কার জন্য গড়লেন এই দুনিয়া ?কথা গুলা বলেছিলেন বিবেকের প্রতিষ্ঠাতা কুমিল্লার ক’রোনা যোদ্দ্বা: ইউসুফ মোল্লা টিপু

শুক্রবার, জুন ২৬, ২০২০ ১০:১০ পূর্বাহ্ণ

আমাদের ২৭ তম দাফনের কিছু ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা আজকে তুলে ধরার চেষ্টা করছি,
গত রাত আনুমানিক দুইটা আমার অত্যন্ত পরিচিত একটি ছেলের ফোন আসলো, বলছিল ভাই আমার এলাকার একটি লোক মা’রা গিয়েছে, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে আমার এক বড় ভাই সৌদি আরব থেকে আমার কাছ থেকে আপনার নাম্বার চেয়েছে আপনারা কি দাফনটা করে দিবেন?

আমি বললাম ঠিক আছে নাম্বার দিয়ে দাও অবশ্যই করে দিব ইনশাআল্লাহ, আমি ওকে বলে ছিলাম আমি এখন ঘুমাবো তুমি তাড়াতাড়ি আমাকে জানাও ওর ফোনের অপেক্ষা করতে করতে প্রায় রাতের ২:৩০টা ফোন আসতে ছিল না,

আমি ফোন করে বললাম আমিতো ঘুমাবো তুমি কি কথা বলেছ ও বলল জ্বি ভাই আমি কথা বলেছি উনারা বলছে, উনাদের এলাকায় নাকি নিজস্ব লোকজন আছে উনারা করবে আমি বললাম আলহামদুলিল্লাহ. এইতো অনেক ভালো খবর এভাবে প্রতিটি এলাকায় সবাই এই কাজটা করা উচিত, ঠিক আছে তাহলে। আমি ঘুমিয়ে গেলাম তুমিও ঘুমাও ও বলল ঠিক আছে ভাই।

আমি ফোন অফ করে ঘুমিয়ে গেলাম সকাল পৌনে আটটায় মোবাইল ওপেন করলাম সাথে সাথে ফোন বেজে উঠল রিসিভ করতেই হাউমাউ করে কাঁ’দছিল একটি ছেলে, বললাম কি ব্যাপার কি হয়েছে বলছে ভাই আমার ভাই মা’রা গেছে কাল রাতে আপনার সাথে কথা বলা হয়েছিল আমি বললাম হ্যা আপনাদের না এলাকার মানুষ দাফন করে দেওয়ার কথা,

সে কাঁদতে কাঁদতে বলছে জি না ভাই এলাকার মানুষ না আমি রাতে একটা টিমের সাথে কথা বলেছিলাম মেডিকেল কলেজ থেকে একটা টিমের কথা আমাকে বলেছিল ওই টিমের উনারা বলেছে সাতটার মধ্যে চলে আসবে কিন্তু এখন আটটা বাজছে উনাদেরকে আমি বহুবার ফোন দিয়েছি উনারা ফোন ধরছেন না.

আমি বললাম ঠিক আছে আবার ট্রাই করে দেখো সে আমার কথা মানতে নারাজ বলছে ভাই আপনি কি আমার ভাইকে একটু দাফন করে দিবেন, আমি বললাম ভাইয়া সবাই ঘুমাচ্ছে এখন তুমি যদি বলো তাহলে আমি ঘুম থেকে উঠিয়ে সবাইকে রেডি করে নিয়ে আসতে এক ঘন্টা লাগবে,

সে বলল জী ভাই আমি সারারাত হসপিটালে বসে আছি আমার ভাইকে নিয়ে আমার ভাইয়ের লাশ টা নিয়ে আমি কোথায় যাব কি করব আমি দিশেহারা আমার এখন আল্লাহ ছাড়া কেউ নেই, আপনি দয়া করে আমার এই উপকারটুকু করেন,

আমি বললাম ঠিক আছে আমরা কি মেডিকেল কলেজ থেকে মৃ’তদেহটা আনতে হবে না কি তুমি নিয়ে আসবা সে বলল ভাই আমি একটা এম্বুলেন্স কথা বলে রেখেছি, আমি বললাম ওকে তুমি সে এম্বুলেন্সে উঠিয়ে রাখো আমি কল দিলে তুমি রওনা করবা আমরা একসাথে চলে যাব সে বলল ঠিক আছে ভাই,

আমরা ৯টার মধ্যে প্রস্তুত হলাম ওকে কল দিলাম রওয়ানা করো আমরা তার জন্য অপেক্ষায় ছিলাম সে আমাদের গাড়ির বহরে তার ভাইয়ের মৃ’তদেহ নিয়ে যুক্ত হলো, তার বাড়ি ১নং বিজয়পুর ইউনিয়ন,বেলতলী ,গাবতলী,আর মৃত ব্যক্তি আবুল কালাম তার বড় ভাই।

ওখানে গিয়ে দেখলাম জনশূন্য তাদের বাড়ির সামনেই একটি চৌরাস্তা রয়েছে সেখানে অনেকগুলো দোকান রয়েছে আমরা যাওয়ার পর পর আস্তে আস্তে দোকানগুলো বন্ধ হয়ে গেল তার বাড়ির ভিতরে গিয়ে দেখলাম পি পি ই পড়া একজন ভদ্রলোক,

জিজ্ঞেস করলাম মৃ’ত ব্যক্তি আপনার কি হয় বলল ছেলে আর আমাদেরকে নির্দেশ দিতে থাকলো গোসলের ব্যবস্থা করলো একটু জঙ্গলের মত একটি জায়গায় এবং গোসলের জন্য একটি মশারি লাগিয়ে রেখেছে আর এক সাইডে একটি বিছানা চাদর যাহার ভিতর থেকে গোসলের দৃশ্য সব দেখা যাবে,

