কোরআন হাদিসের দৃ’ষ্টিতে গ’র্ভবতীর ওপর সূ’র্যগ্রহণের প্রভাব

রবিবার, জুন ২১, ২০২০ ১১:১৮ পূর্বাহ্ণ

আবদুর রহমান। পেশায় নির্মাণ শ্রমিক। সদ্যবিবাহিত ২৫ বছর বয়সী যুবকটি কস্কেবাসের’ নাশতা করার জন্য একটি দোকানে এলেন। এক টুকরা কেক আর একটি কলা খাবেন। একটি জোড়া কলা নিতে গেলে পাশে বসা একজন বৃদ্ধ বলে উঠলেন, ‘না!

জোড়া কলা খাবেন না। খেলে যমজ স’ন্তান হবে। ’ ‘জোড়া কলা খেলে যমজ স’ন্তান হবে’—এমন অনেক বি’শ্বাস সমাজে প্রচলিত। এগুলোর একটি হলো চ’ন্দ্র বা সূ’র্যগ্র’হণের সময় গ’র্ভবতী মা যদি কিছু কা’টাকা’টি করেন, তাহলে গ’র্ভস্থ স’ন্তান কান কা’টা বা ঠোঁট কা’টা অবস্থায় জ’ন্ম নেয়।

এ সময় গর্ভবতী নারীদের ঘুম বা পানাহার থেকে বা’রণ করা হয়। আসলে কোরআন ও হাদিসে এ ধরনের বি’শ্বাসের অ’স্তিত্ব কতটুকু?

প্রতিনিয়ত মহান আল্লাহ তাআলার অ’স্তিত্বের জানান দিতে থাকা সৃ’ষ্টিগুলোর বড় দুটি হলো সূ’র্য ও চ’ন্দ্র।

১৩ লাখ ৯৪ হাজার কিলোমিটার ব্যা’সের এ ন’ক্ষত্রের সঙ্গে পৃথিবী ও জীবজগতের স’ম্পর্ক সুনিবিড়। সূ’র্যের তাপে মহান আল্লাহ সতেজ আর সজীব রেখেছেন পৃথিবীর সব কিছু। উ’দ্ভিদ এই সূ’র্যালোক থেকে খাদ্য গ্র’হণ করে। যদি পৃথিবীতে সূ’র্যের তা’প ও আলো না আসত, তাহলে বি’পন্ন হতো প্রা’ণিকুলের জীবন। পুরো পৃথিবী পরিণত হতো একখণ্ড ব’রফে। অন্যদিকে সূ’র্য যদি তার ভেতরকার সব তা’প পৃথিবীর ওপর উগড়ে দিত, তাহলেও পৃথিবী পরিণত হতো শ্ম’শানে।

পবিত্র কোরআনে গু’রুত্বের স’ঙ্গে স্থা’ন পেয়েছে সূ’র্য ও চ’ন্দ্র প্র’সঙ্গ। আমরা বাংলায় সূ’র্যালোক অথবা চ’ন্দ্রালোক বলি। ইংরেজিতে বলি Sunlight এবং Moonlight। কিন্তু পবিত্র কোরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনিই সত্তা, যিনি সূ’র্যকে কি’রণোজ্জ্বল ও চাঁ’দকে স্নি’গ্ধ আলোয় আলোকিত করেছেন। ’ (সুরা ইউনুস : ৫) অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আমি সৃ’ষ্টি করেছি একটি প্র’জ্বলিত বাতি।’ (সুরা নাবা : ১৩)

সূ’র্যের আলোচনায় কোরআনুল কারিমে সব জায়গায়ই ‘প্র’জ্বলিত বাতি’, ‘তে’জোদী’প্ত’, ‘উ’জ্জ্বল জ্যো’তি’, ‘চ’মক/ঝ’লক’, ‘শিখা’ বলা হয়েছে। যার অ’র্থ সূ’র্য নিজে দহ’নক্রিয়ার মাধ্যমে প্র’চণ্ড তা’প ও আলো উৎ’পন্ন করে; প’ক্ষান্তরে চাঁদের আলোচনায় বলা হয়েছে, ‘স্নি’গ্ধ আলো’। বিজ্ঞানও গবেষণা করে ঠিক তা-ই বলেছে। বিজ্ঞান বলছে, সূ’র্য তার কেন্দ্রভাগে নি’উক্লীয় সং’যোজন বি’ক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতি সেকেন্ডে ৬২ কোটি মে’ট্রিক টন হা’ইড্রোজেন পু’ড়িয়ে হি’লিয়াম উৎপাদন করে।

সূ’র্যপৃ’ষ্ঠের তা’পমাত্রা ৫৭৭৮ কেলভিন বা ৫৫০৫ ডি’গ্রি সে’লসিয়াস। অর্থাৎ বি’জ্ঞানের ব’ক্তব্যেও সূ’র্যই তা’পশ’ক্তির ও আলোর প্রধান উৎ’স। প’ক্ষান্তরে চাঁ’দের ব্যাপারে বি’জ্ঞানের ব’ক্তব্য হলো, চাঁদের নি’জস্ব কোনো আলো নেই। সূ’র্যের প্র’তিফলিত আলোই তার স’ম্বল। পবিত্র কোরআন আরো স্প’ষ্ট করে বলছে, ‘আল্লাহ চাঁদকে স্থা’পন করেছেন আ’লোরূপে, আর সূ’র্যকে স্থা’পন করেছেন প্র’দীপ’রূপে। ’ (সুরা নুহ : ১৬)

