
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই—একসময় যে প্রযুক্তিকে মানবসভ্যতার আশীর্বাদ হিসেবে দেখা হতো, আজ তা অনেক নারীর জীবনে অভিশাপে পরিণত হয়েছে। ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহার আমাদের সামনে এক ভয়াবহ বাস্তবতা উন্মোচন করেছে, যেখানে সত্য আর মিথ্যার সীমারেখা ক্রমেই ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। এই ঝাপসা বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নারীরা—তাদের সম্মান, নিরাপত্তা এবং কখনো কখনো জীবন পর্যন্ত।
লালমনিরহাটের সুলতানা পারভীনের ঘটনা আমাদের সমাজের মুখে একটি কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—প্রযুক্তির অপরাধে শাস্তি পায় কেন ভুক্তভোগী? একটি এআই-নির্মিত ভুয়া ভিডিও, যার সঙ্গে তার বাস্তব জীবনের কোনো সম্পর্কই ছিল না, মুহূর্তেই তার স্বপ্ন, দাম্পত্য সম্পর্ক ও সামাজিক অবস্থান ধ্বংস করে দেয়। এই ঘটনা শুধু একটি আত্মহত্যার গল্প নয়; এটি আমাদের বিচারব্যবস্থা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের নৈতিক ব্যর্থতার দলিল।
ডিপফেক প্রযুক্তি মূলত ‘ডিপ লার্নিং’ অ্যালগরিদমের মাধ্যমে কারও মুখ, কণ্ঠ বা অঙ্গভঙ্গিকে অন্য ভিডিওর সঙ্গে নিখুঁতভাবে বসিয়ে দেয়। সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়—সমস্যা এর অপব্যবহারে এবং সেই অপব্যবহার ঠেকাতে আমাদের অক্ষমতায়। আজ কয়েকটি ফ্রি অ্যাপ ব্যবহার করেই একজন কিশোর বা প্রতিহিংসাপরায়ণ ব্যক্তি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একটি নারীর জীবন তছনছ করে দেওয়ার মতো কনটেন্ট তৈরি করতে পারে। অথচ সেই নারীর কাছে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার মতো সময়, মানসিক শক্তি কিংবা সামাজিক সমর্থন—কোনোটাই থাকে না।
ডিপফেক অপরাধে নারীরা কেন বেশি টার্গেট হচ্ছেন—এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের সমাজ কাঠামোর ভেতরেই লুকিয়ে আছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একজন নারীর ‘সম্মান’ তার চরিত্রের সঙ্গে অযৌক্তিকভাবে জড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে কোনো আপত্তিকর ভিডিও—তা ভুয়া হলেও—প্রথমেই প্রশ্নবিদ্ধ হয় নারী নিজেই। ভিডিওটি সত্য কি না, সেটি যাচাইয়ের আগেই সামাজিক আদালত রায় দিয়ে বসে। এই সামাজিক বিচারই অনেক সময় আইনি বিচারের আগেই নারীদের নিঃশেষ করে দেয়।
গবেষণা বলছে, অনলাইন সহিংসতার প্রায় ৯০ শতাংশ ঘটনায় ভুক্তভোগীরা অভিযোগই করেন না। এর পেছনে মূল কারণ—লজ্জা, ভয়, সামাজিক মর্যাদা হারানোর আশঙ্কা এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা। যখন একজন নারী ভাবেন, “পুলিশে গেলে যদি সবাই জানে?”, “পরিবার কী বলবে?”, “চাকরি থাকবে তো?”—তখন অপরাধী আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। নীরবতাই তখন অপরাধের সবচেয়ে বড় সহায়কে পরিণত হয়।
আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো—এই অপরাধের সঙ্গে পরিচিত মানুষদের জড়িত থাকার হার বেশি। সাবেক প্রেমিক, সহপাঠী, সহকর্মী বা অনলাইন পরিচিত—যাদের বিশ্বাস করে একজন নারী নিজের ছবি বা তথ্য শেয়ার করেছিলেন, অনেক সময় তারাই সেই বিশ্বাসকে অস্ত্র বানিয়ে আঘাত করে। এটি শুধু প্রযুক্তিগত অপরাধ নয়; এটি বিশ্বাস ভঙ্গের সামাজিক অপরাধ।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে—পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন (পিসিএসডব্লিউ), সিটিটিসির সাইবার ইউনিট, নতুন টেলিযোগাযোগ আইন খসড়া—এসব অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব উদ্যোগ কি সাধারণ নারীর কাছে বাস্তবিক অর্থে সহজলভ্য? একজন গ্রামের কিশোরী বা মধ্যবিত্ত কর্মজীবী নারী কি জানেন, কোথায় গেলে তিনি নিরাপদে অভিযোগ করতে পারবেন? জানলেও কি তিনি বিশ্বাস করেন যে বিচার পাবেন?
ডিপফেক অপরাধের ক্ষেত্রে সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। যত দ্রুত কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণ করা যাবে, তত কম ক্ষতি হবে। কিন্তু আমাদের দেশে ডিজিটাল ফরেনসিক, কাউন্টার এআই এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ঘাটতি স্পষ্ট। অপরাধীরা ভিপিএন, এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সহজেই সীমান্ত পেরিয়ে যায়, আর ভুক্তভোগী পড়ে থাকেন একা।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি বিষয় জরুরি। প্রথমত, শক্তিশালী ও আপডেটেড আইন—যেখানে ডিপফেককে আলাদা অপরাধ হিসেবে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হবে। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি—শুধু কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও সাইবার ইউনিট গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, সামাজিক সচেতনতা—ভুয়া ভিডিও দেখলেই শেয়ার নয়, আগে যাচাই করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভুক্তভোগীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। প্রশ্ন হওয়া উচিত—“ভিডিওটি কীভাবে তৈরি হলো?”—“কার স্বার্থে এটি ছড়ানো হলো?”—না যে, “সে কেন এমন করল?” এই মানসিক পরিবর্তন ছাড়া কোনো আইন বা প্রযুক্তিই নারীদের প্রকৃত নিরাপত্তা দিতে পারবে না।
সুলতানা পারভীনের মৃত্যু আমাদের ব্যর্থতার প্রতীক। তার মতো আর কোনো নারী যেন প্রযুক্তির মিথ্যা ছায়ায় জীবন হারাতে না বাধ্য হন—এ দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রের নয়, আমাদের সবার। প্রযুক্তি থামবে না, কিন্তু মানবিকতা থামা চলবে না। সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো, ভুক্তভোগীর পাশে থাকা এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়াই হতে পারে ডিপফেকের বিরুদ্ধে আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ।
লেখক: জামিল হোসেন, অনলাইন নিউজ এডিটর, দৈনিক আমার বার্তা, ঢাকা।
আমার বার্তা/জেএইচ

