
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শেষ মূহুর্তে মানিকগঞ্জ জেলার তিনটি সংসদীয় আসনে এখন বইছে নির্বাচনী রাজনৈতিক হাওয়া। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে গ্রামের প্রত্যন্ত অলিগলি—সবখানেই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রার্থীদের আমলনামা ও আগামীর ভোটের চুলচেরা বিশ্লেষণ।
মানিকগঞ্জের তিনটি আসনের মধ্যে একটি আসেন ত্রিমুখী ও অপর দুটি আসনে জামায়েত ইসলামীর কোন প্রার্থী না থাকায় এবার প্রথাগত দ্বিমুখী লড়াইয়ের দিকে প্রবাহীত হচ্ছে। তবে মানিকগঞ্জের তিনটি সংসদীয় আসনে ভোটের রাজনীতিতে নারীরা আবির্ভূত হতে পারে নির্বাচনের গেম চেইঞ্জার হিসেবে। নারী ভোটাররা ও ৫ আগষ্টের পরবর্তী যুব ভোটার মিলে নির্বাচনের ফলাফল ঘুরিয়ে দিতে পারেন। মানিকগঞ্জ জেলার তিনটি আসনে মোট ভোটার ১৩ লাখ ৩৪ হাজার ৬৯৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ লাখ ৬৮ হাজার ৫২৩ জন এবং নারী ভোটার ৬ লাখ ৬৬ হাজার ১৬২ জন। অর্থাৎ নারী ও পুরুষ ভোটারের ব্যবধান মাত্র ২ হাজার ৩৩১ জন। এই ছোট্ট ব্যবধানই নির্বাচনি হিসাব-নিকাশে নারী ভোটারদের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে।
তিনটি আসনের মধ্যে মানিকগঞ্জ-১ ও মানিকগঞ্জ-২ আসনে নারী ভোটার পুরুষের তুলনায় বেশি। মানিকগঞ্জ-১ আসনে নারী ভোটার ২ লাখ ২৯ হাজার ৩১৮ জন, যা পুরুষ ভোটারের চেয়ে ১ হাজার ৩৫৬ জন বেশি। একইভাবে মানিকগঞ্জ-২ আসনে নারী ভোটার সংখ্যা পুরুষের চেয়ে ১ হাজার ৮৫১ জন বেশি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নারী ভোটাররা যদি ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি বেশি হয়, সেক্ষেত্রে অনেক আসনের ফলাফল বদলে যেতে পারে। এ কারণে প্রার্থীরা শেষ সময়ে নারী ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা জোরদার করেছেন।
মানিকগঞ্জ-১ (ঘিওর, দৌলতপুর ও শিবালয়):
ত্রিমুখী লড়াই ও ৪.৭২ লাখ ভোটারের রায় ঘিওর, দৌলতপুর ও শিবালয় উপজেলা নিয়ে গঠিত মানিকগঞ্জ-১ আসনে এবার লড়াইয়ের ধরণটি সবচেয়ে বেশি রহস্যময়। এখানে মূলত একটি ত্রিশক্তি লড়াইয়ের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৭২ হাজার ৬২২ জন, যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩৭ হাজার ২০৫ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৩৫ হাজার ৪১৩ জন। এছাড়াও এই আসনে ৪ জন হিজড়া ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
এখানে বিএনপির মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী এস এ জিন্নাহ কবীর তাঁর দলের সাবেক মহাসচিবের এ আসনটি পুনরুদ্ধার ও দলীয় ভোটব্যাংক রক্ষায় চষে বেড়াচ্ছেন নির্বাচনী মাঠ।
তবে মাঠে বিএনপির নেতাকর্মী বিভক্ত হয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী তোজাম্মেল হক তোজা সাথে কাজ করার ফলে দল থেকে ৫যুবদল নেতাকে বহিষ্কার ও ৯ছাত্রদল নতাকে শোকজ করেছে। অপরদিকে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর শক্তিশালী প্রার্থী আবু বকর সিদ্দিক। তবে লড়াইটিকে আরও কঠিন করে তুলেছেন বিএনপির বিদ্রোহী সতন্ত্র প্রার্থী মোঃ তোজাম্মেল হক তোজা, যার মার্কা ঘোড়া’ ঘোরা মার্কার প্রচারণা স্থানীয় পর্যায়ে বড় ধরণের মেরুকরণ ঘটিয়েছে যা অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিয়েছে। প্রায় সমান সংখ্যক পুরুষ ও নারী ভোটারের এই আসনে শেষ পর্যন্ত কার ভাগ্যে জয়ের মুকুট উঠবে, তা নিয়ে ভোটারদের মধ্যে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।এ আসনে ৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বতা করছেন। দাঁড়িপাল্লা প্রতিক নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আবুবকর সিদ্দিক, ধরনের শীষ প্রতিক নিয়ে বিএনপির এস এ জিন্নাহ কবীর, ট্রাক প্রতিক নিয়ে গন অধিকার পরিষদের মোহাম্মদ ইলিয়াছ হুছাইন,কলম প্রতিক নিয়ে জনতার দল মোহাম্মদ শাহজাহান খান, হাতপাখা নিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোঃ খোরশেদ আলম,ঘোড়া প্রতিক নিয়ে (স্বতন্ত্র) মোঃ তোজাম্মেল হক।
মানিকগঞ্জ-২ (সিংগাইর, হরিরামপুর ও সদরের আংশিক)
