
ম্যাচের ৮৫ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে বেলজিয়াম ছিল একেবারে বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু ফুটবল নামক খেলাটিতে এমন সব ঘটনাও ঘটে, যা বিশ্বাস করা রীতিমতো অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়! ২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রত্যাবর্তনের তেমনই একটি স্মরণীয় নজির গড়ল রুদি গার্সিয়ার শিষ্যরা। উড়তে থাকা সেনেগালের মুঠো থেকে জয় ছিনিয়ে নিল দলটি। সমতায় ফেরার পর অতিরিক্ত সময়ের অন্তিম মুহূর্তের বিতর্কিত পেনাল্টি থেকে গোল করে আসরের শেষ ষোলোয় পা রাখল তারা।
বুধবার রাতে সিয়াটলে অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো শেষ বত্রিশের রোমাঞ্চকর ম্যাচে সেনেগালের বিপক্ষে ৩-২ গোলে জিতেছে বেলজিয়াম। খেলা যখন টাইব্রেকারে যাওয়ার খুব কাছে, তখনই একটি পেনাল্টি পায় বেলজিয়াম। ভিএআরের সাহায্য নিয়ে লম্বা সময় ধরে মনিটরে দেখে স্পট-কিকের বাঁশি বাজান রেফারি হেক্তর মার্তিনেজ। ১২ গজ দূর থেকে কোনো ভুল করেননি ইউরি টিলেমান্স। জালে জড়ানো তার জোরাল শটই গড়ে দেয় লড়াইয়ের ভাগ্য, বুনো উল্লাসে মাতে বেলজিয়াম। ঘড়ির কাঁটায় তখন নির্ধারিত ও অতিরিক্ত মিলিয়ে ১২০ মিনিটের খেলা পেরিয়ে যোগ করা সময় চলছে!
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে তীব্র আক্ষেপ নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন সেনেগালের ফুটবলাররা। সবচেয়ে বেশি কাঁদতে দেখা যায় লামিন কামারাকে। বদলি নামা এই ২২ বছর বয়সী মিডফিল্ডার ১১৮তম মিনিটে ডি-বক্সে বল বিপদমুক্ত করতে গিয়ে পা বাড়িয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার পা লেগে যায় সামনে থাকা টিলেমান্সের সাথে, দুজনই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এরপর ফাঁকায় বল পেয়ে দোদি লুকেবাকিও যে শট নেন, তা ক্রসবার ছুঁয়ে বাইরে চলে যায়।
তবে স্বস্তি মেলেনি সেনেগালের। কামারার দ্বারা টিলেমান্স ফাউলের শিকার হয়েছেন বলে দাবি তোলেন বেলজিয়ামের খেলোয়াড়রা। শুরুতে সাড়া না দিলেও ভিএআরে পর্যালোচনা করে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন রেফারি। যদিও সেনেগাল জানায় ভীষণ আপত্তি। সব মিলিয়ে আরও কয়েক মিনিট পার হওয়ার পর টিলেমান্স ম্যাচে নিজের দ্বিতীয় গোল করলে হৃদয় ভাঙে সেনেগালের।
শুরু থেকে ইতিবাচক ঢঙে থাকা সেনেগাল ১৪তম মিনিটেই এগিয়ে যেতে পারত। ইসমাইল জ্যাকবসের ক্রস বেলজিয়ামের গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া বিপদমুক্ত করতে পারেননি। ইসমাইলিয়া সারও ঠিকমতো শট নিতে পারেননি, বল লাগে পোস্টে। আলগা বলে তার আরেকটি প্রচেষ্টা অল্পের জন্য লক্ষ্যে থাকেনি।
১০ মিনিট পর ঠিকই উল্লাসে মাতে সেনেগাল। সাদিও মানের ক্রসে সারের হেড ফের আটকে যায় পোস্টে। তবে কাছেই থাকা হাবিব দিয়ারা বল পাঠিয়ে দেন জালে। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে অসাধারণ একটি গোলে দ্বিগুণ হয় ব্যবধান। নিজেদের অর্ধ থেকে মুসা নিয়াখাতের হাওয়ায় ভাসানো বল প্রথমে বুক দিয়ে নিয়ন্ত্রণে নেন সার। এরপর প্রতিপক্ষের এক ডিফেন্ডারের চাপে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাওয়ার আগে যে হাফ ভলি নেন, তা পরাস্ত করে কোর্তোয়াকে।
বিরতির পর রোমেলু লুকাকুকে নামায় বেলজিয়াম। তবে দ্বিতীয় গোল হজমের পর দলটির কোচ মাঠ থেকে তুলে নেন কেভিন ডি ব্রুইনা ও জেরেমি ডোকুকে। কোনো কৌশলেই অবশ্য কাজ হচ্ছিল না। বরং সেনেগাল সুবাস পাচ্ছিল দুর্দান্ত একটি জয়ের।
কিন্তু পরিকল্পনামাফিক এগোয়নি কিছু। এরপর ১৬১ সেকেন্ডের ঝড়ে চোখের পলকে স্কোরলাইন ২-২ করে ফেলে বেলজিয়াম। ৮৬তম মিনিটে ডানদিক থেকে থমাস মুনিয়েরের পাস পেয়ে কাছের পোস্ট দিয়ে গোল করে ব্যবধান কমান লুকাকু। বেলজিয়ামের হয়ে এটি তার ৯২তম আন্তর্জাতিক গোল। ৮৯তম মিনিটে লড়াইয়ে আসে সমতা। সেনেগালের গোলরক্ষক মোরি দিয়াও পোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে এসে লেয়ান্দ্রো ত্রসার্ডের ক্রস বিপদমুক্ত করতে ব্যর্থ হন। হেডে ফাঁকা জালে বল পাঠিয়ে দেন টিলেমান্স।
মানে-দিয়ারারা বদলি হয়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত সময়ে সেনেগালের আক্রমণের ধার বেশ কমে যায়। বরং ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান পাওয়া বেলজিয়ামই ঘুরে দাঁড়ানোর মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে খেলতে থাকে। এরপর সেই বিতর্কিত মুহূর্ত ও নাটকীয়তা শেষে বিজয়ীর বেশে মাঠ ছাড়ে তারা।
আমার বার্তা /জেএইচ

