
ঈদের দিন মাল্টিপ্লেক্সসহ দেশজুড়ে শতাধিক প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে বহুল প্রত্যাশিত মেগাস্টার শাকিব খানের সিনেমা 'রকস্টার'। সিনেমাটি মুক্তির পর থেকেই হলগুলোতে দেখা গেছে দর্শকের উপচে পড়া ভিড়। তবে হল থেকে বের হয়ে সিনেমাটি নিয়ে দর্শকেরা যেমন মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন, তেমনি সামাজিক মাধ্যমেও এটি নিয়ে চলছে বিস্তর আলোচনা ও সমালোচনা।
ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও এবং দর্শকদের রিভিউতে দেখা যায়, ‘রকস্টার’ মূলত যে ধরণের গল্পে নির্মিত সিনেমা, অনেক সাধারণ দর্শক তা পুরোপুরি ধরতে পারেননি। সিনেমা হল থেকে বের হওয়া দর্শকদের একাংশ যেমন সিনেমাটি নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করছেন, অন্য অংশটি আবার সরাসরি এর সমালোচনা করছেন। কেউ কেউ শাকিব খানের আগের ব্লকবাস্টার অ্যাকশন সিনেমা ‘তুফান’ বা ‘তাণ্ডব’-এর মতো মারদাঙ্গা ঘরানার কিছু আশা করে এই সিনেমার ভিন্নধর্মী গল্পের সঙ্গে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন।
এক উত্তেজিত দর্শককে বলতে শোনা যায়, এনারা সবাই ‘তুফান’ বা ‘তাণ্ডব’-এর মতো অ্যাকশন ঘরানার সিনেমা চেয়েছে। অনেকেই ‘রকস্টার’ সিনেমার মানে বুঝবে না। শাকিব খানকে যে নতুনভাবে দর্শক দেখতে চায়, এটা আসলে তারা মেনে নিতে পারছে না।
অন্যদিকে, ভিন্ন ধারার এই গল্প নিয়ে অনেক দর্শক ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন। এক দর্শকের ভাষ্য, শাকিব খান এ ধরনের সিনেমা করে নিজের ক্যারিয়ার নষ্ট করছেন। আমরা তাকে ভালোবাসি, কিন্তু তাকে দিয়ে যেন এমন গল্পে আর কাজ করানো না হয়।
সপরিবারে সিনেমাটি দেখতে আসা এক পরিবার আবার মাঝপথেই হল থেকে বের হয়ে এসে মন্তব্য করেন, এই সিনেমার গল্প ও দৃশ্য বাংলাদেশের সংস্কৃতির সঙ্গে ঠিক যায় না। বিশেষ করে মাদকের বিষয়গুলো থাকার কারণে এটি পরিবার নিয়ে দেখার মতো নয় বলেও কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন। তবে সিঙ্গেল স্ক্রিনের সাধারণ দর্শকদের অনেকের মুখে আবার ‘ভালো হয়েছে’- এ ধরনের সংক্ষিপ্ত প্রশংসাও শোনা গেছে।
নেটমাধ্যমে যখন সাধারণ নেটিজেনরা সিনেমার স্টোরিলাইন, সংলাপের অভাব কিংবা ভিজ্যুয়াল নিয়ে নানা কাটাছেঁড়া করছেন, তখন ঠিক উল্টো চিত্র দেখা গেছে শাকিবিয়ানদের (শাকিব খানের ফ্যান গ্রুপ) বিভিন্ন গ্রুপে। তাদের দাবি, ‘রকস্টার’ গল্পের দিক থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি কাজ। যেহেতু এটি একটি মিউজিক্যাল ঘরানার সিনেমা, তাই এখানে বিভিন্ন স্টাইলের ও ক্যাটাগরির গান রাখা হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে তারা মেগাস্টারের এই ভিন্নধর্মী অভিনয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
