
নির্বাচনে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলো ন্যূনতম প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি বলে অভিযোগ করেছে ১২টি সংগঠনের ‘নারী রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম’। তাদের দাবি, দলগুলো ঘোষিত পাঁচ শতাংশ নারী মনোনয়ন বাস্তবায়ন করেনি; যা নারী নেতৃত্বের প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর অনীহার প্রমাণ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টির কোনো নারীপ্রার্থী নেই।
গতকাল সোমবার সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে ‘নারীপ্রার্থী মনোনয়ন সংকট: দলগুলোর প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের ব্যবধান এবং নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহিতা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন ফোরামের নেতারা।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন গণসাক্ষরতা অভিযান, দুর্বার নেটওয়ার্ক ফাউন্ডেশন, নাগরিক কোয়ালিশন, নারী উদ্যোগ কেন্দ্র (নউক), নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা, নারী সংহতি, নারীপক্ষ, নারীর ডাকে রাজনীতি, ফেমিনিস্ট অ্যালায়েন্স অব বাংলাদেশ (ফ্যাব), বাংলাদেশ নারী মুক্তিকেন্দ্র এনং ভয়েস ফর রিফর্ম-এর প্রতিনিধিরা।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়েন সংগঠনের প্রতিনিধি রিতু সাত্তার। তিনি বলেন, নারীরা রাজনৈতিক দল থেকে মনোনয়ন চেয়েছে। বাস্তবে দেখা গেছে, মনোনয়ন ৫ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। যৌথ নারীপ্রার্থী থাকার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। জুলাই সনদে দেওয়া প্রতিশ্রুতিকেও রাজনৈতিক দলগুলো গুরুত্ব দেয়নি।
রিতু সাত্তার আরও বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে শক্তিশালী ও যোগ্য নারী নেতৃত্ব থাকা সত্ত্বেও তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় রাখা হচ্ছে না। নারীকে কেবল কমিটিতে রাখা হয়, সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয় না, এটিই বাস্তবতা।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, শেষ মুহূর্তে কিছু স্বতন্ত্র নারীপ্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিলেও সামগ্রিকভাবে নারীর অংশগ্রহণ হতাশাজনক। ফোরামের দাবি, নির্বাচন কমিশন ‘জেন্ডার ইনক্লুসিভ ইলেকশন’-এর কথা বললেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, ‘আমরা সংরক্ষিত আসনের বিপক্ষে। আমরা চাই না নারীর জন্য আলাদা সংরক্ষিত আসন থাকুক। নারীরা নিজেদের যোগ্যতায় সরাসরি নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করুক।’
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, ৫৪ বছর পর এমন একটি নির্বাচন হচ্ছে, যেখানে নারীর অংশগ্রহণ সবচেয়ে কম। এটি শুধু নারীর জন্য নয়, পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য লজ্জাজনক। রাজনৈতিক দলগুলো যদি ঘোষণাপত্র ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে, তাহলে ভবিষ্যতে নারীরা কেন তাদের ওপর আস্থা রাখবে, এই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফোরাম নেতা সামিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘আমরা বারবার বলি, দেশে নারী ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ বা তারও বেশি। সঠিক সংখ্যাটি এই মুহূর্তে আমার কাছে নেই, যদি ৫১ শতাংশ নারী ভোটার হন, তাহলে আমাদের পরবর্তী এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হওয়া উচিত নারীকে অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা, সংগঠিত করা এবং রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় করে তোলা। কারণ ৫১ শতাংশ মানুষকে বাদ দিয়ে বাকি ৪৯ শতাংশ দিয়ে কি আদৌ ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব? এটি একটি মৌলিক প্রশ্ন। আসন্ন নির্বাচনে যারা নারীনেত্রী হিসেবে প্রার্থী হয়েছেন এবং নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয় রয়েছেন, তাদের সঙ্গে আমরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ করার চেষ্টা করছি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা পর্যবেক্ষণ করছি, তারা কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন, সেসব চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবিলা করছেন এবং ভবিষ্যতে সেগুলো মোকাবিলার কার্যকর পথ কী হতে পারে। দুঃখজনক হলেও সত্য, নারীর অধিকার নিয়ে অনেক কথা বলা হলেও এই নির্বাচনে নারীপ্রার্থীর সংখ্যা অত্যন্ত কম। এই বাস্তবতা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। আমরা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বসব এবং আলোচনা করব, এই পরিস্থিতিতে কী করণীয়। রাজনৈতিক দলগুলো যদি নির্ধারিত ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্বের লক্ষ্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হয়, সেক্ষেত্রে কোনো আইনগত বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখব। এবার হয়তো তাৎক্ষণিক কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই, তবু বিষয়টি আমরা উপেক্ষা করতে পারি না।’
আমার বার্তা/এমই