চ’ন্দ্র ও সূ’র্যগ্রহণ হলো আল্লাহ তাআলা ক’র্তৃক নির্ধারিত একটি প্র’ক্রিয়া। চাঁদ যখন প’রিভ্রমণ অ’বস্থায় কি’ছুক্ষণের জন্য পৃথিবী ও সূ’র্যের মাঝখানে এসে পড়ে, তখন পৃথিবীর কোনো দ’র্শকের কাছে কিছু সময়ের জন্য সূ’র্য আং’শিক বা স’ম্পূর্ণরূপে অ’দৃশ্য হয়ে যায়। এটাই সূ’র্যগ্রহণ (Solar eclipse) বা কুসুফ। আর পৃথিবী যখন তার প’রিভ্রমণ অ’বস্থায় চাঁদ ও সূ’র্যের মাঝখানে এসে পড়ে, তখনই পৃ’থিবীপৃ’ষ্ঠ থেকে চাঁদ কিছুক্ষণের জন্য অ’দৃশ্য হয়ে যায়। এটাই চ’ন্দ্রগ্রহণ (Lunar eclipse) বা খু’সুফ।

সূ’র্য ও চ’ন্দ্রগ্রহণ নিয়ে আমাদের সমাজে অনেক কু’সংস্কার আছে। ওই সময় খেতে নেই, তৈরি করা খাবার ফেলে দিতে হবে, গ’র্ভবতী মায়েরা এ সময় যা করেন, তার প্র’ভাব স’ন্তানের ওপর পড়ে, চন্দ্র বা সূ’র্যগ্রহণের সময় যদি গ’র্ভবতী নারী কিছু কা’টাকা’টি করেন, তাহলে গর্ভ’স্থ স’ন্তানের ক্ষ’তি হয়—এটি ভুল বি’শ্বাস।

এ সময় কোনো নারীকে ঘুম বা পানাহার থেকে বারণ করাও অ’ন্যায়। ইসলামী শরিয়াহ ও বা’স্তবতার স’ঙ্গে এগুলোর কোনো মিল নেই। জা’হেলি যু’গেও এ ধরনের কিছু ধারণা ছিল। সেকালে মানুষ ধা’রণা করত যে চ’ন্দ্রগ্র’হণ কিংবা সূ’র্যগ্র’হণ হলে অ’চিরেই দু’র্যোগ বা দু’র্ভিক্ষ হবে। চন্দ্র বা সূ’র্যগ্র’হণ পৃথিবীতে কোনো ম’হাপু’রুষের জ’ন্ম বা মৃ’ত্যুর বার্তাও বহন করে বলে তারা মনে করত।

বি’শ্বমানবতার পরম ব’ন্ধু, মহান সং’স্কারক, প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সেগুলোকে ভ্রা’ন্ত ধারণা হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রত্যাখ্যান করেছেন। মুগিরা ইবনু শুবা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পুত্র ইবরাহিমের ই’ন্তিকালের দিনটিতেই সূ’র্যগ্র’হণ হলে আমরা বলাবলি করছিলাম যে নবীপুত্রের মৃ’ত্যুর কারণেই সূ’র্যগ্র’হণ হয়েছে। এসব কথা শুনে নবীজি (সা.) বললেন, ‘সূ’র্য ও চ’ন্দ্র আল্লাহ তাআলার অগণিত নিদর্শনের দুটি। কারো মৃ’ত্যু বা জ’ন্মের কারণে চ’ন্দ্রগ্র’হণ বা সূ’র্যগ্র’হণ হয় না। ’ (সহিহ বুখারি : ১০৪৩)

চন্দ্র বা সূ’র্যগ্র’হণকে আল্লাহ তাআলার কুদরত হিসেবে অভিহিত করে অন্য হদিসে নবীজি (সা.) সাহাবিদের চ’ন্দ্র বা সূ’র্যগ্র’হণের সময় নামাজ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কোনো লোকের মৃ’ত্যুর কারণে কখনো সূ’র্যগ্র’হণ বা চ’ন্দ্রগ্র’হণ হয় না। তবে তা আল্লাহ তাআলার নিদর্শনগুলোর দুটি। তোমরা সূ’র্যগ্র’হণ বা চ’ন্দ্রগ্র’হণ হতে দেখলে নামাজে দাঁড়িয়ে যাবে। (সহিহ বুখারি : ৯৮৪)