এই আলোচনা-সমালোচনার জোয়ারের মাঝেই সিনেমাটির শো সংখ্যা বাড়িয়েছে হল মালিকেরা। দর্শক চাহিদা ও টিকিট বিক্রির সাড়া পাওয়ায় হল মালিকেরা শো-এর সংখ্যা বাড়িয়েছেন বলে খবর শোনা যায়। যেমন, দেশের জনপ্রিয় মাল্টিপ্লেক্স স্টার সিনেপ্লেক্সে মুক্তির প্রথম দিনে সিনেমাটি মাত্র ১৮টি শো পেলেও দ্বিতীয় দিনেই তা বাড়িয়ে দ্বিগুণ অর্থাৎ ৩৬টি করা হয়।
‘রকস্টার’ নিয়ে যখন চারদিকে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার ঝড়, তখন এক প্রেস কনফারেন্সে সিনেমাটির বিভিন্ন দিক নিয়ে মুখ খুলেছেন এর নির্মাতা আজমান রুশো। দর্শকদের উদ্দেশ্যে তার স্পষ্ট বক্তব্য, একজন রকস্টারের জীবন আর সাধারণ দশটা মানুষের জীবন কখনো এক হয় না। মানুষের জীবনে যেমন ভালো-মন্দ দুই দিকই থাকে, ঠিক তেমনি একজন রকস্টারের জীবনেও থাকে প্রচুর চড়াই-উতরাই, পারিবারিক ট্রমা আর তীব্র মানসিক স্ট্রাগল। সিনেমাটিতে শুধু পরিবারের ভালো দিকগুলোই দেখানো হবে, বাস্তবতার খাতিরে তা তো সম্ভব নয়। বাস্তব জীবনের বেশ কয়েকজন রকস্টারের জীবন থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েই এই ছবিটা বানানো হয়েছে, যাদের বেশিরভাগেরই জীবনে এক ধরণের অন্ধকার সত্য বা ট্রমা থাকে এবং সেই ট্রমা থেকেই মূলত তাদের কালজয়ী মিউজিক বা সুরের জন্ম হয়।
নির্মাতা আজমান রুশো আরও জানান, তিনি কোনো নির্দিষ্ট এলাকা, পেশা বা শ্রেণীর দর্শকের কথা মাথায় রেখে সিনেমাটি বানাননি। তিনি চেয়েছেন বাংলাদেশের দর্শকদের আন্তর্জাতিক মানের একটি ভিন্ন ধারার ও নতুনত্বের গল্প উপহার দিতে। তার মতে, আমাদের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে কমার্শিয়াল ঘরানার নাচ, গান, অ্যাকশন যেমন দরকার, তেমনি সব ধরণের সিনেমাই হওয়া উচিত। বিশ্ব চলচ্চিত্রে যেমন 'জন উইক'-ও তৈরি হয়, আবার 'বোহেমিয়ান র্যাপসোডি'-ও তৈরি হয়। আমাদের ইন্ডাস্ট্রিকেও সেই জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। ঈদের দিনে দর্শক যখন প্রেক্ষাগৃহে শুধুই অ্যাকশন সিনেমা আশা করে, তখন তিনি জেনেশুনেই এই বড় ঝুঁকিটি নিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, দেশের দর্শকেরা যদি একবার এই নতুন ধারাটি গ্রহণ করে নেন, তবে বাংলাদেশের সিনেমার জন্য আগামীতে অনেক বড় একটি দরজা খুলে যাবে এবং আমাদের কাজের পরিধি আরও বহুগুণ বেড়ে যাবে।
উল্লেখ্য, ঈদের দিন থেকে দেশের ১০৩টি প্রেক্ষাগৃহে একযোগে প্রদর্শিত হচ্ছে এই সিনেমা। আজমান রুশো পরিচালিত ‘রকস্টার’ সিনেমায় মূলত একজন রকস্টারের উত্থান, আকাশচুম্বী খ্যাতি, ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন ও পতনের গল্প সেলুলয়েডে তুলে ধরা হয়েছে। এতে মেগাস্টার শাকিব খানের সঙ্গে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন সাবিলা নূর, তানজিয়া জামান মিথিলা ও সুনিধি নায়েক।
আমার বার্তা/জেএইচ

