
পূর্বাচল প্রবাসী পল্লী লিমিটেডের প্রজেক্ট বাস্তবায়নে নিরাপত্তার প্রশ্নে জারি করা রুল খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ মামলায় আদালতের আদেশ নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে রিটকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) মামলার সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এর আগে বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি এস এম ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মহসিন কবির প্রমুখ। অন্যদিকে রিট আবেদনকারী পূর্বাচল প্রবাসী পল্লীর পক্ষে শুনানিতে ছিলেন ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল।
মামলার বিবরণী থেকে জানা গেছে, প্রবাসীদের অর্থায়নে ঢাকার পূর্বাচলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে মোহাম্মদ মুহিদুর রহমান এবং চেয়ারম্যান হিসেবে হাবিবুর রহমান পূর্বাচল প্রবাসী পল্লী লিমিটেডের নামে আবাসন ব্যবসায় শুরু করে। ২০০৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর কোম্পানিটি রেজিস্ট্রেশন পায়। পরবর্তী সময়ে ২০১১ সালে ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার বিষয়ে তারা হাইকোর্টে রিট দায়ের করে।
হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় কোম্পানির প্রজেক্ট ডিরেক্টর মো. আব্দুল কাইয়ুম প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে রিটটি দায়ের করেন। রিট আবেদনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সচিব, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, পূর্বাচল আমেরিকান সিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল মামুন, রূপগঞ্জ ও নরসিংদী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ মোট নয়জনকে বিবাদী করা হয়।
ওই রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২০১১ সালের ২৫ জুলাই হাইকোর্ট পূর্বাচল প্রবাসী পল্লী লিমিটেডের প্রজেক্ট বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতা রোধে নরসিংদী সদর ও রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) চার মাস প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশনা দেন হাইকোর্ট।
পাশাপাশি পূর্বাচল প্রবাসী পল্লী লিমিটেডের প্রজেক্ট বাস্তবায়নে আইনগত সুরক্ষা প্রদানে বিবাদীদের ব্যর্থতা কেন বেআইনি এবং আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছিলেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে আইনগতভাবে প্রজেক্টটি বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি বন্ধে বিবাদীদের কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, রুলে তাও জানতে চেয়েছিলেন আদালত।
এরপর দীর্ঘ ১৫ বছর হাইকোর্টের চার মাসের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ সময়ে সময়ে বর্ধিত করে আবাসন ব্যবসায় পরিচালনা করতে থাকে প্রতিষ্ঠানটি।
এদিকে মামলার ৯ নম্বর বিবাদী রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পক্ষে আদালতে জবাব দাখিল করেন উপ-পরিদর্শক আহসান হাবিব।
গত ১৬ জুলাই দাখিল করা জবাবে রাষ্ট্রপক্ষ রিটকারীর আবেদনে থাকা সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। শুনানিকালে রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টের চার মাসের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশকে প্রায় ১৫ বছর ধরে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার ও প্রতারণার চিত্র আদালতের সামনে তুলে ধরে।
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টকে জানায়, প্রজেক্টটি একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন বাণিজ্যিক রিয়েল এস্টেট/আবাসন প্রকল্প। প্রকল্পটির আইনগত অনুমোদন ও নিবন্ধনই গুরুতরভাবে বিতর্কিত। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের মামলায় (জিআর কেস নং-১৫৪/২০২৪) প্রজেক্টের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহিদুর রহমান যথাক্রমে ১ ও ৫১ নাম্বার আসামি হয়েছেন। এরপরও হাইকোর্টের ২০১১ সালের আদেশকে ব্যবহার করে ব্যক্তি মালিকানাধীন বিতর্কিত প্রজেক্টটি নিরাপত্তা সুবিধা পেয়ে আসছে।
প্রজেক্টের জালিয়াতির প্রসঙ্গে টেনে শুনানিতে আরও বলা হয়, প্রজেক্ট পরিচালকরা জালিয়াতি ও মিথ্যা নথির মাধ্যমে বেশকিছু মৌজা থেকে কৃষকদের জোরপূর্বক জমি দখল করেছে। এ বিষয়ে জাতীয় পত্রিকায় অসংখ্য সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এই রিটের প্রাথমিক আদেশকে প্রতারণার উদ্দেশ্যে ভুলভাবে ব্যবহার করে একই মৌজার স্থানীয় জমি মালিকদের নানানভাবে হয়রানি করা হয়েছে। অথচ প্রতিষ্ঠানটির যথাযথ আইনগত বৈধতা নেই। তাই ব্যক্তিস্বার্থে রিট দায়েরের মাধ্যমে প্রতারণার অভিযোগে মামলার বাদীপক্ষকে জরিমানা করার আবেদন জানানো হয়।
পরে উভয়পক্ষের শুনানি নিয়ে রিটটির জারি করা রুল খারিজ করে রায় ঘোষণা করেন হাইকোর্ট।
রায়ের বিষয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মহসিন কবির জানান, রিটকারী হাইকোর্ট থেকে চার মাসের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ নিয়ে তা প্রায় ১৫ বছর পর্যন্ত বর্ধিত করেছে। এই সময়ে তারা নিরাপত্তার আদেশের অপব্যবহার করেছে। ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার নাম করে তারা প্রতারণামূলকভাবে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেছে। প্রতিষ্ঠানটির এমডি ও চেয়ারম্যান বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ঘটনায় হওয়া মামলার আসামি হয়েও গ্রেপ্তার এড়াতে হাইকোর্টের আদেশটি নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে আসছিল। বিষয়গুলো আদালতে তুলে ধরা হলে শুনানি নিয়ে তাদের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট।

