
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত আত্মবিশ্বাসের একটি প্রতীক, এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে বলে জানিয়েছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের (আরএনপিপি) প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে জ্বালানি ইউরেনিয়াম লোডিং উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
এরপর তিনি জ্বালানি (ফুয়েল) লোডের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এই ফুয়েল লোডিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে এক মাসের মতো সময় লাগতে পারে।
এটিই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনে যাওয়ার শেষ ধাপ। এর মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু হলো।
অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, বাংলাদেশ আজ দ্রুত অগ্রসর দেশ। আজ শিল্প, আধুনিক উন্নয়নের জন্য নিরবচ্ছিন্ন নির্ভরযোগ্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানি অপরিহার্য।
এই বাস্তবতায় পারমাণবিক শক্তি আমাদের জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। এটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে না, এটা আমাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, শিল্পায়ন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনা শক্তিশালী করবে।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ধারণাটা ১৯৬৮ সালের, সে সময় হয়নি। স্বাধীনতা পূর্ব ও স্বাধীনতা পরবর্তী বিভিন্ন পর্যায়ে প্রথমত যাচাইয়ের জন্য একাধিক সমীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। প্রতিটি সমীক্ষায় প্রতিটি কারিগরি অর্থনীতি এবং আর্থিক যৌক্তিকতা প্রতিমান হয়। তবে সে সময়ের আর্থিক প্রযুক্তিগত কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতার পর ১৯৭৮ সালে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমীক্ষা পরিচালিত হয়, যা ভবিষ্যৎ বাস্তবায়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপন করে। পরবর্তীতে ৭ মে ১৯৯৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পদ্ধতি বাস্তবায়ন কমিটি এই সভায় নীতিগত সিদ্ধান্ত দিয়ে দেয়, যা বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচিতে নতুন গতিপথ প্রদান করে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও অর্থনীতির যে দর্শন সামনে নিয়ে এসেছিলেন তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল এই পারমাণবিক প্রযুক্তির বিকাশ। আর তারই নেতৃত্বে বাংলাদেশে পারমাণবিক গবেষণার ভিত্তি সূচিত হয় এবং গবেষণার রিয়াক্টর স্থাপনের মাধ্যমে আমাদের পারমাণবিক যাত্রার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত তৈরি হয়।
তিনি বলেন, আজ এই রূপপুর সেই স্বপ্নের এক মহিমান্বিত বাস্তব রূপ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নির্বাচনী ইশতেহারেও বিজ্ঞান প্রযুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আধুনিক রাষ্ট্র নির্মাণের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত হয়েছে; এটি তারই একটি শক্তিশালী প্রতিফলন। একটি আত্মনির্ভরশীল প্রযুক্তি নির্ভরশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের যে স্বপ্ন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেখিয়ে গেছেন আজ আমরা সেই পথেই এগিয়ে চলেছি। এ প্রকল্পে ভিভিইআর ১২০০ রিয়্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে, যার উৎপাদন ক্ষমতা ২৪০০ মেগাওয়াট। এটা বিশ্বের অত্যাধুনিক জেনারেশন থ্রি জি প্রজেক্ট। সর্বোচ্চ নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা ও দক্ষতার সমন্বয়ে এই কেন্দ্র বাংলাদেশের চলমান জীবনমান উন্নত করবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা, এটি নিশ্চিত করেছে। পারমাণবিক শক্তিতে আত্মবিশ্বাস জরুরি কিন্তু আত্মতুষ্টি বা বর্জন নয়। তাই আমরা নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছি। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত আত্মবিশ্বাসের একটি প্রতীক। আমি বিশ্বাস করি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এই প্রকল্প।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। তিনি বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আমাদের জাতীয় সক্ষমতার একটি প্রতীক। এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে প্রবেশ করলাম।
তিনি আরও বলেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়নে রাশিয়ান ফেডারেশনের সহযোগিতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, আর্থিক সহায়তা এবং উপযুক্ত জ্ঞান, তথ্য-উপাত্ত বিনিময়ের মাধ্যমে এ প্রকল্প শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে। এ প্রকল্পে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কারিগরি সহায়তার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মান অনুসরণে সহযোগিতা আমাদের যাত্রাকে আরও নিরাপদ করছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা এবং সংশ্লিষ্টদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই প্রকল্প বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের জ্বালানি খাতে নতুন অভিযাত্রার সূচনা করবে। এটি জাতীয় গ্রিডে উল্লেখযোগ্য বিদ্যুৎ সংযোগের মাধ্যমে শিল্প ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এ প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, দেশি-বিদেশি প্রশাসন এবং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের অভিনন্দন জানান রেহান আসিফ।
আমার বার্তা/এমই

