
বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে উপকূলীয় জেলা কক্সবাজারে বিরাজ করছে বৈরী আবহাওয়া। জেলায় ভারী বৃষ্টিপাত যেন থামছেই না। টানা তিন দিনের ভারী বৃষ্টিতে স্বাভাবিক জীবনযাপনের গতি থমকে গেছে।
আজ সোমবারও (৬ জুলাই) ভারী বৃষ্টিপাতে জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধস ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন কয়েক হাজার মানুষ।
এদিকে রোববার দিনগত গভীর রাতে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও শহরে পৃথক পাহাড় ধসে ৯ জনের প্রাণহানি হয়েছে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসরত বাসিন্দাদের সরিয়ে নিতে মাইকিং করছে। কক্সবাজার সদর, টেকনাফ, পেকুয়া ও চকরিয়া উপজেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের যৌথ উদ্যোগে বিভিন্নস্থানে সকাল থেকে সতর্কতামূলক মাইকিং করা হচ্ছে।
টেকনাফের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরী জানিয়েছেন, ভারী বৃষ্টিতে উপজেলার সদর, হ্নীলা, বাহারছড়া, হোয়াইক্যং, সাবরাং ও সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল পানিতে প্লাবিত হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের কক্সবাজারের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, আজ দুপুর ১২টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ২৬৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আরও দুই দিন বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে টানা বর্ষণে কয়েক ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে কক্সবাজার পৌরসভার নিম্নাঞ্চল। এছাড়া কয়েক ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের বেশ কয়েকটি এলাকা। উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের নিম্নাঞ্চল ঢলের পানিতে প্লাবিত হয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে ঢালু ও পাহাড়ে অবস্থানরত উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় ও কয়েক হাজার রোহিঙ্গা।
এদিকে বিগত এক সপ্তাহ ধরে প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন-টেকনাফ নৌরুট বন্ধ রয়েছে। প্রবল বৃষ্টির কারণে দ্বীপের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। জেলে ও শ্রমজীবী মানুষের কাজ-কর্ম বন্ধ রয়েছে। সেন্টমার্টিনের শত শত বাড়ি কয়েক ফুট পানিতে তলিয়ে গেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন হাজারো মানুষ।
বৈরী আবহাওয়া এবং ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত জারির কারণে যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে বিআইডব্লিউটিএ কক্সবাজার জোনের নির্দেশনা অনুযায়ী নুনিয়াছড়া থেকে কক্সবাজার-মহেশখালী নৌরুটে চলাচলরত সি-ট্রাক সার্ভিস সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
সোমবার দুপুর ২টা ৩০ মিনিট থেকে পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত সি-ট্রাক চলাচল বন্ধ থাকবে। তাছাড়া ভারী বর্ষণে ধসে পড়েছে দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ার অতিগুরুত্বপূর্ণ লেমশীখালী-কৈয়ারবিল সংযোগ সেতু। এতে বড়ঘোপস্থ কুতুবদিয়া কলেজ ও বাজারে যেতে শিক্ষার্থীসহ শত শত মানুষের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
কক্সবাজার সদরের ঝিলংজা, চৌফলদন্ডী ও পিএমখালীর বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকায় কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পানিবন্দি নারী-শিশুদের উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেছে।
অন্যদিকে টানা ভারী বর্ষণের কারণে কক্সবাজার জেলার প্রধান দুই নদী মাতামুহুরি ও বাঁকখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকলে যেকোনো মুহূর্তে বন্যা সৃষ্টি হতে পারে।
টানা বর্ষণে কক্সবাজারের বৃহত্তম ঈদগাঁও বাজার, হাসপাতাল, ভূমি অফিস ও আশপাশের এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল মান্নান কালবেলাকে বলেন, ‘টানা ভারী বর্ষণ ও বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপে কক্সবাজারের পরিবেশ জটিল হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। পাহাড় ধস এবং ঢলের পানিতে যেন প্রাণহানি না হয় সেই বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদের তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে।’
শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘ঝুঁকিতে বসবাসরত শরণার্থীদের নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তর করতে আজ সারাদিন সহকর্মীরা কাজ করছে। আমরা চাই, পাহাড়ধসে আর কারও মৃত্যু না হোক।’
আমার বার্তা/এমই

