
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার বন্ধ করার জন্য সরকার কিছু করতে পারছে না বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘ডিজিটাল অর্থনীতি ও উদ্যোক্তা প্রসঙ্গ’ বিষয়ক আলোচনা অনুষ্ঠানে এ মন্তব্য করেন তিনি।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ডিজিটালাইজেশন আমাদের প্রগতিশীল করেছে, তবে এটি বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেও প্রথাগত কর্মসংস্থানে সমস্যা হচ্ছে। আগস্ট মাসের আন্দোলনে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, এর মাধ্যমে বোঝা যায় এর প্রয়োজনীয়তা। ইন্টারনেট বন্ধের মাধ্যমে নৈতিক পরাজয় হয়েছিল।
তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে নতুন উপাদান হল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভিত্তিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার। এর মাধ্যমে সহিংসতা, ঘৃণা ছড়ানো হয় তা বন্ধ করার মতো কোনো উদ্যোগ বা ইচ্ছা নির্বাচন কমিশন দেখাতে পারে নাই। এর অপব্যবহার বন্ধ করার জন্য এই সরকার কিছু করতে পারছে না।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নাগরিক সমাজ দাবি জানাচ্ছে। ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে দুর্নীতি কিছুটা কমানো হয়েছে। একীভূত জাতীয় তথ্য ভাণ্ডার তৈরি করতে হবে, এটি নির্বাচনী কমিশন বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে থাকবে না। এটিকে স্বায়ত্তশাসিত, নজরদারিভিত্তিক ও জবাবদিহিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হতে হবে। নতুন সাইবার সিকিউরিটি অর্ডিন্যান্সকে আগামী সরকারকে বৈধতা দিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো আগামী নির্বাচনে ডিজিটাল সুরক্ষার জন্য কী কী করবে তা আমাদের ভালো করে জেনে নিতে হবে।
অনুষ্ঠানে আলোচকদের মধ্যে ছিলেন— বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি শাহেদুল ইসলাম হেলাল, ঢাকা চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম, ড্যাফোডিল গ্রুপের চেয়ারম্যান সবুর খান, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের স্কুল অব বিজনেসের ডিন এম. এ. বাকী খলীলী, বারভিডার সাবেক সভাপতি আবদুল হক জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আবদুল মজিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম জাহিদ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশের (ন্যাপ) চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি, সিটি ব্যাংক পিএলসির অ্যাসোসিয়েট রিলেশনশিপ ম্যানেজার তানহা কেট, উদ্যোক্তা আবিদা সুলতানা, উদ্যোক্তা তাজমিন নাসরিন, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী প্রমুখ।
অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর গভার্ন্যান্স স্টাডিজের সভাপতি জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশে আমরা ডিজিটাল শব্দটা গত দশকে বহুবার শুনে এসেছি, কিন্তু কারো হাতে একটা সেলফোন থাকলেই সেটা ডিজিটাল বাংলাদেশ হয়ে যায় না। বরং এই ডিজিটাল নামে চুরিও হয়েছে বহু, আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বহু অর্থ লোপাট হয়ে গিয়েছে কিন্তু আমরা সেটা থামাতে পারিনি।
শাহেদুল ইসলাম হেলাল বলেন, দুর্নীতি বা ঘুষ থেকে বের হওয়ার একটি রাস্তা হল ডিজিটালাইজেশন। ফ্যাক্টরিতে সিসিটিভি থাকায় অনেক সুবিধা হয়েছে আমাদের, সহজেই সব দেখা যায়। আগে ফ্যাক্টরিতে ঢোকার সময় সই করতে হত, পরে পাঞ্চ কার্ড এবং তারপরে ডিজিটাল কার্ড, ধীরে ধীরে আমাদের কাজ সহজ হয়ে যাচ্ছে। প্লাস্টিক ফ্যাক্টরিতে কোনো মেশিন নষ্ট হয়ে গেলে চাইনিজ প্রস্তুতকারককে তৎক্ষণাৎ ভিডিও কলে বসে মেশিন ঠিক করে ফেলা যাচ্ছে।
আবদুল মজিদ বলেন, আমরা যতই অটোমেশন, ডিজিটালাইজেশন করতে চাইনা কেন মানুষের মানসিকতা না বদলালে তাতে করে কোনো লাভ হবে না। বাংলাদেশের একটি বড় ক্ষতি হয়ে গিয়েছে যখন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের থেকে অনেকগুলো টাকা চুরি হয়ে গেলো সেটাও হলো আমাদের ব্যক্তির অসচেতনতার জন্য। এনবিআর অটোমেশনের জন্য ভিয়েতনাম একটি কাজ নিলো, আমাদের সব ডেটা নিয়ে চলে গেলো কিন্তু আমরা কিছু করতে পারলাম না। যদি সুন্দরবনের বাঘকে বলেন যে ডিজিটাল হতে সেটা তো আর সম্ভব না।
আসিফ ইব্রাহিম বলেন, যেই তথ্য নিয়ে আমরা পলিসি বানাবো তার সত্যতা কতটুকু? অন্যান্য উন্নত দেশের মত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে আধুনিক করতে হবে। ই-কমার্সে আমাদের অবস্থা তেমন ভাল না। তরুণদের মধ্যে ডিজিটাল দক্ষতা ও স্বাক্ষরতা বাড়াতে হবে। ডিজিটাল অবকাঠামোতে কাজ করতে হবে, গ্রাম ও শহরের মধ্যে ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে হবে। উদ্যোক্তাদের অনুপ্রাণিত করতে হলে ডিজিটালাইজেশন লাগবে এবং স্বচ্ছতা বাড়ানোর জন্য ডিজিটালাইজেশন দরকার আছে।
বাকী খলীলী বলেন, নতুন সরকার যেন আমাদের সুযোগগুলো গ্রহণ করে। আমি মনে করি ট্র্যাডিশন অনুসরণ না করে নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করা দরকার। অর্থনীতি চালাতে হলে ডিজিটালাইজেশন করতে হবে। উদ্যোক্তাদের সুযোগ দিতে হবে বা তাদের বলতে হবে। আমাদের উদ্যোক্তা আছে, তারা এগোতে চাচ্ছে। আমাদের ফিনটেক আছে, তবে আমাদের এডটেক দরকার আছে। আমাদের এডুকেশন সিস্টেমে ডিজিটাল শিক্ষা কতটুকু ঢুকানো হয়েছে? সাপ্লাই টু ফাইন্যান্স থাকতে হবে।
পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, ডিজিটাল অগ্রগতি সব দেশেই হচ্ছে। বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার কারণ নেই। আমাদের ৮ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী আছে। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী হল সাড়ে ৬ কোটি এগুলো ভালো জিনিস, কিন্তু এর মধ্যে সমস্যা আছে। যেমন অনেকের ডিজিটাল লিটারেসি কম যার কারণে সাইবার ক্রাইম হচ্ছে। ডিজিটাল অসমতাও আছে আমাদের দেশে।
আমার বার্তা/এমই