আমাদের টিমের সদস্যরা সেখানে গোসল করাতে রাজি নয় জায়গাটা কা’দাযুক্ত অনেক নরম কিন্তু তার বাবা বলছে ওখানেই করতে হবে, আমি বুঝতে পারলাম বাবা চাচ্ছে না ফ্রেশ কোন জায়গায় তার গোসল হোক, আমি টিমের সদস্যদের কে বললাম খাটিয়ার নিচে ইট দিয়ে দাও রনি ও ছোটন তাই করল মজবুত করে খাটিয়া রাখল এবং তাদের ঘর থেকে আরো দুটি বিছানা চাদর এনে ভালো করে গোসলে জায়গাটি ঢেকে দিলাম,

তারপর অ্যাম্বুলেন্স থেকে মৃ’তদেহ নামিয়ে গোসল দিল, কাফনের কাপড় আনলো দুই হাত বহরের যা দিয়ে মৃ’ত ব্যক্তি কে কিছুতেই হচ্ছিল না অনেক কৌশলে আমাদের টিমের সদস্যরা অনেক কষ্টে কাপড় পরিধান করায়, এখন জানাজার জন্য প্রস্তুত, সবাইকে ডাকছিলাম অনেক দূর থেকে কমপক্ষে ৩০থেকে ৪০ জন লোক দেখছিল, উনাদেরকে ডাকলাম জানাজায় আসার জন্য এত লোকের মাঝখান থেকে একজন লোক এলো জানাযায়।

তার বাবা নিজেকে অনেক দূরত্ব বজায় রেখে জানাজায় অংশগ্রহণ করলো, তার ছোট ভাই সার্বক্ষণিক আমাদের সাথে ছিল,জানাজা সম্পন্ন করে রওয়ানা করলাম কবরস্থ করার জন্য, যাচ্ছিলাম চৌরাস্তা দোকানগুলোর সামনে দিয়ে সকল দোকানিরা দোকানগুলো বন্ধ করে অনেক দূরে চলে গেল,

মেইন রোড থেকে কবরস্থান এর দূরত্ব কম করে হলেও ৩০০ মিটার হবে, কোন রাস্তা নেই দেখে অবাক হলাম চিন্তায় পড়ে গেলাম এই ধান ক্ষেত, মাঠ, পুকুরপাড়, বিভিন্ন টাইপের জমির উপর দিয়ে কিভাবে নিয়ে যাব, সবাই বলল আল্লাহ ভরসা নিতে তো হবেই, তার ছোট ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম তোমাদের কবরস্থানের এই অবস্থা কেন?

সে বলল ভাই আমার বড় ভাই মৃত্যুর পূর্বে আইসোলেশন এ আমাকে বলেছিল আমি যদি মরে যাই আমার কবর আমার দাদার কবরের পাশে দিবা, আমি জিজ্ঞেস করলাম তারপর? সে বলল এই সমাজের লোকেরা আমার দাদার কবরের পাশে, আমাদের পারিবারিক গোরস্থানে আমার ভাইয়ের লাশ কবরস্থ করতে নিষেধ করেছে,

আমাদেরকে ওই কবরে কবরস্ত করার জন্য দেখিয়ে দিয়েছে এই কথা শুনে চোখের পানি ধরে রাখতে পারি নাই এক হচ্ছে মৃ’ত ব্যক্তি বুঝে গিয়েছিল যে সে ইন্তেকাল করবে অপরটি হচ্ছে এই কেমন নি’ষ্ঠুরতা এই কেমন সমাজ ব্যবস্থা এই নগরীতে বা নগর এর আশেপাশের এলাকায় এরকম চিত্র আমাদের দেখতে হবে আমি কখনো ভাবি নাই,

আপনারা ছবিগুলো দেখলে বুঝতে পারবেন এই মৃ’তদেহ’টি কবরস্থ করতে আমাদের টিমের সদস্যদের কতই না কষ্ট করতে হয়েছে ধানক্ষেত, মাঠ, পুকুরপাড় সবকিছু ঠেলে প্রায় ৩০০ মিটার পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে আমরা সমাজের নির্ধারিত ক’বরস্থানে পৌছালাম এবং ওই মৃ’ত ব্যক্তি কে আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে কবরস্ত করতে পেরেছি,

ক’বরস্ত করার পর তার বাবা জিজ্ঞেস করছিল দুই তিন দিন পরে কি আমরা ক’বরস্থানে আসতে পারবো? আমাদের কোন সমস্যা হবে না তো? আমাদের টিমের এক সদস্য উনাকে বলছিল আপনি কি মৃ’ত ব্যক্তির আপন বাবা? আমি ওকে ধ’মক দিয়ে চুপ করিয়ে দিই,

আমি তার বাবাকে বললাম আপনার ছেলে কি আমাদের কিছু হয়? বলল না, আমরা আপনার সন্তানকে এত আদর দিয়ে এত যত্ন করে গোসল দিয়ে জানাজা দিয়ে কবরস্থ করলাম আপনি সবকিছু দূর থেকে দেখেছেন আমরা যদি এত কিছু করতে পারি আপনি তিন দিন পরে আপনার সন্তানের কবরস্থানে আসতে পারবেন না কেন?

আপনার কোন সমস্যা হবে না আপনি এসে কবরটা ঠিক করে দিবেন। পরিশেষে আমরা মুনাজাতের মাধ্যমে দা’ফন সম্পন্ন করি আলহামদুলিল্লাহ”।

পরিশেষে আপনাদের নিকট মরহুমের জন্য দোয়া কামনা করছি,মহান আল্লাহ যেন মরহুমকে জান্নাত নসিব করেন।