
আজ সোমবার বাংলাদেশ সময় ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার দ্য বেভারলি হিলটন হোটেলে বসেছিল গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কারের ৮৩তম আসর। কয়েক বছর আগের বিতর্ক, সংস্কার আর অনিশ্চয়তার অধ্যায় পেরিয়ে এখন আয়োজনটি অনেকটাই স্বাভাবিক ছন্দে ফিরেছে। এবারের আয়োজন তারই আরেকটি প্রমাণ। এবারের আসরে যেমন ছিল পূর্বানুমেয় বিজয়ীদের জয়রথ, তেমনি ছিল অপ্রত্যাশিত চমক, রসিকতা আর শিল্পীদের ব্যক্তিগত মুহূর্তে ভরা ঝলমলে আয়োজন।
অস্কার মৌসুমের সূচনালগ্নে গোল্ডেন গ্লোব বরাবরই একটি ‘টেম্পারেচার চেক’। সমালোচক, প্রযোজক ও দর্শক সবারই ধারণা থাকে, কোন সিনেমা ও কোন অভিনয়শিল্পীরা এগিয়ে আছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কয়েকটি আলোচিত ছবি ও অভিনয়শিল্পীদের পারফরম্যান্স প্রায় শুরু থেকেই ‘ফ্রন্ট-রানার’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল এবং শেষ পর্যন্ত সেগুলোর অনেকটাই পুরস্কারের মঞ্চে স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে এই পূর্বানুমেয়তার মধ্যেই ছিল কিছু চমক। কয়েকটি বিভাগে এমন কিছু নাম এবার উঠে এসেছে, যাদের জয় নিয়ে আলোচনা কম হয়েছিল।
৮৩তম আসরে জয়ীদের নাম ঘোষণা হতেই স্পষ্ট হয়ে গেল, আসরটি যেন দুটি ছবির। একদিকে রাজনীতিকে তীব্র ব্যঙ্গের ভেতর দিয়ে দেখানো সিনেমা ‘ওয়ার ব্যাটেল আফটার অ্যানাদার’, অন্যদিকে উইলিয়াম শেক্সপিয়রের জটিল পারিবারিক জীবনের গল্প নিয়ে এক আবেগঘন আখ্যান ‘হ্যামনেট’।
গোল্ডেন গ্লোবস যেহেতু অস্কারের মতো নয়, তাই এখানে সিনেমার ভাগ হয় ঘরানা অনুযায়ী। এবারে সেরা কমেডি বা মিউজিক্যাল সিনেমার সম্মাননা পায় ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’, ড্রামা বিভাগে সম্মাননা পায় ‘হ্যামনেট’। ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারি প্রযোজিত ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ চারটি পুরস্কার জেতে। পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার পল থমাস অ্যান্ডারসন নিজের ঝুলিতে নেন সেরা পরিচালনা ও সেরা চিত্রনাট্যের ট্রফি। অন্যদিকে ফোকাস ফিচার্স প্রযোজিত ‘হ্যামনেট’ জেতে দুটি পুরস্কার, এগুলোর মধ্যে জেসি বাকলি সেরা অভিনেত্রী হিসেবে সম্মানিত হন, এক শোকাহত মায়ের চরিত্রে অনবদ্য অভিনয়ের জন্য।
এবারের আসর সঞ্চালনা করেন নিকি গ্লেজার। টানা দ্বিতীয়বারের মতো সঞ্চালনার দায়িত্ব নিয়ে তিনি তাঁর উদ্বোধনী বক্তব্যে কাউকেই ছাড় দেননি। বারি ওয়েইস থেকে শুরু করে জেফ্রি এপস্টেইনের নথি, এমনকি নেটফ্লিক্সের কাছে ওয়ার্নার ব্রাদার্সের সম্ভাব্য বিক্রি- সবই ঠাঁই পায় তাঁর রসিকতায়। নিজেরাই নিজেদের নিয়ে বুঁদ হয়ে থাকা হলিউডকে তিনি বিদ্রূপ করে বলেন, ‘এই মুহূর্তে পৃথিবীতে যা ঘটছে, তার মধ্যে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এটাই।’ তবে রাতটি শুধুই হাসির ছিল না। বাস্তব রাজনীতির ছায়াও পড়েছে এই উৎসবে। মার্ক রাফালো ও ওয়ান্ডা সাইকসসহ কয়েকজন তারকা পরেছিলেন বিশেষ কোটপিন, যাতে লেখা ছিল ‘আইচ আউট’ ও ‘বি গুড’, মুলত মিনিয়াপোলিসে আইসিই এজেন্টের গুলিতে নিহত রেনে ম্যাকলিন গুডের স্মরণে।
অভিনয় বিভাগে রোজ বার্ন জেতেন সেরা অভিনেত্রী [কমেডি বা মিউজিক্যাল] ‘ইফ আই হ্যাড লেগস আই’ড কিক ইউ’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য। অভিনেতা টিমোথি শালামে তাঁর বহু প্রতীক্ষিত প্রথম গোল্ডেন গ্লোব পান মার্টি সুপ্রিম সিনেমায় পিংপং খেলোয়াড়ের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য। পরপর চারবার মনোনয়ন পেলেও খালি হাতে ফেরার স্মৃতি মনে করে তিনি মঞ্চে উঠে জানান, কৃতজ্ঞতাই তাঁকে এই মুহূর্ত পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে।
