বাংলাদেশে শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার হলেও, বাস্তবতা ভিন্ন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে, দুর্নীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎই বিপন্ন করে তুলেছে। দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন, রাজনৈতিক প্রভাব, অনৈতিক নিয়োগ প্রক্রিয়া, অর্থ আত্মসাৎ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার মিলিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এক ভয়াবহ সংকটের মধ্যে রয়েছে। এই দুর্নীতি এতো গভীরভাবে প্রবাহিত হয়ে গেছে যে, এখন আর কিছু আশা করার জায়গা নেই। শুদ্ধি অভিযানের কথা স্বপ্নের মতো মনে হয়।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি, এ যেন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক দুষ্টচক্র
প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত, দুর্নীতির শেকড় এত গভীরে বিস্তৃত যে, এটি এখন ‘নিয়ম’ হয়ে গেছে। এই চক্রটি সাধারণত তিনটি প্রধান স্তরে বিভক্ত:
• প্রতিষ্ঠান পর্যায়ের দুর্নীতি – যেখানে প্রধান শিক্ষক, সভাপতি ও পরিচালনা কমিটির দুর্নীতি প্রবল। অর্থ আত্মসাৎ, নিয়োগে অনিয়ম, রাজনৈতিক পরিচয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং শিক্ষকদের হয়রানি এখানেই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
• প্রশাসনিক দুর্নীতি – উপজেলা শিক্ষা অফিসার, জেলা প্রশাসন এবং শিক্ষা বোর্ডের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এই দুর্নীতির মূল চালক। বিদ্যালয়ের ফান্ড লুটপাট, শিক্ষক নিয়োগের জন্য ঘুষ গ্রহণ এবং যোগ্যতা উপেক্ষা করে রাজনৈতিক নিয়োগ এখান থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয়।
• জাতীয় পর্যায়ের দুর্নীতি – শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এই দুর্নীতির মদদদাতা। প্রশ্নফাঁস, নীতিমালা পরিবর্তনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং শিক্ষার মান কমিয়ে আনা এই স্তরে ঘটে থাকে।
একটি উদাহরণ : নহাটা রানী পতিত পাবনী মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেলেঙ্কারি
সম্প্রতি মাগুরা জেলার নহাটা রানী পতিত পাবনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সভাপতি নিয়োগ নিয়ে যে অনিয়ম প্রকাশ পেয়েছে, তা বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে চলমান দুর্নীতির একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তদন্ত চলাকালীন, আমি মাগুরার ডিসি এবং যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করি। ডিসির ভাষ্যমতে, তিনি মাত্র দুজন প্রার্থীর নাম পাঠিয়েছিলেন, অথচ স্কুলের পক্ষ থেকে তিনজনের নাম জমা দেওয়া হয়। এতে চেয়ারম্যানের মনে সন্দেহ তৈরি হলেও, তিনি ডিসির সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই তা অনুমোদন করেন।
পরদিন আমি পুনরায় ডিসির সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং জানতে পারি যে, তিনি প্রকৃতপক্ষে কেবল দুজনের নামসহ একটি আবেদনই পাঠিয়েছিলেন, তিনজনের নয়। নিয়ম অনুযায়ী, আবেদনটি ডিসির কার্যালয় থেকে সরাসরি যশোর শিক্ষা বোর্ডে যাওয়ার কথা ছিল এবং ডিসির পাঠানো তালিকার ভিত্তিতেই শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।
২০২৪ সালে জুলাই আগষ্ট বিপ্লবে প্রায় ২ হাজার ছাত্র জনতা শহীদ হয়ে দেশকে ফ্যাসিষ্ট শাসক মুক্ত করেছে সেখানে স্বৈরাচারী শাসনের পদধ্বনি শোনা গেলে তা হবে জাতির জন্য চরম অমর্যাদাকর। নহাটা রাণী পতিত পাবনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি বিগত ১৬ বছর ধরে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রভাবের অধীনে ছিল। যেখানে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার চরম আকার ধারণ করেছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাদিউজ্জামান ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিদ্যালয়ের সম্পদ লুটপাট করেছেন এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে নিজেকে সুরক্ষিত রেখেছেন। রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতির কারণে বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ভেঙে পড়েছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অশনি সংকেত।
আওয়ামী লীগ আমলে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থনে প্রধান শিক্ষক স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করেছেন যা জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিকৃষ্ট নজির। শিক্ষার মানের অবনতি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ছাত্র-ছাত্রীদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এই বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সভাপতি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় শুরু থেকেই চরম অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। এডহক কমিটির সভাপতি পদে একাধিক যোগ্য প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র যুবদল নেতা নয়নের স্ত্রী শাম্মী আকতারের নাম জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়েছে। যা স্ব”ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার পরিপন্থী।