এই আসেন বিএনপির মঈনুল ইসলাম খান (ধানের শীষ),জাতীয় পার্টি (জাপা) এস,এম,আব্দুল মান্নান(লাঙ্গল),ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মোহাম্মদ আলী (হাতপাখা)ও খেলাফত মজলিস,১১ দলীয় জোটর মোঃ সালাহউদ্দিন (দেয়াল ঘড়ি)। মোট ৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বতীতা করবেন। ৪.৬১ লাখ ভোটারের সমীকরণ সিংগাইর ও হরিরামপুর উপজেলার একাংশ নিয়ে গঠিত মানিকগঞ্জ-২ আসনে রাজনীতির চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। ৪ লাখ ৬১ হাজার ৯৪২ জন ভোটারের এই বিশাল জনপদে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩১ হাজার ৮৫৭ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৩০ হাজার ৮১ জন। এখানেও ৪ জন হিজড়া ভোটার তালিকাভুক্ত হয়েছেন। এই আসনে বিএনপির মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মঈনুল ইসলাম শান্ত বর্তমানে আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে আছেন ১১ দলীয় জোটের মোঃ সালাউদ্দিন এবং জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী এস এম মান্নান। যদিও মাঠপর্যায়ের আলোচনায় দাড়ি পাল্লা মার্কা না থাকায় ধানের শীষের প্রার্থী মঈনুল ইসলাম খান এগিয়ে রয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে, তবুও প্রায় আড়াই লাখ নারী ভোটারের নীরব সমর্থন শেষ মুহূর্তে ফলাফল বদলে দিতে পারে। আসনে ভিন্ন ভিন্ন মার্কায় ৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
মানিকগঞ্জ-৩ (সদর ও সাটুরিয়া):
এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ২৫৯ জন। এ আসনে ৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দিতা করছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখানে পুরুষ ভোটারের (১ লাখ ৯৯ হাজার ৩৯৮ জন) তুলনায় নারী ভোটারের সংখ্যা কিছুটা বেশি, যার পরিমাণ ২ লাখ ৬৬১ জন। এই আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন জেলা বিএনপির সভাপতি আফরোজা খানম, ফুটবল প্রতিক নিয়ে বিএনপির বহিষ্কৃত সাবেক নেতা ও উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃআতাউর রহমান আতা, রিক্সা প্রতিক নিয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের (১১ দলীয় জোট) মুহাম্মাদ সাঈদনূর, লাঙ্গল প্রতিক নিয়ে জাতীয় পার্টির(জাপা) আবুল বাশার বাদশা, সূর্যমুখি ফুল নিয়ে (স্বতন্ত্র) মফিজুল ইসলাম খান কামাল, মটরগাড়ি (কার)প্রতিক নিয়ে বাংলাদেশ জাসদের মোঃ শাহজাহান আলী,মটরসাইকেল প্রতিক নিয়ে (স্বতন্ত্র) রফিকুল ইসলাম খান, হাতপাখা প্রতীক নিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সামসুদ্দিন,বাইসাইকেল প্রতিক নিয়ে জাতীয় পার্টি (জেপি)মোয়াজ্জেম হোসেন খান মজলিস।
ধানের শীষের প্রার্থী আফরোজা এর প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন বিএনপিরই (বর্তমানে বহিষ্কৃত) সাবেক নেতা ও উপজেলা চেয়ারম্যান আতিউর রহমান আতা।বর্তমানে আতাউর রহমান আতার সমর্থকরা সহ বিএনপি'র সকল পর্যায়ের নেতা কর্মীরা এক সাথে কাজ করায় ধানের শীষ প্রতিকের পরিচিতি ও ব্যাক্তি আফরোজা খানম রিতা জনপ্রিয়তার বিচারে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন,১১দলিয় জোট জামায়াতে ইসলামী দাঁড়িপাল্লা প্রতিক দীর্ঘ দিন প্রচারনার পর হঠাৎ প্রার্থী ও প্রতিক পরিবর্তন করে শাহ মুহাম্মাদ সাঈদ নূরে এর মার্কা রিক্সা হওয়ায় ধানের শীষের প্রার্থী আফরোজা খানম এর ভিত শক্ত ও মজবুত করেছে। তবে ২ লাখেরও বেশি নারী এবং ৫ আগষ্ট পরবর্তী সময়ের নতুন ভোটারের মন জয় করা প্রার্থীর জন্যই হবে সহজ জয়।
সামগ্রিকভাবে মানিকগঞ্জের ১৩ লাখেরও বেশি ভোটার আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি তাঁদের রায় দেবেন। জেলাজুড়ে প্রার্থীদের গণসংযোগ, উঠান বৈঠক আর প্রচারণায় এখন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। ভোটারদের সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বলছে, প্রতিটি আসনেই প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ এবং নতুন ভোটারদের চাওয়াই হবে আগামী ৫ বছরের নেতৃত্বের মূল চাবিকাঠি। এ আসনে ভিন্ন ভিন্ন মার্কায় ৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বতা করছেন।
এখন দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত মানিকগঞ্জের সচেতন জনতা কাকে তাঁদের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদে পাঠায়।
আমার বার্তা/এমই

