
বাংলাদেশের অবকাঠামো নির্মাণের অন্যতম প্রধান সংস্থা গণপূর্ত অধিদপ্তরে সম্প্রতি প্রকৌশলীদের পদায়ন ও বদলি প্রক্রিয়ায় লটারি পদ্ধতির প্রয়োগ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মাঝে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। প্রশাসনিক সংস্কার ও স্বচ্ছতার ইস্যু সামনে থাকলেও গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তকে অবাস্তব ও প্রশাসনিক নীতিমালার পরিপন্থী উল্লেখ করে প্রকৌশলীদের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বদলি প্রক্রিয়ায় লটারির প্রবর্তন গণপূর্ত অধিদপ্তরের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ‘চেইন অব কমান্ড’ বা প্রশাসনিক শৃঙ্খলাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। একটি সেবাধর্মী ও কারিগরি সংস্থায় কোন স্থানে কাকে পদায়ন করা প্রয়োজন, কর্মকর্তা বিশেষের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার মূল্যায়ন এবং জরুরি প্রকল্পের কাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের যে তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ ছিল, তা এখন আর থাকছে না। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হাতে বদলি বা পদায়নের সুপারিশের ক্ষমতা না থাকায় মাঠপর্যায়ের জুনিয়র কর্মকর্তারা তাদের প্রশাসনিক দিকনির্দেশনা মানতে অবহেলা করছেন। ফলে কাজের গতি কমে যাওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনিক স্থবিরতা তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের একজন উর্ধতন কর্মকর্তার মতে, একেকজনের কর্মদক্ষতা ও পরিস্থিতি মোকাবেলার সক্ষমতা ভিন্নরকম। একই পদের সকল ব্যক্তি যে একই রকম দক্ষ হবে, এমনটা না। কেউ মাঠ পর্যায়ের কাজে দক্ষ, কেউ দাপ্তরিক কাজে অভিজ্ঞ। কিন্তু লটারিতে বদলি হলে সেই বাড়তি দক্ষতা কোনো কাজে আসবে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, "লটারি একটি অন্ধ প্রক্রিয়া। প্রশাসনিক প্রয়োজন, কাজের অভিজ্ঞতা বা কোনো জটিল প্রকল্পের দক্ষতার কথা বিবেচনা না করে লটারির মাধ্যমে কর্মকর্তা পাঠালে মূল কাজের মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়লে দিনশেষে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহি করতে হয়, অথচ সিদ্ধান্তের জায়গায় তাদের কোনো ভূমিকা রাখা হচ্ছে না।"
অন্যদিকে, এই স্বয়ংক্রিয় লটারি পদ্ধতির কারণে বড় ধরনের মানবিক ও পারিবারিক সমস্যায় পড়ছেন বিভিন্ন পর্যায়ের প্রকৌশলীরা। নিয়মিত বদলি প্রক্রিয়ায় সাধারণত শারীরিক অসুস্থতা, পারিবারিক সংকট, কিংবা সন্তানকে কোনো নির্দিষ্ট এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করানোর বিষয়টি বিবেচনা করে মানবীয় দৃষ্টিকোণ থেকে পদায়ন করা সম্ভব হতো। কর্মকর্তারা কর্তৃপক্ষের কাছে নিজের বা পরিবারের বাস্তবিক সমস্যার কথা তুলে ধরে আবেদন জানাতে পারতেন। কিন্তু লটারি প্রথার কারণে এ ধরণের সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমার সন্তান ঢাকার একটি স্কুলে অধ্যয়নরত এবং আমার এক বয়স্ক পারিবারিক স্বজন দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসাধীন। এমন পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ আকস্মিকভাবে লটারির মাধ্যমে আমাকে প্রত্যন্ত একটি জেলায় পদায়ন করা হয়েছে। আবেদন বা সমস্যার কথা জানানোর কোনো পথ রাখা হয়নি। ফলে চাকরি বজায় রাখা এবং পরিবার সামলানো দুটোই এখন চরম মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।"
একই ধরনের ভোগান্তির কথা জানান নাম প্রকাশ না করার শর্তে অপর একজন উপসহকারী প্রকৌশলী। তিনি জানান, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁর নির্দিষ্ট কিছু জেলায় চিকিৎসা সুবিধা সাপেক্ষে অবস্থান করা জরুরি ছিল। কিন্তু লটারির মাধ্যমে তাঁকে এমন এক বিভাগে পাঠানো হয়েছে যেখানে চিকিৎসা গ্রহণ করা কষ্টসাধ্য।
প্রকৌশলীরা মনে করছেন, লটারির মতো অযৌক্তিক ও অপরিকল্পিত পদ্ধতির পরিবর্তে ম্যানুয়াল বা অভিজ্ঞতানির্ভর পদায়ন প্রক্রিয়াই একটি সেবাধর্মী সরকারি দপ্তরের জন্য উপযুক্ত। মন্ত্রণালয়ের নেওয়া এই সিদ্ধান্তটি গণপূর্তের প্রশাসনিক কাঠামো এবং কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত জীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনতিবিলম্বে লটারিভিত্তিক এই বদলি নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও মানবিক দিকসমূহ বিবেচনা করে পূর্বের প্রশাসনিক নিয়ম ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী প্রকৌশলীরা।

