বিশ্বকাপ নিয়ে সিন্ডিকেটের হরিলুট, সম্প্রচার স্বত্ব কিনছে না বিটিভি
প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০২৬, ১০:৪১ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো বিশ্বকাপের সরাসরি সম্প্রচার স্বত্ব এবার কিনছে না বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সম্প্রচার স্বত্ব কেনা থেকে পিছিয়ে এসেছে বিটিভি। সেই সঙ্গে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব কেনার পুরো প্রক্রিয়া তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। রোববার এসব তথ্য জানান তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।
বাংলাদেশে বিশ্বকাপ ফুটবলের সম্প্রচার স্বত্বকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই মাঠের লড়াইয়ের বাইরে আরেকটি অদৃশ্য লড়াই শুরু হয়-কে আনবে সম্প্রচার স্বত্ব, কত দামে আনবে এবং শেষ পর্যন্ত বিটিভির কাছে তা কত দামে বিক্রি করবে। অভিযোগ রয়েছে, স্বত্ব কম দামে কিনে বিটিভির কাছে কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি করা হয়। আর এই অতিরিক্ত অর্থের বড় অংশ ভাগাভাগি করে মধ্যস্বত্বভোগীরা।
বিশ্বকাপ ফুটবলের সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি করে ফিফা। তারা অঞ্চলভিত্তিক বিভিন্ন সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানের কাছে স্বত্ব বিক্রি করে। দক্ষিণ এশিয়ার জন্য আঞ্চলিক সম্প্রচার গ্রুপগুলো এই স্বত্ব কিনে নেয়। পরে তারা বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল বা শ্রীলংকার টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর কাছে সেই স্বত্ব বিক্রি করে। এ প্রক্রিয়ার মধ্যেই তৈরি হয় মধ্যস্বত্বভোগীদের একটি বলয়। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কম দামে স্বত্ব কেনা হলেও বাংলাদেশে তা পৌঁছাতে পৌঁছাতে মূল্য কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
বাংলাদেশে বিশ্বকাপ ফুটবলের সবচেয়ে বড় দর্শক এখনো নির্ভর করে বিটিভির ওপর। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় বিশ্বকাপ মানেই বিটিভি। কেননা দেশের বহু মানুষ এখনো কেবল সংযোগ বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বাইরে। ফলে বিশ্বকাপের সময় বিটিভির ওপর চাপ থাকে যে কোনোভাবেই খেলা সম্প্রচার নিশ্চিত করার। আর এ সুযোগটাই কাজে লাগিয়ে আসছে ওই চক্র। ক্রীড়াসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক সম্প্রচার কোম্পানির কাছ থেকে কম দামে স্বত্ব কিনে পরে তা বিটিভির কাছে কয়েক গুণ দামে বিক্রি করে। ফলে বিটিভিকে শতকোটি টাকার বেশি ব্যয় করতে হয়। কিন্তু সেই অতিরিক্ত অর্থ কোথায় যায়, কীভাবে ভাগ হয়, তার হিসাব মেলে না।
এই বিতর্কে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম তমা গ্রুপ। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব বাংলাদেশে আনার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা ছিল এই প্রতিষ্ঠানের। অথচ তমা গ্রুপ একটি কনস্ট্রাকশন ফার্ম। তাদের মূল ব্যবসা রেলপথ, সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণকাজ। কিন্তু হঠাৎ করেই তারা বিশ্বকাপ ফুটবলের মতো একটি আন্তর্জাতিক সম্প্রচার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল।
ক্রীড়াঙ্গনের অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, কীভাবে একটি নির্মাণ কোম্পানি আন্তর্জাতিক সম্প্রচার স্বত্বের ব্যবসায় প্রবেশ করল?
ওই সময় তমা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতাউর রহমান ভূঁইয়া মানিক ছিলেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সহসভাপতি। একই সঙ্গে ফুটবল প্রশাসনের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা এবং একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হিসাবে তার ভূমিকা শুরু থেকেই প্রশ্নের মুখে পড়ে। ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, একজন ফুটবল প্রশাসক যদি বিশ্বকাপ সম্প্রচার স্বত্ব আনার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানের প্রধান হন, তাহলে সেখানে স্বার্থের সংঘাতের বিষয়টি অনিবার্যভাবে সামনে আসে। সূত্রগুলোর দাবি, কাতার বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব আন্তর্জাতিক বাজারে যে দামে পাওয়া গিয়েছিল, তার চেয়ে অনেক দামে বিটিভির কাছে তা বিক্রি করা হয়। বিভিন্ন সূত্রে বলা হচ্ছে, শতকোটি টাকার বেশি ব্যয়ে বিটিভি সেই স্বত্ব কিনেছিল। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে এর প্রকৃত মূল্য ছিল ২৮ কোটি টাকার কম। এই অতিরিক্ত অর্থই পরে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ভাগাভাগি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিভিন্ন মহলে আলোচনায় এসেছে সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদের নাম। