আসা ১০ পরিচালক এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের কোটার দুজনসহ ১২ পরিচালক পদে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা আছে। যেহেতু তিনি ঢাকা বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার কাউন্সিলরশিপ নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন, তাই খোদ বিসিবির বর্তমান সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলও পদ হারাতে পারেন।
কীভাবে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, এখন যে দল ২১৩ আসন পেয়ে বিপুল বিজয়ে সরকার গঠন করেছে, সেই বিএনপিপন্থিরাই গত বিসিবি নির্বাচন শেষ মুহূর্তে বয়কট করে।
জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালের নেতৃত্বে বিএনপিপন্থিরা প্রথম থেকেই বিসিবির নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব ও সরকারের প্রভাবের অভিযোগ তুলেছিল। পরে একদম শেষ মুহূর্তে গিয়ে তামিম ইকবালের নেতৃত্বে একটি বড় অংশ নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত ছিল।
শেষ মুহূর্তে বয়কট করা তামিম ইকবাল ও তার অনুসারীরা পুরো নির্বাচনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে ঢালাও অভিযোগ তুললেও মূলত জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার কাউন্সিলর নিয়োগে চরম অস্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের অভিযোগেই ছিল প্রবল সোচ্চার।
বলা যায়, জেলা ও বিভাগীয় কাউন্সিলর নিয়োগে খোদ বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম থেকে শুরু করে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ও সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের বিপক্ষে অভিযোগের তীর ছোড়ে তামিমের নেতৃত্বাধীন বয়কটকারীরা।
তাদের অভিযোগ, বিসিবি সভাপতি প্রচলিত আইন ও নিয়ম ভেঙে নিজে উদ্যোগী হয়ে বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার প্রধান তথা জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারদের কাছে কাউন্সিলরের তালিকা চেয়ে পাঠান, যা বিসিবি ও এনএসসির গঠনতন্ত্রবিরোধী। বিসিবি প্রধান সেটা পারেন না। সাধারণত বা অন্য সময় সেটা বিসিবি সিইও পাঠান।
সেটাই শেষ নয়। বিসিবি প্রধান আমিনুল ইসলাম বুলবুল জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারদের (যারা পদাধিকার বলে নিজ নিজ জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সভাপতিও) কাছে চিঠি দিয়ে নতুন করে কাউন্সিলর তালিকা বোর্ডে জমা দিতে বলেন। এবং পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে, কোনোভাবেই যেন জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার বাইরের কাউকে কাউন্সিলরশিপ দেওয়া না হয়। সেটাকেও আইনের পরিপন্থি বলে দাবি করে বিএনপিপন্থিরা। তার বিরুদ্ধে একটি রিটও করে তারা। কিন্তু বিসিবি পাল্টা রিট করলে আদালত কাউন্সিলরশিপ প্রক্রিয়ার শুনানির ওপর স্থগিতাদেশ প্রদান করেন।
সেই স্থগিতাদেশের ওপর ভিত্তি করেই বিসিবি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপিপন্থিরা নির্বাচন বয়কট করে। ক্রীড়াঙ্গনে গুঞ্জন, নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো অংশটা আগামীতে যদি সেই স্থগিতাদেশের শুনানির আবেদন করে এবং আদালত শুনানির সিদ্ধান্ত দেন, তাহলে কিন্তু জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার কাউন্সিলরশিপের ওপর নিষেধাজ্ঞা চলে আসতে পারে।
আদালত সেই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নতুন করে শুনানি দিলেই বিসিবির নির্বাচনে অংশ নেওয়া সেই সব কাউন্সিলরের কাউন্সিলরশিপ বাতিল হয়ে যেতে পারে। বলে রাখা ভালো, বিসিবিপ্রধান আমিনুল ইসলাম বুলবুল আর অন্যতম শীর্ষ পরিচালক নাজমুল আবেদিন ফারুক, আসিফ আকবর প্রমুখসহ জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার মনোনীত কাউন্সিলরশিপ বাতিল হতে পারে। খুব নীরবে নাকি সেই প্রক্রিয়াই চলছে।
তবে কাউন্সিলরশিপের ওপর করা রিটের স্থগিতাদেশ যদি নতুন করে শুনানি হয় এবং আদালত যদি কাউন্সিলরশিপ প্রক্রিয়াকে আইনবিরোধী বলে রায় দেন, তখনই কেবল বিসিবির জেলা ও বিভাগ কোটা থেকে আসা ১০ পরিচালকের ভাগ্য ঝুলে যেতে পারে।
আর যদি কাউন্সিলরশিপের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয় এবং আদালত জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার কাউন্সিলরশিপকে অবৈধ ঘোষণা করেন, তাহলে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল, অন্যতম শীর্ষ পরিচালক নাজমুল আবেদিন ফাহিম, আসিফ আকবরসহ জেলা ও বিভাগ কোটা থেকে নির্বাচিত ১০ পরিচালকের পদ বাতিল হয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের কোটার দুজনকেও সরকার তথা এনএসসি চাইলে পরিবর্তন করতে পারে। মানে ২৫ সদস্যের বোর্ড পুরো না ভেঙেও ১২ পরিচালক পদে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা আছে।
আমার বার্তা/এমই
