
মানবজাতির বংশপরিচয়, পারিবারিক পবিত্রতা ও সামাজিক স্থিতি রক্ষায় ইসলাম সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। বংশ ও মানবপ্রজন্ম সংরক্ষণ (হিফজুন-নাসল) মাকাসিদুশ-শরিয়াহর অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্য। সন্তানের পিতৃত্ব নির্ধারণ উত্তরাধিকার, ভরণপোষণ, অভিভাবকত্ব ও সামাজিক অধিকারের ভিত্তি। ইসলাম এ বিষয়ে এমন একটি ন্যায়ভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো প্রদান করেছে, যা সন্দেহ, অপবাদ ও অনিশ্চয়তা থেকে পরিবার ও সন্তানের অধিকারকে সুরক্ষা দেয়।
বংশ পরিচয়ের গুরুত্ব ও কোরআনের নির্দেশনা
ইসলামে নাসাব বা বংশপরিচয় সংরক্ষণকে ইবাদতের সমতুল্য মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘তোমরা সন্তানদের তাদের পিতার পরিচয়ে ডাকো; এটাই আল্লাহর কাছে অধিক ন্যায়সঙ্গত।’ (সুরা আহজাব: ৫) অন্যত্র আল্লাহ তাআলা মানবসৃষ্টির প্রক্রিয়া ও পারিবারিক বন্ধনের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেন- ‘তিনিই মানুষকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তাকে বংশ ও বৈবাহিক সম্পর্কের অধিকারী করেছেন।’ (সুরা ফুরকান: ৫৪)
মূল শরিয়তগত নীতি: ‘আল-ওলাদু লিল-ফিরাশ’
পিতৃত্ব নির্ধারণে ইসলামের মৌলিক ও প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো রাসুলুল্লাহ (স.)-এর কালজয়ী বাণী- ‘সন্তান হলো বৈধ শয্যার (স্বামী) অধিকারীর জন্য, আর ব্যভিচারীর জন্য রয়েছে বঞ্চনা।’ (বুখারি ও মুসলিম)
ব্যাখ্যা: যদি কোনো নারী বৈধ বিবাহবন্ধনে থাকেন এবং সন্তান জন্ম দেন, শরিয়তের দৃষ্টিতে সেই সন্তান স্বামীরই বলে গণ্য হবে। এখানে মূল শরিয়তগত ভিত্তি হলো ‘ফিরাশ’ বা বৈধ দাম্পত্য সম্পর্ক। সুতরাং কেবল নিছক সন্দেহ, অনুমান বা বাহ্যিক ধারণার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত কোনো নাসাব অস্বীকার করা শরিয়তসম্মত নয়।
সন্দেহ নিরসনে কোরআনি পদ্ধতি: ‘লিআন’
যদি কোনো স্বামী স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ আনেন এবং সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকার করেন, অথচ চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে না পারেন- তাহলে শরিয়তে ‘লিআন’ নামক বিশেষ বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়া প্রযোজ্য হয়। আল্লাহ তাআলা সুরা নূরের ৬–৯ নম্বর আয়াতে এর বিধান বর্ণনা করেছেন।
লিআন প্রক্রিয়া ও ফলাফল: স্বামী ও স্ত্রী আদালতের সামনে আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্য প্রদান করেন এবং পঞ্চমবার অভিশাপ বা গজবের শপথ করেন। এর ফলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে স্থায়ী বিচ্ছেদ ঘটে, স্বামীর দিক থেকে সন্তানের নাসাব বিচ্ছিন্ন হয় এবং সন্তান মায়ের সাথে নাসাবগতভাবে সম্পৃক্ত থাকে। এটি পারিবারিক মর্যাদা রক্ষা ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে শরিয়তের একটি চূড়ান্ত সমাধান।
