
দেশের অর্থনীতিতে মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে। জ্বালানি তেলের সংকট ও বিদ্যুৎ খাতে লোডশেডিং শিল্প খাতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে বলে আশঙ্কা করছেন শিল্প উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে পোশাক শিল্পে এ শঙ্কা সর্বাধিক। কারণ লোডশেডিং-এর জন্য জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু রাখতে উৎপাদন ব্যয় যেমন বাড়ছে তেমনি সময়মতো রপ্তানী বা পণ্য সরবরাহ করতেও পোশাক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ফলে একদিকে শিল্প কারখানা বন্ধ হচ্ছে, অন্যদিকে বিদেশী ক্রেতাদের ক্রয়াদেশও হাতছাড়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিল্প কারখানার মালিকেরা।
বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি জ্বালানি আমদানিতেও চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দিতে না পারলে অনেক পোশাক শিল্প বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং এ শিল্পে ধ্বস নামার আশঙ্কা তৈরী হচ্ছে।
তৈরী পোশাক শিল্পের সমস্যার বর্ণনা দিতে গিয়ে একজন গার্মেন্টস কারখানার মালিক জানান, গত তিন সপ্তাহ ধরে জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। বিশেষ করে ছোট ও মধ্যমসারির পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে এবং সময়মতো পণ্য রপ্তানী করতে না পারায় ক্রেতার সংখ্যা কমছে। ওই ব্যবসায়ী আরো জানান, গত ৩ সপ্তাহে উৎপাদন ব্যয় ৩৫ থেকে ৩৭ শতাংশ বেড়েছে। ফলে উৎপাদন সক্ষমতাও কমেছে ৩২ শতাংশ। এজন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারী শিল্প প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে এবং বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। উৎপাদন অব্যাহত রাখতে বিদ্যুতের লোডশেডিং-এর সময় জেনারেটরের সাহায্যে কারখানা চালু রাখতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কারখানার মালিকেরা বলছেন, শুধু ছোট ও মাঝারী কারখানার উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে না। বড় বড় শিল্প কারখানাগুলো হুমকির মুখে রয়েছে। গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের প্রধান প্রধান শিল্পাঞ্চলেও ব্যাপক লোডশেডিং হচ্ছে। মালিক ও ব্যবসায়ীদের তথ্য মতে, জ¦ালানী ও গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে শুধু চলতি বছরের এপ্রিল মাসেই তৈরী পোশাক শিল্পে উৎপাদন ব্যয় ৩৫ থেকে ৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সময়ের মধ্যে উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে ৩০ শতাংশ কমেছে। নারায়ণগঞ্জের জেলা পল্লী বিদ্যুৎ সূত্র মতে, চাহিদার চেয়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে। কখনো কখনো দৈনিক ৭ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর উপজেলার কেওঢালা এলাকায় অবস্থিত “টোটাল ফ্যাশন লিমিটেড”-এর প্রশাসনিক কর্মকর্তা কবিরুল ইসলাম জানান, তাদের কারখানায় দৈনিক ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। ফলে বর্তমানে উৎপাদন সক্ষমতা ১০ টন থেকে কমে ৫ টনে এসে দাঁড়িয়েছে। তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আমরা বড়ই হুমকির মুখে আছি, লোডশেডিং এবং জ্বালানি সংকটের এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে কারখানা বন্ধ হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
সাভারের হেমায়েতপুরে অবস্থিত বৃহত্তর পোশাক শিল্পের এ কে এইচ গ্রুপের কারখানাটি এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানান।
প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক ফরিদুল আলম জানান, ব্যাপক লোডশেডিং, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন কমেছে, সময়মতো পণ্য রপ্তানী করা যাচ্ছে না। তেল সংকটের কারণে পণ্য পরিবহনেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। পরিবহনের কাভার্ড ভ্যান তেলের সংকটের কারণে সময়মতো পণ্যসামগ্রী চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে পারছে না। ফলে অনেক শিপমেন্ট বাতিল হচ্ছে। ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ কমছে। তিনি আরো জানান, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশের তৈরী পোশাক কারখানাগুলো মহাবিপদে পড়বে। শিপমেন্ট বাতিল হবে, বিদেশী ক্রেতারা অন্য দেশে চলে যাবে। ফলে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতিতেও।
রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য মতে, তৈরী পোশাক শিল্পে রপ্তানী আয় ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ কমেছে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে। এ খাতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানী আয় হয়েছিল ৩ হাজার ২৪ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। তবে আয় কমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পোশাক খাতে রপ্তানী আয় হয়েছে ২ হাজার ৮৫৭ কোটি ৮৪ লাখ ডলার।
অন্যদিকে চলতি বছরের মার্চ মাসে এ খাতে রপ্তানী গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২৭৮ কোটি ২২ লাখ ডলারে। ২০২৫ সালে একই সময়ে আয় ছিল ৩৪৪ কোটি ৯৯ লাখ ডলার। পর্যায়ক্রমে আয় হ্রাস পাচ্ছে। এপ্রিল মাসে আয় আরো কমেছে। ফলে রপ্তানীও কমেছে। রপ্তানী পণ্যের কাঁচামালের আমদানিও হ্রাস পেয়েছে। পোশাক রপ্তানীর ক্রেতাও কমেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পোশাক রপ্তানী খাতে শুধু আয়ই কমছে না, এ শিল্পের অনেক কারখানা বন্ধও হয়েছে। পোশাক তৈরী ও রপ্তানীকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী গত ৩ বছরে প্রায় ৪শ’ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। পোশাক মালিকদের এই শীর্ষ সংগঠনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের তৈরী পোশাক শিল্প। আর্থিক সংকটের কারণে আরো কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিজিএমইএ-এর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু জানিয়েছেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল-এর সাথে ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সংকট বাড়ছে। তিনি জানান, দেশী ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প। এ শিল্প বর্তমানে এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
বিজিএমইএ জানায়, দেশের পোশাক শিল্প খাত এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি রয়েছে। বলা যায় এক অশনী সংকেত দেখা দিয়েছে। বর্তমানে ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১২ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি ও গ্যাসের খরচও ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে গ্যাসের দাম ২৮৬ শতাংশ আর গত ৫ বছরে বিদ্যুতের দাম ৩৩ শতাংশ বেড়েছে। ফলে সংকট আরো ঘনীভূত হচ্ছে।
এদিকে সম্প্রতি পোশাক খাত সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক প্রতিবেদনে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের পোশাক শিল্পেও পড়েছে।
আমার বার্তা/উমর ফারুক আল হাদী/এমই