ড্রামা বিভাগে সেরা অভিনেত্রী হয়েছেন ওয়াগনার মউরা, ‘দ্য সিক্রেট এজেন্ট’ সিনেমায় রাজনৈতিক শরণার্থীর ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য। পুরস্কার নিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘যদি মানসিক ট্রমা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যেতে পারে, তবে মূল্যবোধও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যেতে পারে।’
টেলিভিশন বিভাগে গোল্ডেন গ্লোবস প্রায় এমির পথই অনুসরণ করেছে। ড্রামা, কমেডি ও লিমিটেড সিরিজ বিভাগে যথাক্রমে ‘দ্য পিট’, ‘দ্য স্টুডিও’ ও ‘অ্যাডোলেসেন্স’ প্রত্যাশিতভাবেই দাপট দেখিয়েছে। টেলিভিশনের সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম ছিল ‘অ্যাডোলেন্স’। নেটফ্লিক্সের এই সিরিজটি মোট চারটি পুরস্কার জিতে নেয়। একটিমাত্র শটে এগোনো এক খুনের তদন্তের গল্পটি শুধু দর্শকদের নয়, বিচারকদেরও মুগ্ধ করেছে। স্রষ্টা স্টিফেন গ্রাহাম জেতেন সেরা অভিনেতা (লিমিটেড সিরিজ), আর তাঁর সহশিল্পী ওউয়েন কুপার মাত্র ১৬ বছর বয়সে হয়ে যান এই বিভাগে সর্বকনিষ্ঠ বিজয়ী। ‘দ্য পিট’ সিরিজে এক ক্লান্ত কিন্তু লড়াকু চিকিৎসকের চরিত্রে অভিনয় করে সেরা অভিনেতা হন নোয়া ওয়াইল। অন্যদিকে ‘প্লুরিবাসে’ অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেত্রীর সম্মাননা পেয়েছেন রিয়া সিহর্ন, এটি তার প্রথম গোল্ডেন গ্লোব জয়। ক্যাথি বেটস, হেলেন মিরেনের মতো অভিনেত্রীদের পেছনে ফেলে তিনি পেয়েছেন সম্মাননা। ‘দ্য স্টুডিও’তে অগোছালো এক স্টুডিও এক্সিকিউটিভের ভূমিকায় সেরা অভিনেতা (টিভি কমেডি) হন সেথ রোজেন। আর হ্যাকস এ এক স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ানের চরিত্রে অভিনয় করে তৃতীয়বার গোল্ডেন গ্লোব জেতেন জিন স্মার্ট।
এবারের আসরের সবচেয়ে আবেগঘন বক্তব্যগুলোর একটি আসে অভিনেত্রী টেয়ানা টেলরের কাছ থেকে। ‘ওয়ান ব্যাটেল আফটার অ্যানাদার’ সিনেমায় বিপ্লবীর চরিত্রে অভিনয়ের জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী হয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের কোমলতা কোনো দুর্বলতা নয়। আমাদের আলো জ্বলার জন্য অনুমতির দরকার নেই।’ এ বছর প্রথমবারের মতো গোল্ডেন গ্লোবস সম্মান জানাল পডকাস্টকেও। সেরা পডকাস্টের পুরস্কার পায় গুড হ্যাং উইথ অ্যামি পোলার। সবশেষে, দক্ষিণের বিভক্ত আমেরিকায় প্রেক্ষাপট নিয়ে নির্মিত ভ্যাম্পায়ার ছবি সিনার্স জিতে নেয় বক্স অফিস ও সিনেম্যাটিক অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার।
এবারের আসরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল বিজয়ীদের বক্তৃতা। কেউ কেউ মঞ্চে উঠে ব্যক্তিগত সংগ্রাম, পরিবার বা সহকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন সংক্ষিপ্ত অথচ আবেগঘন ভাষায়। আবার কেউ কেউ সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কথাও ছুঁয়ে গেছেন, খুব সরাসরি না হলেও ইঙ্গিতে। লাল গালিচায় তারকাদের পদচারণা ছিল চোখে পড়ার মতো। একদিকে পুরনো হলিউড গ্ল্যামারের প্রতি শ্রদ্ধা। অন্যদিকে আধুনিক কাট, সাহসী পোশাক। আবার অনেক তারকাই যেন চেষ্টা করেছেন ট্রেন্ডের পেছনে না ছুটে নিজেদের ব্যক্তিত্বকে পোশাকের মাধ্যমে তুলে ধরতে।
এক সময় মনে হয়েছিল, গোল্ডেন গ্লোব তার প্রাসঙ্গিকতা হারাতে বসেছে। কিন্তু এবারের আসর দেখিয়ে দিল, এই অনুষ্ঠান এখনো শিল্পী ও ইন্ডাস্ট্রির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি শুধু পুরস্কার নয়; এখান থেকে শুরু হয় অস্কারমুখী যাত্রার বিশ্লেষণ ও প্রত্যাশা।
আমার বার্তা/এমই