হানাফি ফিকহসহ অধিকাংশ ফুকাহার (জমহুর) মতে, বৈধ বিবাহবহির্ভূত ক্ষেত্রে জৈবিক পিতার সাথে শরিয়তসম্মত নাসাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। এ ক্ষেত্রে সন্তান সাধারণত মায়ের সাথে নাসাবগতভাবে সম্পৃক্ত হয় এবং মায়ের মাধ্যমেই শরিয়তসম্মত অধিকার লাভ করে। তবে আধুনিক ফিকহি আলোচনায় কোনো কোনো আলেম বিশেষ পরিস্থিতিতে ও সুনির্দিষ্ট শর্তে জৈবিক পিতার স্বীকৃতির ভিত্তিতে ভিন্ন মতও পর্যালোচনা করেছেন। উল্লেখ্য যে, পরিস্থিতির ভিন্নতা যাই হোক না কেন, শিশুটি ইসলামে নিষ্পাপ এবং পূর্ণ মানবিক মর্যাদার অধিকারী।
আধুনিক বিজ্ঞান ও ডিএনএ পরীক্ষা
ডিএনএ পরীক্ষা আধুনিক বিজ্ঞানে অত্যন্ত নির্ভুল ও শক্তিশালী একটি মাধ্যম। তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে এর অবস্থান অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট-
১. সহায়ক প্রমাণ: শিশু অদলবদল, পরিচয়হীনতা বা অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রে ডিএনএ পরীক্ষা ‘কারিনা’ বা সহায়ক প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
২. শরিয়তের অগ্রাধিকার: অধিকাংশ ফকিহের মতে, ডিএনএ এককভাবে প্রতিষ্ঠিত নাসাব (ফিরাশ) বাতিল করার জন্য যথেষ্ট নয়। ফিরাশই মূল দলিল হিসেবে বহাল থাকে এবং ডিএনএ রিপোর্ট বিচারকের জন্য একটি শক্তিশালী সহায়ক আলামত মাত্র। এটি শরিয়ত নির্ধারিত লিআনের বিকল্প নয়।
বিশেষ পরিস্থিতিতে নাসাবের বিধান
যদি কোনো নারী জবরদস্তিমূলক নির্যাতনের শিকার হন, সেই ঘটনায় জন্ম নেওয়া সন্তানের কোনো দায় তার ওপর বর্তায় না। ইসলাম ঘোষণা করে- ‘কেউ অন্যের বোঝা বহন করবে না।’ (সুরা আনআম: ১৬৪) এ ক্ষেত্রে বৈবাহিক সম্পর্ক বিদ্যমান থাকলে ‘ফিরাশ’ অনুযায়ী নাসাব সাব্যস্ত হবে, অন্যথায় মাতৃনাসাব কার্যকর থাকবে। এছাড়া তালাকপ্রাপ্তা বা বিধবা নারীর ইদ্দতকালীন গর্ভজাত সন্তান নির্ধারিত শর্তে পূর্ববর্তী স্বামীর সাথে নাসাবগতভাবে সম্পৃক্ত বলে গণ্য হয়।
ইসলাম প্রমাণ ছাড়া সন্দেহ, ধারণা ও অপবাদ প্রদানকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘হে মুমিনগণ! তোমরা অধিক ধারণা থেকে বেঁচে থাকো; নিশ্চয় কিছু ধারণা গুনাহ।’ (সুরা হুজরাত: ১২) অতএব, পরিবার ও সন্তানের বিষয়ে ভিত্তিহীন সন্দেহ সামাজিক ও শরিয়তগতভাবে গুরুতর অপরাধ।
শিশুর মর্যাদা ও অধিকার
প্রতিটি শিশু ইসলামে নিষ্পাপ ও মর্যাদাবান। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘প্রতিটি শিশু ফিতরাতের (বিশুদ্ধ প্রকৃতি) ওপর জন্মগ্রহণ করে।’ (সহিহ বুখারি) অতএব শিশুর পরিচয় সংরক্ষণ, সুন্দর নাম প্রদান এবং নিরাপদ লালন-পালন নিশ্চিত করা সমাজ ও অভিভাবকদের ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব।
ইসলাম সন্তানের পিতৃত্ব নির্ধারণে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থা প্রদান করেছে। ফিরাশ, লিআন এবং প্রমাণভিত্তিক বিচার- এই তিনটি মূল স্তম্ভের মাধ্যমে ইসলাম পরিবার রক্ষা, সন্দেহ নিয়ন্ত্রণ এবং শিশুর অধিকার নিশ্চিত করেছে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন বংশপরিচয় সংরক্ষিত হয়, অন্যদিকে সমাজ অপবাদ ও বিশৃঙ্খলা থেকে সুরক্ষিত থাকে।
তথ্যসূত্র: সুরা আহজাব; সুরা নূর; সুরা হুজরাত; সুরা ফুরকান; সুরা আনআম; বুখারি; মুসলিম; হিদায়া; রদ্দুল মুহতার; আল-ফিকহুল ইসলামি ওয়া আদিল্লাতুহু; আন্তর্জাতিক ইসলামি ফিকহ একাডেমির সিদ্ধান্তসমূহ
আমার বার্তা/জেএইচ

