
বাংলাদেশে অবস্থিত মরক্কো দূতাবাস মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের সিংহাসন আরোহণ দিবস উদযাপন করেছে। গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাতে ঢাকার একটি পাঁচ তারকা হোটেলে তারা তাঁর সিংহাসন আরোহণের ২৭তম বার্ষিকী উদযাপনের জন্য একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
বাংলাদেশের পরিবেশ,বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আব্দুল আওয়াল মিন্টু অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ এবং গনমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানটি যথাক্রমে বাংলাদেশ এবং মরক্কোর জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে শুরু হয়। বাংলাদেশে বসবাসরত মরক্কোর নাগরিক কর্তৃক দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়। এরপর মরক্কো দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত লাল্লা বুথাইনা এল কেরদৌদি এল কৌলালি বক্তব্য রাখেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর মরক্কো কর্তৃক স্বীকৃতি প্রদান করার কথা তুলে ধরেন।
তিনি মরক্কো বাংলাদেশের পারস্পরিক সম্পর্ক আগের চেয়ে আরো জোরদার হয়েছে বলে মন্তব্য করেন। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ মরক্কো সফর করেন । এতে দুই ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এছাড়াও তিনি সম্প্রতি শেষ হওয়া বিশ্বকাপ ফুটবলে বাংলাদেশের জনগণের মরক্কোর প্রতি বিশাল সমর্থন জানানোর জন্য ধন্যবাদ জানান।
মরক্কোর সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি সার ক্রয়ের জন্য মরক্কোকে বেছে নেয়ায় বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানান । সেই সাথে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ মরক্কো থেকে আরো বেশি পরিমাণে সার আমদানি করবে বলে আশা প্রকাশ করেন । মরক্কো বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন ধরনের গার্মেন্টস পণ্য আমদানি করে থাকে । এটি ভবিষ্যতে আরো বাড়বে বলে তিনি আশা করছেন ।
মরক্কো একটি আধুনিক, উন্নত এবং মুসলিম দেশ । এর প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং চমৎকার সংস্কৃতি রয়েছে । মরক্কো আফ্রিকার একটি উন্নত দেশ এবং বর্তমান রাজার অধীনে উত্তরোত্তর তা সমৃদ্ধি লাভ করছে । তিনি মরক্কোতে বাংলাদেশীদের বেশি বেশি ভ্রমণ করার আহ্বান জানান।
প্রধান অতিথি আব্দুল আউয়াল মিন্টুর বলেন, মরক্কো রাজ্যের জাতীয় দিবস এবং মহামান্য রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের সিংহাসনারোহণের ২৭% বার্ষিকী উদযাপনের এই সন্ধ্যায় যোগদান করতে পারাটা আমার জন্য সত্যিই এক বিরাট সম্মানের বিষয়। এই শুভ উপলক্ষে, বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে এবং আমার নিজের পক্ষ থেকে, আমি মহামান্য রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ, মরক্কো সরকার এবং ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণকে আমাদের উষ্ণতম অভিনন্দন ও আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই।
এই ঐতিহাসিক দিনটি একটি সমৃদ্ধ ও প্রগতিশীল জাতি গঠনে মরক্কোর জনগণের সহনশীলতা, দৃঢ়সংকল্প এবং আকাঙ্ক্ষার এক জীবন্ত প্রমাণ। মহামান্য রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের দূরদর্শী নেতৃত্বে মরক্কো জাতীয় উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং আঞ্চলিক সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে চলেছে। তাঁর নেতৃত্বে মরক্কো আজও সংযমের কণ্ঠস্বর এবং প্রগতির একটি আঞ্চলিক মডেল হিসেবে স্বতন্ত্র হয়ে আছে।
পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অভিন্ন মূল্যবোধ এবং একই আকাঙ্ক্ষার উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ ও মরক্কোর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ও সৌহার্দ্যপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বিদ্যমান। আমি সশ্রদ্ধভাবে স্মরণ করি যে, আমাদের স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের ১৩ই জুলাই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানকারী প্রথম দেশগুলোর মধ্যে মরক্কো অন্যতম ছিল। বহু আগেই আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল এবং তখন থেকেই আমাদের বন্ধুত্ব ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। আমি গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি যে, ১৯৮১ সালে আল কুদস কমিটির বৈঠকে যোগদানের জন্য তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মরক্কো সফর আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গঠনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছিল।
আমাদের দুই দেশ জাতিসংঘ, ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) এবং জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন (ন্যাম) সহ বহুপাক্ষিক মঞ্চে ঘনিষ্ঠভাবে সহযোগিতা করে, যেখানে আমরা প্রায়শই বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বিষয়ে অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বিনিময় করি। আমরা অত্যন্ত আনন্দের সাথে জানাচ্ছি যে, মরক্কো রাবাতে ওআইসি-র অন্যতম প্রধান সহযোগী সংস্থা, আইসেস্কো (ইসলামিক ওয়ার্ল্ড এডুকেশনাল, সায়েন্টিফিক অ্যান্ড কালচারাল অর্গানাইজেশন)-এর আয়োজক, যার মাধ্যমে ওআইসি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে শিক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি এবং প্রযুক্তিতে সহযোগিতা আরও গভীর হচ্ছে।
আমাদের দুই দেশের মধ্যে উষ্ণ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বর্তমান পরিমাণ এখনও এর পূর্ণ সম্ভাবনাকে প্রতিফলিত করতে পারেনি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ও মরক্কোর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রায় ৮০৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যেখানে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২২.৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং মরক্কো থেকে আমদানির পরিমাণ ছিল ৭৮১.৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার প্রধান অংশ ছিল সার। আমরা বিশ্বাস করি, উভয় দেশের পারস্পরিক স্বার্থে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে বৈচিত্র্যময় ও সম্প্রসারিত করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
এরপর মরক্কোর উপর নির্মিত একটি বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। যেখানে মরক্কোর বিবিধ উন্নয়ন ও অগ্রগতি তুলে ধরা হয়।
আমার বার্তা/এমই

