
কৃষি মন্ত্রনালয়ের অতিরিক্ত সচিব (গবেষনা অনুবিভাগ) মো. আবু জুবাইর হোসেন বাবলু বলেছেন- "কৃষি মন্ত্রনালয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিজ উৎপাদন ব্যবস্থাকে আধুনিকীকরন করতে- ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। এ ক্ষেত্রে কৃষি মন্ত্রনালয়ে নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কৃষি বিজ্ঞানীরা কৃষিজ উৎপাদন ব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণে বিভিন্ন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করছে। এসব উদ্ভাবিত প্রযুক্তির কৃষিযন্ত্র বাস্তবে নির্মান করতে কাজ করছে- উত্তরন ইঞ্জিনিয়ারিং নামের একটি দেশীয় প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানে সম্প্রতি কৃষিবিদ ড: মো: আনোয়ার হোসেন নামের একজন কৃষি বিজ্ঞানীকে সাথে নিয়ে উত্তরন ইঞ্জিনিয়ারিং নামের এই প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন কার্যক্রম পরিদর্শন করেছি। তাদের উৎপাদন নিপুনতা দেখে আমি সন্তোষ প্রকাশ করছি। আমি বিশ্বাস করি- বিভিন্ন প্রযুক্তির কৃষিযন্ত্র উৎপাদনে প্রতিষ্ঠানটি ভাল করছে”- অতি সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রনালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোঃ আবু জুবাইর হোসেন বাবলু দিনাজপুরে অবস্থিত- উত্তরণ ইঞ্জিনিয়ারিং এর কৃষিযন্ত্র উৎপাদন ও দেশব্যাপী সরবরাহ পরিদর্শন করে - এই প্রতিনিধির এক প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে এই মতামত ব্যক্ত করেন। এ সময়ে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এর এল এস টি ডি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ডঃ মোঃ আনোয়ার হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
এ প্রসঙ্গে অতিরিক্ত সচিব মোঃ আবু জুবাইর হোসেন বাবলু বলেন- “ধান গবেষনা ইনষ্টিটিউট এর অধীনে ৬টি আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে স্থান ভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং বিদ্যমান গবেষণার উন্নয়ন (এল এস টি ডি) প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ডঃ মোঃ আনোয়ার হোসেন-তার প্রকল্পের আওতায় "ওপেন ড্রাম থ্রেসার যন্ত্রটি তৈরীতে আধুনীকীরন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন। যা উত্তরন ইঞ্জিনিয়ারিং তৈরি করছে। এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত বনর্না করে বলেন- "বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে ধান মাড়াইয়ের সময় সাধারনত আটি ধরে মাড়াই করা হয়। কারন ধানের খড় এখানে অত্যান্ত মূল্যবান। গরুর খাবার, বিছালী, শস্য ক্ষেত্রের বেড়া এবং জমি ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন কাজে খড় অপরিহার্য হওয়ায় কৃষকরা কখনই খড় নষ্ট করেন না। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে আস্ত আটি বাজারেও বিক্রি করা হয়। যা অতিরিক্ত আয়ের উৎস্য। এ কারনেই কৃষকরা এমন থ্রেসার ব্যবহার করতে চান, যা খড় নষ্ট না করে মাড়াই করতে সম্পন্ন করতে পারে। বাংলাদেশের ধান গবেষনা ইনষ্টিটিউট (ইজজও) উদ্ভাবিত ওপেন ড্রাম থ্রেসার- এ অঞ্চলে ব্যাপক জনপ্রিয় হলেও একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো - মাড়াইয়ের পর ধান পরিষ্কার থাকেনা। ধানের সাথে শীষ, খড়ের টুকরা ও অন্যান্য আবর্জনা মিশে থাকে। ফলে আলাদা করে ধান পরিস্কার, ঝাড়াই এবং বস্তাবন্দী করতে কৃষকদের অতিরিক্ত শ্রম ও সময় ব্যয় হয়।"
