
চলতি বছরের মধ্যে ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে (ইইউ) ‘ভাঙতে’ গোয়েন্দা সংস্থা ও সামরিক বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। রুশ প্রেসিডেন্টের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ইউক্রেনের পর মলদোভাকে প্রাথমিক লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ন্যাটো ও ইইউকে ‘ভেতর থেকে ধ্বংস’ করতে পুতিন নির্দেশ দিয়েছেন বলে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে একটি গোপন বৈঠক সম্পর্কে অবগত দুই দেশের কর্মকর্তাদের বরাত দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মস্কো দুটি পথে এই কৌশল এগিয়ে নিচ্ছে।
এই দুটি কৌশল হচ্ছে- ক) ন্যাটোর সদস্যদেশগুলোকে রক্ষায় জোটটি কতটা দৃঢ়, তা পরীক্ষা করা
খ) মলদোভাকে অস্থিতিশীল করা।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়ন অনুযায়ী, চলতি বছর ন্যাটোর দৃঢ়তা তথা ঐক্যের পরীক্ষা নিতে পারে রাশিয়া । এর সম্ভাব্য উপায় হিসেবে ন্যাটোভূক্ত দেশগুলোতে সাইবার হামলা, নাশকতা, অজ্ঞাতপরিচয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর মাধ্যমে অভিযান কিংবা ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় কোনো সদস্যদেশে সীমিত সামরিক অনুপ্রবেশের কথা বলা হয়েছে।
পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তারা নিউ ইয়র্ক টাইমস-কে বলেছেন, পুতিনের প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে ইউক্রেন দখল করা আর দ্বিতীয় প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে মলদোভার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। কর্মকর্তাদের ধারণা, মলদোভার রাজধানী কিশিনাউতে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ছাড়াও দক্ষিণ ইউক্রেন দখল করে রাশিয়া থেকে মলদোভা পর্যন্ত একটি স্থল করিডোর তৈরির পরিকল্পনা করছেন পুতিন।
এই করিডোরের ফলে ইউক্রেন ও ন্যাটো-ইইউভুক্ত ভূখণ্ডের মাঝখানে অবস্থিত প্রায় ২৪ লাখ জনসংখ্যার মলদোভা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়বে। মলদোভার ভূখণ্ডে রুশপন্থি বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল ট্রান্সনিস্ট্রিয়া রয়েছে। সেখানে কয়েক দশক ধরে রুশ সেনা মোতায়েন রয়েছে। ফলে ইউক্রেন সীমান্তের কাছেই এবং মলদোভার রাজধানী কিশিনাউয়ের ওপর চাপ সৃষ্টির মতো অবস্থানে মস্কোর একটি বিদ্যমান সামরিক উপস্থিতি রয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য মতে, মলদোভার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে ইউক্রেনের ওপর চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি ইইউ ও ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারবে রাশিয়া।
মলদোভাকে অস্থিতিশীল করার উপায় কী?
মলদোভাকে অস্থিতিশীল করতে রাশিয়ার সরাসরি সামরিক অভিযান একমাত্র পথ নয়। মার্চে ইউক্রেনের একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে রুশ হামলার পর ডিনিয়েস্টার নদীতে তেল ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে মলদোভায় পানি সরবরাহ ব্যাহত হয়। দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম শহরসহ বিভিন্ন এলাকাতেও এর প্রভাব পড়ে।
পরে রুশ ড্রোন পশ্চিম ইউক্রেনের একটি উচ্চ ভোল্টেজ বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনে হামলা চালায়। ওই লাইনটির মাধ্যমেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ মলদোভায় সরবরাহ করা হয়ে থাকে। এতে প্রতিবেশী দেশের যুদ্ধের সঙ্গে মলদোভার অবকাঠামো কতটা ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত তা স্পষ্ট হয়।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও মস্কো চাপ সৃষ্টি করছে বলে পশ্চিমা কর্মকর্তারা মনে করেন। মলদোভা ক্রমেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, রাশিয়া রাজনৈতিক বিভাজন, অপতথ্য ও অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে দেশটির এই ইউরোপমুখী অবস্থানকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
‘প্রতিদিনই হাইব্রিড হামলা’
জার্মানির প্রতিরক্ষা প্রধান জেনারেল কার্স্টেন ব্রয়ার সতর্ক করে বলেছেন, রাশিয়া এরই মধ্যে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোতে, বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলে, হাইব্রিড অভিযান চালাচ্ছে।
পোল্যান্ড ও বাল্টিক দেশগুলো তাদের বাঁধ, বিদ্যুৎকেন্দ্র, গ্যাস স্থাপনা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা বাড়াচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে এই অঞ্চলে ইউক্রেনীয় নির্মিত ড্রোন ব্যবহার করে ‘ফলস-ফ্ল্যাগ’ হামলা চালাতে পারে রাশিয়া।
একজন বাল্টিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, এ ধরনের অভিযানের লক্ষ্য শারীরিক ক্ষয়ক্ষতির চেয়ে ন্যাটোর অভ্যন্তরে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হতে পারে। এর ফলে ওয়াশিংটন ও ইউরোপের রাজধানীগুলোকে বিতর্কে জড়াতে হবে। এসব হামলার জন্য রাশিয়া দায়ী কি না এবং ন্যাটোর পক্ষ থেকে এর জবাব দেওয়া উচিত কি না এই বিষয়ে তাদের মধ্যে বিতর্কের উদ্ভব এবং তা থেকে বিভাজনের সৃষ্টি করবে।