নবীজি (সা.)-এর হাদিসগুলো থেকে এটিই প্র’তীয়মান হয় যে চ’ন্দ্রগ্র’হণ বা সূ’র্যগ্র’হণের কোনো প্র’ভাব সৃ’ষ্টির ওপর পড়ে না। সমাজে প্রচলিত বি’শ্বাসগুলো নিছকই কু’সং’স্কার।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি এর নেতিবাচক কোনো প্র’ভাব সৃ’ষ্টির ওপর না-ই পড়বে, তাহলে কেন নবীজি (সা.) এ সময় নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহ তাআলার সাহায্য চাইতে বলেছেন? শুধু নামাজে দাঁড়াতেই বলেননি, বরং চ’ন্দ্র বা সূ’র্যগ্র’হণে তিনি কিয়ামতের ম’হাপ্র’লয়ের আ’শঙ্কাও করেছেন। হজরত আবু মুসা (রা.) বলেন, নবীজি (সা.)-এর সময় সূ’র্যগ্র’হণ হলে তিনি এ আ’শঙ্কা’য় করলেন যে কি’য়ামতের ম’হাপ্রলয় বুঝি সং’ঘটিত হবে। তিনি (তাড়াতাড়ি) মসজিদে এলেন। অত্যন্ত দীর্ঘ কিয়াম, দীর্ঘ রুকু, সিজদাসহ নামাজ আদায় করলেন। (বর্ণনাকারী বলেন) আমি নবীজি (সা.)-কে এমন করতে আগে আর কখনো দেখিনি। অতঃপর তিনি বললেন, ‘আল্লাহর প্রেরিত এসব নিদর্শন কারো মৃ’ত্যু বা জ’ন্মের (ক্ষ’তি করার) জন্য হয় না। যখন তোমরা তা দেখবে, তখনই আ’ত’ঙ্কিত হৃদয়ে আল্লাহ তাআলার জিকির ও ই’স্তিগফারে ম’শগুল হবে। ’ (সহিহ মুসলিম : ১৯৮৯) অন্য হাদিসে চ’ন্দ্র বা সূ’র্যগ্রহ’ণকে আল্লাহর পক্ষ থেকে ভী’তি প্র’দর্শন হিসেবে উল্লেখ করে তা থেকে দ্রুত উ’দ্ধারে সদকা করার কথা বলেছেন।

নবীজি (সা.) তাঁর উ’ম্মতকে চ’ন্দ্র বা সূ’র্যগ্র’হণে আ’তঙ্কিত হয়ে তা থেকে উ’দ্ধার পাওয়ার জন্য নামাজের নির্দেশ দিয়েছেন। আধুনিক বি’জ্ঞানও বলছে যে সত্যি চ’ন্দ্র বা সূ’র্যগ্র’হণ পৃথিবীর জন্য আ’তঙ্কের বিষয়। সৌর’জগতে ম’ঙ্গল ও বৃহ’স্পতির ক’ক্ষপথের মধ্যবলয়ে অ্যা’স্টেরয়েড (Asteroid), মিটি’ওরা’ইট (Meteorite), উ’ল্কাপি’ণ্ড প্র’ভৃতি পাথরের এক সুবিশাল বেল্ট আছে বলে বিজ্ঞানীরা ১৮০১ সালে আ’বিষ্কার করেন। এ বেল্টে ঝু’লন্ত একেকটা পাথরের ব্যাস ১২০ থেকে ৪৫০ মাইল। গ্র’হাণুপু’ঞ্জের এ পা’থরখণ্ড’গুলো প’রস্পর সং’ঘর্ষের ফলে অনেক ক্ষু’দ্র ক্ষু’দ্র পাথরখ’ণ্ড প্রতিনিয়ত পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে। কিন্তু সেগুলো বা’য়ুমণ্ডলে এসে জ্ব’লে-পুড়ে ভ’স্ম হয়ে যায়। কি’ন্তু গ্র’হাণুপু’ঞ্জের বৃ’হদাকা’রের পা’থরগুলো যদি পৃথিবীতে আ’ঘাত করে, তাহলে ভ’য়াবহ হু’মকির স’ম্মুখীন হবে পৃথিবী। বিজ্ঞানীরা বলেন, সূ’র্য ও চ’ন্দ্রগ্র’হণের সময় সূ’র্য, চ’ন্দ্র ও পৃথিবী একই স’মান্ত’রালে, একই অ’ক্ষ বরাবর থাকে বলে এ সময়ই গ্র’হাণুপু’ঞ্জের ঝু’লন্ত বড় পা’থরগুলো পৃ’থিবীতে আ’ঘাত হানার আ’শঙ্কা বেশি। বৃহদাকারের পাথর পৃথিবীর দিকে ছুটে এলে পৃথিবীর বা’য়ুমণ্ডলের পক্ষে তা প্রতিহত করা অ’সম্ভব। ‘ধ্বং’সই হবে পৃথিবীর পরিণতি।

তাই তো ম’হাবি’জ্ঞানী আল্লাহ তাআলার প্রিয়তম হাবিব মুহাম্মদ (সা.) এ সময় আল্লাহর কাছে সা’হায্য চেয়েছেন। আমাদের উচিত কু’সংস্কা’রগুলো পরিহার করে সুন্নত অনুযায়ী চ’ন্দ্র বা সূ’র্যগ্র’হণের সময় এর ক্ষ’তিকর প্র’ভাব থেকে নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে নি’রাপত্তা চাওয়া।