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন দেশের ফুটবল প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে থাকা বাফুফের সাবেক সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনের নামও ছিল। একাধিক সূত্র বলছে, সম্প্রচার স্বত্ব বাণিজ্যের এই পুরো প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমর্থন ছাড়া এত বড় অঙ্কের লেনদেন সম্ভব ছিল না। এখানেই শেষ নয়। এই সিন্ডিকেটে আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি যুক্ত ছিলেন। তাদের মধ্যে সাবেক এক প্রভাবশালী সচিবের ছেলের নামও রয়েছে। একই সঙ্গে বাফুফের সদস্য ও সাবেক ফুটবলার গোলাম গাউস এবং বর্তমান বাফুফের একজন সহসভাপতির নামও বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, এই ব্যক্তিরা সম্প্রচার স্বত্বের বাণিজ্যে যুক্ত ছিলেন এবং অতিরিক্ত অর্থের ভাগ পেয়েছেন। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ কোনো বক্তব্য দেননি। বরং দীর্ঘদিন পুরো বিষয়টি ধোঁয়াশার মধ্যেই রয়ে গেছে। কারণ, বিটিভি কখনো প্রকাশ করেনি তারা কত দামে স্বত্ব কিনেছে। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে সেই স্বত্বের প্রকৃত মূল্য কত ছিল, তাও প্রকাশ করা হয়নি। ফলে কোটি কোটি টাকার এ ব্যবধানই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
বিশ্বকাপের সময় সম্প্রচার স্বত্ব নিয়ে এত প্রতিযোগিতা হওয়ার পেছনে রয়েছে বিপুল বিজ্ঞাপন বাজার। টেলিভিশন বিজ্ঞাপন বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপের সময় একটি জনপ্রিয় ম্যাচের আগে ও পরে ৩০ সেকেন্ডের একটি বিজ্ঞাপনের দাম সাধারণ সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ফাইনাল ম্যাচের সময় একটি স্লটের মূল্য কয়েক লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। বিশ্বকাপজুড়ে একটি বড় টেলিভিশন চ্যানেল কয়েকশ কোটি টাকা বিজ্ঞাপন আয় করতে পারে। ফলে সম্প্রচার স্বত্বের পেছনে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করলেও তা পরে বিজ্ঞাপন থেকেই তুলে আনার সুযোগ থাকে। আর এ কারণেই বিশ্বকাপ সম্প্রচার স্বত্বকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি বিশাল ব্যবসা। কাতার বিশ্বকাপের সময় সেই ব্যবসা ঘিরেই সিন্ডিকেটের ভেতরে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। ক্রীড়াঙ্গনের একাধিক সূত্রের দাবি, স্বত্ব বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থের ভাগাভাগি নিয়ে সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। বিশেষ করে কাজী সালাউদ্দিনের সঙ্গে কয়েকজনের দূরত্ব তৈরি হয়। বাফুফের কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা দাবি করেন, কে কত টাকা পেয়েছেন এবং কার ভাগ কমবেশি হয়েছে, এই হিসাব নিয়েই বিরোধ শুরু হয়। সেই বিরোধ পরে সিন্ডিকেটের ভেতরে ফাটল তৈরি করে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই সামনে এসেছে নতুন একটি বিশ্বকাপ। ক্রীড়াঙ্গনের সূত্র বলছে, এবারও একই ধরনের একটি গোষ্ঠী বিটিভির কাছে প্রায় ২০০ কোটি টাকার বিনিময়ে সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রির প্রস্তাব দেয়। কিন্তু এবার আগের মতো সহজে রাজি হয়নি বিটিভি। কারণ, ২০২২ সালের অভিজ্ঞতার পর এবার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থার ভেতরেও প্রশ্ন উঠেছে, যে স্বত্ব আন্তর্জাতিক বাজারে কম দামে পাওয়া সম্ভব, সেটির জন্য কেন ২০০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে? তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানান, ‘দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিটিভি বিশ্বকাপ ফুটবলের সরাসরি সম্প্রচার স্বত্ব কিনবে না। তবে দর্শকরা যাতে খেলা দেখতে পারেন, সেজন্য বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তার এ বক্তব্য থেকেই পরিষ্কার, সরকার এবার অতীতের বিতর্কিত পথে হাঁটতে চাইছে না। মন্ত্রী আরও জানান, ‘২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব কেনার পুরো প্রক্রিয়া তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারণ, বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তদন্তে দেখা হবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রকৃত মূল্য কত ছিল, বিটিভি কত টাকা দিয়েছে, কোন প্রক্রিয়ায় স্বত্ব দেশে আনা হয়েছিল এবং কারা এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিল।’
ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, এ তদন্ত যদি শেষ পর্যন্ত হয়, তাহলে বহুদিন ধরে আলোচিত সিন্ডিকেটের চেহারা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বকাপ সম্প্রচার স্বত্ব কেনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে একটি স্বচ্ছ নীতিমালা তৈরি করতে হবে। বিটিভি যদি সরাসরি আন্তর্জাতিক সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে স্বত্ব কেনে, তাহলে খরচ অনেক কমবে। পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমে যাবে। এর ফলে কোটি কোটি টাকার অস্বচ্ছ লেনদেনও বন্ধ হবে।
বিশ্বকাপ ফুটবল বাংলাদেশের মানুষের কাছে শুধু খেলা নয়, এটি আবেগ, উৎসব এবং সামাজিক উন্মাদনার নাম। সেই আবেগকে পুঁজি করে যদি একটি সিন্ডিকেট বছরের পর বছর রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটে নেয়, তাহলে তা শুধু ক্রীড়া প্রশাসনের জন্য নয়, পুরো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার জন্যই লজ্জার। এখন দেখার বিষয়, তদন্তের মাধ্যমে সেই অদৃশ্য বলয় ভাঙা যায় কি না, নাকি এবারের বিশ্বকাপেও আবার সক্রিয় হয়ে উঠবে পুরোনো সেই সিন্ডিকেট। সূত্র : যুগান্তর
