
নতুন সরকারকে বিব্রত করার জন্য আমলারা জ্বালানি তেলের এমন অব্যস্থাপনা করছে বলে মন্তব্য করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটার্স, এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স এসোসিয়েশন।
আজ বৃহস্পতিবার ধানমন্ডিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের আহবায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সারাদেশে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। গুজবের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং স্বাভাবিক চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত জ্বালানি ক্রয় শুরু হয়। এর ফলে বাজারে হঠাৎ চাপ তৈরি হয়। তবে সংকটের সূচনা গুজব থেকে হলেও, পরবর্তীতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) কর্তৃক তড়িঘড়ি করে জ্বালানি সংশ্লিষ্টদের সাথে কোনো প্রকার পূর্বে আলোচনা না করেই আরোপিত কঠোর বিপণন নীতিমালা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত ও দীর্ঘায়িত করেছে। এই সংকট মূলত প্রকৃত মজুদ ঘাটতির ফল নয়, বরং এটি বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ কাঠামো এবং নীতিগত ত্রুটির ফল।
‘গত রবিবার থেকে বিপিসি প্রতিটি পেট্রোল পাম্পের ওপর কোটা আরোপ করে এবং পূর্ববর্তী সময়ের গড় উত্তোলনের ভিত্তিতে ২৫ শতাংশের কম সরবরাহের নীতি গ্রহণ করে। দেশে সামগ্রিকভাবে জ্বালানি মজুদ সংরক্ষণের দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের নীতি বিবেচ্য হতে পারে, তবে সারাদেশের বাস্তবতায় এই নীতির প্রয়োগে একাধিক গুরুতর ত্রুটি রয়েছে।’
তিনি বলেন, বিপিসি মার্চ থেকে জুন সময়কালের গড় উত্তোলনকে ভিত্তি ধরে সরবরাহ কমিয়েছে। অথচ বাস্তবে মার্চের পর থেকে দেশে, বিশেষ করে সেচ ও শুষ্ক মৌসুম শেষ হওয়ার সাথে সাথে, জ্বালানির চাহিদা সাধারণত কমতে থাকে। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল সময়ে চাহিদা তুলনামূলক বেশি থাকে। ফলে মার্চ-জুনের গড় ধরে বর্তমান সরবরাহ নির্ধারণ করা বাস্তবতাসম্মত নয়। মাসভিত্তিক বা সমমানের সময়কালভিত্তিক তুলনা বেশি যৌক্তিক হতো।
‘পেট্রোল পাম্পগুলো বাস্তবে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৫ দিন এবং মাসে গড়ে ২০-২২ দিন জ্বালানি উত্তোলন করে। কিন্তু বিপিসি মাসকে ৩০ দিন ধরে ভাগ করে দৈনিক কোটা নির্ধারণ করেছে। এর ফলে কাগজে ২৫ শতাংশ সরবরাহ হ্রাস দেখালেও, বাস্তবে কার্যকর সরবরাহ আরও অনেক বেশি কমে গেছে। অর্থাৎ হিসাবগত ত্রুটির কারণে কোটা বাস্তবে এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি বেশি কম পড়েছে। কারণ এজেন্ট এবং প্যাক পয়েন্ট, ডিলারদের প্রতিনিয়ত যে বিশাল অংকের সরবরাহ সেটা বন্ধ আছে। ফলে ২৫ শতাংশ নিয়মিত কম এবং তাদের ২০ শতাংশ কম, অর্থাৎ সবমিলিয়ে মোট ৪৫ শতাংশ তেল বাজারে কম আসছে।'
তিনি আরও বলেন, বিপিসি শুধু পেট্রোল পাম্পের উপরই নয়, বিপণন কোম্পানিগুলোর উপরও ডিপোভিত্তিক দৈনিক সরবরাহসীমা বেঁধে দিয়েছে। এর ফলে ডিপোতে মজুদ থাকা সত্ত্বেও কোম্পানিগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী সরবরাহ করতে পারছে না। যেহেতু সপ্তাহের সব দিন চাহিদা সমান থাকে না, তাই দৈনিক ভিত্তিক কঠোর সীমা সরবরাহ ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তুলেছে। বিশেষত রোববার ও বৃহস্পতিবারে চাহিদা বেশি থাকে, কিন্তু ডিপোর উপর দৈনিক সীমা থাকার কারণে সেই চাহিদা মোকাবিলা করা সম্ভব হচ্ছে না।
‘বর্তমানে বহু পাম্পের জন্য বরাদ্দ এমনভাবে কমে গেছে যে, ৫ হাজার থেকে ৯ হাজার লিটার ধারণক্ষম ট্যাংক লরি পূর্ণ লোডে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে আংশিক লোডে তেল উত্তোলন করতে গেলে পরিবহন ব্যয় ডিলারের প্রাপ্য কমিশনের চেয়েও বেশি হয়ে যাচ্ছে, ফলে জ্বালানি উত্তোলন বাণিজ্যিকভাবে অলাভজনক ও অকার্যকর হয়ে পড়ছে। অর্থাৎ কাগজে বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে অনেক পাম্প তেল তুলতে পারছে না। ডিলাররা যে পরিমান তেল বরাদ্দ পাচ্ছে সেটার পরিবহণ খরচ ডিলার কমিশন থেকেও বেশি।মাঠপর্যায়ের চাহিদা, পরিবহন বাস্তবতা, সপ্তাহভিত্তিক ওঠানামা এবং পাম্পভিত্তিক প্রয়োজন সম্পর্কে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা বিপণন কোম্পানিগুলোর প্রত্যক্ষ ধারণা রয়েছে। কিন্তু তাদের পর্যাপ্ত কার্যকর স্বাধীনতা না দিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে কঠোর সীমা আরোপ করায় বাস্তব পরিস্থিতির সাথে নীতির বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে।’
আহ্বায়ক বলেন, এই নীতিগত সীমাবদ্ধতার ফলে সারাদেশে সরবরাহ ব্যবস্থায় কৃত্রিম অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। বহু পাম্প বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও কার্যকরভাবে তেল উত্তোলন করতে পারেনি। বাজারে দীর্ঘ লাইন, অসন্তোষ, বিশৃঙ্খলা এবং পাম্পকর্মীদের উপর আক্রমণ ও হেনস্থার ঘটনাও ঘটেছে। অর্থাৎ শুধু সরবরাহ সংকট সৃষ্টি করেনি, এটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটিয়েছে।
আমাদের দাবি, ডিপোভিত্তিক দৈনিক কোটা পদ্ধতি অবিলম্বে শিথিল বা প্রত্যাহার করে অন্তত সাপ্তাহিক কোটা পদ্ধতি চালু করতে হবে, যাতে চাহিদার ওঠানামা অনুযায়ী সরবরাহ সমন্বয় করা যায়।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের জয়েন্ট কনভেনার মিজানুর রহমান রতন, আবু হিরণ, সদস্য সচিব মীর আহসান উদ্দিন পারভেজ প্রমুখ।
আমার বার্তা /জেএইচ