এই অসঙ্গতি নতুন ধরনের দুর্নীতির ইঙ্গিত দেয়, যা আরও একবার প্রমাণ করে যে দুর্নীতি আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার বাস্তব অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে প্রধান শিক্ষকের দুর্নীতি, উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিসারের অসাধু ভূমিকা এবং নয়ন ও তার অনুসারীদের চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে—
• প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের সম্পর্ক ছিল গভীর, যা তাদের দুর্নীতিকে আড়াল করতে সাহায্য করেছে।
• শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালনে অনীহা দেখিয়েছেন, ফলে সঠিক নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই নয়নের স্ত্রীকে সভাপতি করা হয়েছে।
• এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে যে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা বোর্ড দুর্নীতির গভীরে নিমজ্জিত এবং বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় দুর্নীতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে।
এই প্রতিবেদনে উত্থাপিত তথ্যের ভিত্তিতে, শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে হলে এই ধরনের দুর্নীতি প্রতিরোধ ও প্রতিকার করতেই হবে, নয়তো ভবিষ্যত প্রজন্ম একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত শিক্ষাব্যবস্থার শিকার হবে।
• বিদ্যালয়ের অযোগ্য প্রধান শিক্ষক, যার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, দুর্নীতি ও শিক্ষকদের হয়রানির অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিএনপির সন্ত্রাসী নেতাদের সহায়তায় বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটিতে একজন সন্ত্রাসী বিএনপি নেতার স্ত্রীকে বসিয়েছেন।
• বিদ্যালয়ের তহবিল লুটপাট ও শিক্ষার্থীদের অধিকার হরণের মতো গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রশাসন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের ভয়ে।
• তদন্তের নামে প্রহসন হয়েছে, যেখানে উপজেলা শিক্ষা অফিসার, জেলা প্রশাসন ও শিক্ষা বোর্ড মূল অভিযোগ গোপন রেখে দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করেছেন, বিএনপির রাজনৈতিক সন্ত্রাসীদের ভয়ে।
এটি শুধু একটি বিদ্যালয়ের ঘটনা নয়, বরং সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা দুর্নীতির একটি জলন্ত প্রতিচ্ছবি।
এই যঘন্ন দুর্নীতির প্রভাবে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার এবং বিপন্ন
এই ধরনের দুর্নীতি অব্যাহত থাকলে শিক্ষার্থীদের উপর যে মারাত্মক প্রভাব পড়বে, তা নিচে উল্লেখ করা হলো:
• নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় – দুর্নীতিগ্রস্ত শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে বড় হয়ে ওঠা শিক্ষার্থীরা মনে করে, ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রতারণা করাই জীবনে সফল হওয়ার একমাত্র উপায়।
• মানহীন শিক্ষা – অযোগ্য শিক্ষক ও দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনের কারণে শিক্ষার মান ক্রমাগত নিম্নমুখী হচ্ছে।
• সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার অভাব – মেধার মূল্যায়ন না থাকায় প্রকৃত মেধাবীরা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি আরও গভীর হচ্ছে।
• প্রশাসনিক ব্যর্থতা – দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিগত ব্যবসা হিসেবে ব্যবহার করছে, যেখানে জনগণের কল্যাণ নয়, বরং অর্থ উপার্জনই মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই নড়বড়ে দুর্নীতিগ্রস্ত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে করণীয়
এই ভয়াবহ চিত্র থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কিছু কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে:
• দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন – শিক্ষা খাতে দুর্নীতির জন্য আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠন করা প্রয়োজন, যা দ্রুত বিচার নিশ্চিত করবে।
• নিরপেক্ষ নিয়োগ ব্যবস্থা চালু করা – প্রধান শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটির নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ করতে হবে।
• শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছ তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা – স্বাধীন অডিট ব্যবস্থা চালু করে বিদ্যালয়ের বাজেট ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
• শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন – দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণের সোচ্চার হওয়া জরুরি। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
“আম গাছের তলে তো আমই পড়ে” – দুর্নীতিগ্রস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষার্থী তৈরি হওয়া অসম্ভব। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় যদি শুদ্ধি অভিযান না চালানো হয়, তবে পুরো জাতিই একদিন নৈতিকভাবে ধ্বংসের মুখে পড়বে। তাই এখনই সময় শিক্ষা খাতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর। অন্যথায়, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং গোটা বিশ্বের কাছে আমরা এক ব্যর্থ জাতি হিসেবে পরিচিত হবো।
লেখক: সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।
আমার বার্তা/জেএইচ