ই-পেপার বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫ মাঘ ১৪৩৩

স্কিলড মাইগ্রেশন ছাড়া ভবিষ্যৎ রেমিট্যান্স কি টেকসই?

সাকিফ শামীম:
২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:১৬

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স দীর্ঘদিন ধরেই একটি নির্ভরযোগ্য স্তম্ভ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা, গ্রামীণ ভোগব্যয় সক্রিয় রাখা এবং দারিদ্র্য হ্রাস—সবখানেই রেমিট্যান্সের অবদান সুস্পষ্ট। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন এখন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে: বর্তমান ধাঁচের মাইগ্রেশন কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে কি ভবিষ্যতের রেমিট্যান্স টেকসই রাখা সম্ভব?

বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী সাম্প্রতিক বছরে বাংলাদেশে বার্ষিক রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রায় ২২–২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। এই অঙ্ক বড় হলেও এর কাঠামোগত ভঙ্গুরতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। মোট প্রবাসী শ্রমিকের বড় অংশই এখনো লো-স্কিল বা সেমি-স্কিল ক্যাটাগরিতে কর্মরত। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে এই ধরনের কাজের মজুরি তুলনামূলক কম, অটোমেশন ও রিসেশন-সংবেদনশীল, এবং নীতিগত পরিবর্তনে সবচেয়ে আগে ঝুঁকির মুখে পড়ে। ফলে কর্মীর সংখ্যা বাড়লেও প্রতি কর্মীর গড় রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে পড়ছে—যা দীর্ঘমেয়াদে একটি সতর্ক সংকেত।

অন্যদিকে, বৈশ্বিক শ্রমবাজারের রূপান্তর দ্রুতগতির। আইএলও ও ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, আগামী এক দশকে হেলথকেয়ার, কেয়ার ইকোনমি, আইটি ও ডিজিটাল সার্ভিস, গ্রিন টেকনোলজি, অ্যাডভান্সড ম্যানুফ্যাকচারিং এবং এজিং-সোসাইটি-সাপোর্ট সার্ভিসে স্কিলড ও হাই-স্কিলড শ্রমের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এসব খাতে কর্মরত একজন স্কিলড কর্মীর মাসিক আয় যেখানে লো-স্কিল কাজের তুলনায় দুই থেকে চার গুণ বেশি, সেখানে তার পাঠানো রেমিট্যান্সও অনুপাতে বেশি ও স্থিতিশীল। অর্থাৎ, কর্মীর সংখ্যা নয়—স্কিল প্রোফাইলই ভবিষ্যৎ রেমিট্যান্সের প্রকৃত নিয়ামক।

এখানেই বাংলাদেশের কৌশলগত ঘাটতি স্পষ্ট হয়। আমরা এখনো “ভলিউম-ড্রিভেন মাইগ্রেশন”-এ নির্ভরশীল—অর্থাৎ বেশি মানুষ পাঠানোই সাফল্যের সূচক। অথচ ফিলিপাইন বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো “ভ্যালু-ড্রিভেন মাইগ্রেশন”-এ জোর দিয়েছে। ফলাফল হিসেবে দেখা যায়, কম সংখ্যক কর্মী পাঠিয়েও তারা প্রতি কর্মী থেকে বেশি রেমিট্যান্স আয় করছে, একই সঙ্গে প্রবাসী আয়ের গুণগত মান ও সামাজিক সুরক্ষা উন্নত করছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, দক্ষতা উন্নয়ন যদি অভিবাসন নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে না আসে, তাহলে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আমরা পিছিয়ে পড়ব—এবং রেমিট্যান্স প্রবাহও চাপের মুখে পড়বে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো খরচ ও রিটার্নের অনুপাত। সরকারি ও বেসরকারি গবেষণায় দেখা যায়, একজন লো-স্কিল কর্মী বিদেশে যেতে যে খরচ বহন করে, তার তুলনায় প্রথম কয়েক বছরে প্রকৃত সেভিং ও রেমিট্যান্স রিটার্ন অনেক সময়ই সীমিত থাকে। বিপরীতে, স্কিলড কর্মীর ক্ষেত্রে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ ব্যয় তুলনামূলক বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে তার আয়ের ধারাবাহিকতা ও রিটার্ন উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। অর্থনীতির ভাষায়, স্কিলড মাইগ্রেশন হলো একটি উচ্চ রিটার্ন-অন-ইনভেস্টমেন্ট (ROI) মডেল—যা জাতীয় পর্যায়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের মান ও স্থায়িত্ব দুটোই বাড়ায়।