এ বিষয়ে ব্যাখা দিয়ে অতিরিক্ত সচিব মোঃ আবু জুবাইর হোসেন বাবলু আরো বলেন- “এল এস টি ডি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ডঃ মোঃ আনোয়ার হোসেন তাঁর প্রকল্পের আওতায় ওপেন ড্রাম থ্রেসার টিকে উন্নত করে এমন একটি মেশিনে রূপ দিয়েছেন যা এক সাথে ধান মাড়াই, ঝাড়াই এবং বস্তাবন্দী করতে সক্ষম হবে। এ কার্যক্রমে নতুন ডিজাইনে উইনোয়িং ব্যবস্থা সংযুক্ত করা হয়েছে। যাতে মাড়াইয়ের পর ধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিস্কার হয়ে বের হয়। এ কার্যক্রম বস্তাবন্দী করার একটি আলাদা মেকানিজম ও যুক্ত করা হচ্ছে। যাতে ধান সরাসরি ব্যাগে সংগ্রহ করা যায়। পাশাপাশি শীষগুলো মাড়াইয়ের সময় ছুটে যায়, সেগুলোও মাড়াইয়ের ব্যবস্থাও সংযুক্ত করা হয়েছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে এক সাথে ৪ থেকে ৫ জন শ্রমিক এক সাথে ধান মাড়াই করতে পারবে এবং ঘন্টায় প্রায় এক একর জমির ধান মাড়াই, পরিস্কার ও বস্তাবন্দী করা সম্ভব হবে। ফলে উত্তরাঞ্চল সহ যে সব এলাকায় কৃষক আস্ত খড় সংবক্ষণ করতে চান, সেখানে এই মেশিনটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। কৃষি শ্রম সংকট, সময় ব্যবস্থাপনা, এবং মাড়াই পরবর্তী ক্ষতি কমানোর ক্ষেত্রে এ কৃষি যন্ত্রটি অত্যান্ত জনপ্রিয় হবে বলে বিশ্বাস করি। উত্তরন ইঞ্জিনিয়ারিং এই যন্ত্রটি তৈরী করছে।
ওপেন ড্রাম থ্রেসার- যন্ত্রের আধুনিকীকরন এক গল্প শুনতে শুনতে আমরা উত্তরণ ইঞ্জিনিয়ারিং এর ইতিহাস জানার চেষ্টা করেছি। বিভিন্ন খোজ খবর নিয়ে জেনেছি- উত্তরণ ইঞ্জিনিয়ারিং ১৯৯১ সালে দনিাজপুর জলোর সদর উপজলোর কালতিলা নামক
স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার পেছনে প্রধান ভাবনা ও পরিকল্পনায় ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সামাদ। তিনি দিনাজপুর সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি, তিনি দিনাজপুরে একটি আধুনিক কৃষি যন্ত্র উৎপাদন কারখানা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এগিয়ে আসেন, যা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি যন্ত্রের চাহিদা পূরণ করতে পারবে। প্রতিষ্ঠাতার দীর্ঘদিনের জমানো জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার চূড়ান্ত প্রকাশ হিসেবেই এই প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।
উত্তরণ ইঞ্জিনিয়ারিং কৃষি আধুনিকীকরণ এবং কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতি এবং উন্নয়নে সক্রিয়ভাবে কাজ করে আসছে। প্রতিষ্ঠা কাল থেকে আমরা মানসম্মত ও টেকসই কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরি, উন্নয়ন ও গবেষণায় নিবেদিত। আমরা কৃষকদের আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি সম্পর্কে পরিচিত করার জন্য নিয়মিত মাঠ প্রদর্শনী, মেলা, রোড শো, বিনামূল্যে সার্ভিসিং এবং প্রচারাভিযান পরিচালনা করে থাকি। এসকল কার্যক্রমের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশের কৃষকদের উন্নত কৃষি পদ্ধতিতে চাষাবাদ নিয়ে অবগত করার কাজ করে যাচ্ছি ।
এই কর্মসূচীগুলির মাধ্যমে আমরা কৃষকদের আমাদের যন্ত্রপাতি মূহের সর্বোত্তম ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা ও প্রশিক্ষণ প্রদান করি। এর লক্ষ্য হলো ফসল কর্তন ও শস্য মাড়াইয়ের খরচ সর্বনিম্ন করা, বিনা কর্ষণের মাধ্যমে মাটির উর্বরতা সংরক্ষণ, ভূ-পৃষ্ঠস্থ জলের সঠিক ব্যাবহার নিশ্চিত করা ইত্যাদি।