সুতরাং নীতিগতভাবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো জরুরি। মাইগ্রেশনকে কেবল কর্মসংস্থান রপ্তানির বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; একে মানবসম্পদ উন্নয়নের কৌশল হিসেবে দেখতে হবে। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন স্কিল সার্টিফিকেশন, টার্গেটেড কান্ট্রি-স্পেসিফিক ট্রেনিং, ভাষা ও সফট স্কিল ডেভেলপমেন্ট, এবং বিদেশি নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে ইনস্টিটিউশনাল লিংকেজ—এসব না হলে স্কিলড মাইগ্রেশনের কথা কাগজেই থেকে যাবে। একই সঙ্গে, প্রবাসী আয়ের সঠিক বিনিয়োগ চ্যানেল তৈরি না হলে রেমিট্যান্সের ম্যাক্রো-ইকোনমিক প্রভাবও সীমিত থাকবে।

আরেকটি প্রায় অপ্রাসঙ্গিক করে রাখা হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশন। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বহু দেশ দ্রুত এজিং সোসাইটিতে পরিণত হচ্ছে। এর অর্থ, ভবিষ্যতের শ্রমবাজার শুধু শারীরিক শ্রমনির্ভর থাকবে না; বরং কেয়ারগিভিং, নার্সিং, প্যারামেডিক্যাল সার্ভিস, রিহ্যাবিলিটেশন, জেরিয়াট্রিক সাপোর্ট ও ডিজিটাল হেলথ–সংক্রান্ত স্কিলের চাহিদা বহুগুণে বাড়বে। এই খাতগুলোতে স্কিলড ও সার্টিফায়েড কর্মীর চাহিদা দীর্ঘমেয়াদি ও তুলনামূলকভাবে রিসেশন-রেজিস্ট্যান্ট। বাংলাদেশ যদি এখনই এই ডেমোগ্রাফিক বাস্তবতা মাথায় রেখে স্কিল ম্যাপিং ও ট্রেনিং স্ট্র্যাটেজি তৈরি না করে, তাহলে আগামী দশকে একটি বড় বৈশ্বিক সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি থাকবে—যার সরাসরি প্রভাব পড়বে রেমিট্যান্স প্রবাহে।

একই সঙ্গে, স্কিলড মাইগ্রেশন শুধু বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রশ্ন নয়—এটি ‘ব্রেন সার্কুলেশন’-এরও সুযোগ তৈরি করে। স্কিলড কর্মীরা বিদেশে কাজ করে যে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রফেশনাল নেটওয়ার্ক অর্জন করে, তা দেশে ফেরত এলে উদ্যোক্তা তৈরি, ইনোভেশন ও লোকাল ইন্ডাস্ট্রি আপগ্রেডেশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক উন্নয়নশীল দেশ এই ব্রেন সার্কুলেশনকে স্ট্র্যাটেজিক অ্যাসেট হিসেবে ব্যবহার করছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো অভিবাসন নীতি মূলত স্বল্পমেয়াদি আয়ের দিকে ঝুঁকে আছে, দীর্ঘমেয়াদি নলেজ ট্রান্সফার বা রিটার্ন মাইগ্রেশনের কাঠামো দুর্বল। এই জায়গাটিতে সংস্কার না হলে, আমরা হয়তো রেমিট্যান্স পাব—কিন্তু টেকসই অর্থনৈতিক রূপান্তরের সুযোগ হারাব।