সনাতন কৃষি পদ্ধতিকে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির মাধ্যমে করার লক্ষে আমরা বিভিন্ন ধরনের কৃষি যন্ত্রপাতি যেমন— ধান ও গম মাড়াইয়ের জন্য পাওয়ার থ্রেসার, ভুট্টা মাড়াইয়ের পাওয়ার থ্রেসার, পাওয়ার টিলার, পাওয়ার রিপার, শস্য ঝাড়াই যন্ত্র, বীজ ঝাড়াই যন্ত্র, ড্রাম সিডার, পাওয়ার টিলার পরিচালিত সিডার, পাওয়ার টিলার পরিচালিত বেড প্ল্যান্টার, আলু রোপণ ও উত্তোলন যন্ত্র, শস্য শুষ্ককরণ যন্ত্র, চীনাবাদামের খোসা ছাড়ানোর যন্ত্র, চীনাবাদাম মাড়াই যন্ত্র, যান্ত্রিক ও শক্তি-চালিত আগাছা নিড়ানি যন্ত্র, গ্রেডার (আলু, ভুট্টা ইত্যাদির মান নির্ণায়ক যন্ত্র) সহ আরও অনেক সরঞ্জাম উৎপাদন করে আসছি।
উত্তরণ ইঞ্জিনিয়ারিং নিজস্ব উদ্ভাবিত ও নকশাকৃত কৃষি যন্ত্র উৎপাদনের পাশাপাশি বারি (BARI), ব্রি (BRRI), কেজিএফ (KGF), আরডিএ (RDA), বিডব্লিউএমআরআই (BWMRI), এইচএসটিইউ (HSTU), বিএইউ (BAU) সহ বিভিন্ন সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নকশাকৃত যন্ত্রপাতিও প্রস্তুত করে থাকে।
যন্ত্রপাতি উৎপাদনের পাশাপাশি, উত্তরণ ইঞ্জিনিয়ারিং চীনের তৈরি OSAKA ব্র্যান্ডের কম্বাইন হারভেস্টার এবং রাইস ট্রান্সপ্ল্যান্টার, ভিয়েতনামের UTTARON ব্র্যান্ডের রিপার, এবং চীনের UTTARON ব্র্যান্ডের রিপার বাইন্ডার -এর পরিবেশক হিসেবে কাজ করছে।
এছাড়াও, আমরা চীনের তৈরি OSAKA ব্র্যান্ডের মিনি টিলার (Mini Tiller), পাওয়ার স্প্রেয়ার, রাইস মিল, ফ্লাওয়ার মিল, এবং অয়েল মিল সরবরাহ করি; চীন থেকে আগত UTTARON ব্র্যান্ডের পাওয়ার টিলার, ভারত থেকে আগত Fieldking ব্র্যান্ডের রোটারি টিলার, এবং অন্যান্য বিখ্যাত প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন যন্ত্রপাতিও সরবরাহ করে থাকি।
পশুসম্পদ, মৎস্য এবং অন্যান্য ক্ষেত্র সহ কৃষির বিভিন্ন শাখায় উত্তরণ তার পদচিহ্ন স্থাপন করেছে।
দক্ষ কারিগরি জনশক্তি সৃষ্টির লক্ষ্যে, উত্তরণ ২০১৪ সালে নিজস্ব ব্র্যান্ড নামে একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছি।
বর্তমানে, উত্তরণ পলিটেকনিক ইন্সিটিউট মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে চার বছর মেয়াদী ডিপ্লোমা কোর্স অফার করছে।
যন্ত্রপাতি তৈরির পাশাপাশি, বাজারে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য এবং সব সময় উন্নত সেবা দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানটি কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরির পাশাপাশি গবেষণার বিষয়টিকেও একটি প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ধরেছে।
শুরুতে আবদুস সামাদ উত্তরণ ইঞ্জিনিয়ারিং-এর চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০১৭ সালে তিনি অসুস্থ হলে এবং বয়স বেড়ে যাওয়ায়, তিনি তার জামাতা মোঃ রাফেদ-উল ইসলামকে কোম্পানির সম্পূর্ণ দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন। মোঃ রাফেদ-উল ইসলাম এখন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (Managing Director) হিসেবে উত্তরণ ইঞ্জিনিয়ারিং এর দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া প্রতিষ্ঠাতা প্রকৌশলী আব্দুস সামাদ এখনও একজন উপদেষ্টা হিসেবে প্রতিষ্ঠান এর উন্নয়নে যথাযথ পরামর্শ দিচ্ছেন।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ রাফেদ-উল ইসলাম পরিশেষে বলেন- “আমাদের কারখানা ও প্রধান অফিস দিনাজপুরে। এছাড়াও ঢাকায় আমাদের আরেকটি অফিস এবং যশোর, ময়মনসিংহ ও রংপুরে তিনটি আঞ্চলিক অফিস রয়েছে। শুধু তাই নয়, আমরা নিজস্ব বিক্রয় ও সেবা টিমের মাধ্যমে সারা বাংলাদেশে 3S (বিক্রি, সার্ভিস, খুচরা যন্ত্রাংশ) পদ্ধতি তে সেবা দিচ্ছি এবং সারাদেশ জুড়ে ডিলার নেটওয়ার্কও তৈরি করেছি । আমাদের লক্ষ্য দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বল্পমূল্যে কৃষকদের ঘরে ঘরে কৃষিযন্ত্র পৌছে দেওয়া। সেই লক্ষ্য অর্জনে কাজ করছি।”
আমার বার্তা/এমই