সবশেষে প্রশ্নটি আবারও সামনে আসে—স্কিলড মাইগ্রেশন ছাড়া কি ভবিষ্যৎ রেমিট্যান্স টেকসই? ডেটা, বৈশ্বিক ট্রেন্ড এবং তুলনামূলক অভিজ্ঞতা একসঙ্গেই বলছে: না, টেকসই নয়। পরিমাণের মোহ থেকে বেরিয়ে গুণগত রূপান্তরই এখন একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ। স্কিলড মাইগ্রেশন কেবল রেমিট্যান্স বাড়ানোর কৌশল নয়; এটি বাংলাদেশের বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অবস্থান শক্ত করার একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগ যত দ্রুত ও পরিকল্পিতভাবে করা যাবে, ভবিষ্যৎ রেমিট্যান্স তত বেশি স্থিতিশীল ও মর্যাদাসম্পন্ন হবে।

লেখক : ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল এন্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টার, ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড গ্রুপ।

আমার বার্তা/সাকিফ শামীম/এমই

দুর্নীতিবাজকে ভোট দিয়ে সুশাসনের স্বপ্ন দেখাই আত্মপ্রবঞ্চনা

দুর্নীতি, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীকে নির্বাচিত করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যাবে, ভালো থাকা যাবে, শান্তিতে থাকা

ডিজিটাল ইনসুরেন্স ও মাইক্রো-ইনসুরেন্স: গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি গ্রাম। কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবার, অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজার এবং

ইংরেজি মানেই কি আতঙ্ক নাকি সম্ভাবনা

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে নিজেকে বৈশ্বিক পরিসরে তুলে ধরার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো ইংরেজি ভাষা। এটি

প্রযুক্তির দাসত্ব বরণ করছি না তো আধুনিকায়নের নামে?

প্রযুক্তি শব্দটি আজ আমাদের জীবনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে গেছে। আধুনিক সভ্যতার প্রতিটি স্তরে প্রযুক্তির উপস্থিতি
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নিয়ে গণ্ডগোলের পাঁয়তারা চলছে: গভর্নর

জব্দ করা একটি ট্যাংকার জাহাজ ভেনেজুয়েলাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

৭১ নিয়ে আগে মাফ চান, পরে ভোট চান: মির্জা ফখরুল

জামায়াত নেতা নিহতের ঘটনায় ঝিনাইগাতীতে থমথমে পরিস্থিতি

হ্যাকারদের রুখতে নতুন ফিচার আনছে হোয়াটসঅ্যাপ

সময় ফুরিয়ে আসছে: ইরানকে সতর্ক করলেন ট্রাম্প

দীর্ঘদিন পর মানুষ নিরাপদে ভোট দিতে পারবে: ব্যারিস্টার খোকন

জামায়াত নেতার সুরতহাল সম্পন্ন, মাথা-কপালে-নাকে আঘাতের চিহ্ন

রুমিন ফারহানার পক্ষে নির্বাচন: ইউনিয়ন বিএনপির কমিটি স্থগিত

আপনার ভোট বড় আমানত, সেটা আমাকে দেবেন: ফখরুল

সাংবাদিকদের কার্ড জটিলতা: রোববারের মধ্যে সমাধানে ইসিকে আলটিমেটাম

নারীরা কখনও জামায়াতের প্রধান হতে পারবে না: জামায়াত আমির

২২ বছর পর রাজশাহীতে তারেক রহমান, মাদ্রাসা ময়দানে ব্যাপক জনসমাগম

স্কিলড মাইগ্রেশন ছাড়া ভবিষ্যৎ রেমিট্যান্স কি টেকসই?

শালীর সঙ্গে প্রেম, পরে অন্যত্র বিয়ে: ক্ষোভে শালীর স্বামীকে ডেকে খুন

ডেটা সুরক্ষার মাধ্যমে নতুন ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ছে সরকার

শেরপুরের সহিংসতায় উদ্বেগ, দুইপক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান সরকারের

পাকিস্তানের বিশ্বকাপ বয়কটের সাহস নেই: অজিঙ্কা রাহানে

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনই সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান: প্রধান উপদেষ্টা

রাজশাহীর ৬ আসনে লড়াই জমেছে বিএনপি-জামায়াতে