
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, একটি নিষিদ্ধ সংগঠন এবং সেই সংগঠনের প্রধান—যিনি বিভিন্ন অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত আসামি—তিনি কোথায় কী বলছেন, তার জবাব দেওয়ার মতো সময় বাংলাদেশ সরকারের নেই।
সোমবার (৩ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি এ কথা বলেন।
সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, আগামী ৫ আগস্ট দিল্লিতে একটি অনুষ্ঠান হতে যাচ্ছে, যেখানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী কথা বলবেন। আয়োজক ক্লাবের সভাপতি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, এতে ভারত সরকারের কোনো আপত্তি নেই। প্রকাশ্যে এমন একটি অনুষ্ঠান হওয়ায় বাংলাদেশ কি কোনো আপত্তি জানাবে?
এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, এটি নিয়ে খবরও প্রকাশিত হয়েছে। আমরা কার কাছে আপত্তি জানাব? ভারতের কাছে? একটি নিষিদ্ধ সংগঠন এবং সেই সংগঠনের প্রধান—যিনি বিভিন্ন অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত আসামি—তিনি কোথায় কী বলছেন, তার জবাব দেওয়ার মতো সময় বাংলাদেশ সরকারের নেই।
তবে আমরা যেটা লক্ষ্য করছি, ভারত সরকারও সম্প্রতি একটি বিবৃতি দিয়ে বলেছে যে, তারা আশা করে না কোনো পলাতক আসামি সেখানে বসে রাজনৈতিক বক্তব্য দেবে এবং ভারত সরকার তা সমর্থনও করে না। আর এই অনলাইন মিটিং বা অনুষ্ঠানের বিষয়ে ভারত সরকারের অবস্থান কী, সেটি তাদেরই পরিষ্কার করতে হবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পর আমাদের নতুন সরকার সবসময়ই বলেছে যে, পলাতক আসামিরা যদি সেখান থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেয় বা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়, তবে তা কাম্য নয়। আমরা চাই ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আরও উন্নত হোক। সম্প্রতি ভারতে নিযুক্ত আমাদের নতুন হাইকমিশনার এসেছেন, তার সঙ্গে আমাদের অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। আমরা ভারতের সঙ্গে একটি দূরদর্শী (ফরোয়ার্ড-লুকিং) দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগোচ্ছি। এই সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হোক—তা আমরাও চাই না, এবং আমার গভীর বিশ্বাস, ভারতও তা চায় না। সুতরাং, তারা এই অনুষ্ঠানকে সমর্থন দিচ্ছে কি না, তা ভারতকেই পরিষ্কার করতে হবে।
সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল—‘তাহলে কি ৫ আগস্ট পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক বা সরকারি মাধ্যমে আপনারা ভারতের কাছে কোনো প্রতিবাদ বা ব্যাখ্যা চাইবেন না?’ জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘অনুষ্ঠানটি তো আর ভারত সরকার আয়োজন করছে না।’
সাংবাদিকরা আবার বলেন, কিন্তু অনুষ্ঠানটি তো ভারতেই হচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘অনুষ্ঠান ভারতে হচ্ছে ঠিকই, তবে সরকার যদি প্রয়োজন মনে করে, তবে আমরা তাদের সংশ্লিষ্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করব।’
সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল—‘এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার একটি কড়া বার্তা দিয়েছিল—ভারতের মাটি ব্যবহার করে পলাতক বা সাজাপ্রাপ্ত কেউ যেন কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাতে না পারে। হাইকমিশনারকে ডেকে এনে একটি পত্রও ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই বিষয়টি কি অব্যাহত থাকবে।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরাও বহুবার তাদের বলেছি এবং লিখিতভাবেও দিয়েছি। তাদের সঙ্গে আমাদের যখনই কোনো দ্বিপাক্ষিক আলোচনা হচ্ছে, আমরা আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করছি। যেহেতু তারা বর্তমানে ভারতে আশ্রিত বা পলাতক অবস্থায় আছে, তাই বিষয়টি ভারত সরকারকেই পরিষ্কার করতে হবে। এটি বাংলাদেশ সরকারের মাথাব্যথা নয়।’
সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল—আরেকটি বিষয়, ‘এ ধরনের অনুষ্ঠানগুলো কি আমাদের দুই দেশের সম্পর্কের উন্নয়নকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে?’
জবাবে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, ‘করতে পারে, অবশ্যই করতে পারে। তবে আমরা তো সেটা চাচ্ছি না। আমি মনে করি, বাংলাদেশের মানুষও চায় না এবং সরকারও চায় না যে ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নেতিবাচক হোক। আমরা চাই সম্পর্ক আরও উন্নত হোক এবং তা উন্নতির দিকেই যাচ্ছে। আমি আশা করি, বিষয়টি মাথায় রেখেই ভারত ভবিষ্যতে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করবে।’
প্রতিমন্ত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হয়—‘ভারতের একটি সংসদীয় কমিটি সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন দিয়েছে, যেখানে বাংলাদেশে চীনের প্রভাব, সামরিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব নিয়ে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জায়গা থেকে এ বিষয়ে কী বলবেন?’
তখন প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। এখানে এখন একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত, যা জনগণের ভোটে নির্বাচিত। আমি এই মন্ত্রণালয়ে যোগ দেওয়ার প্রথম দিনই বলেছিলাম—বাংলাদেশ এখন মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়েছে। নিজেদের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে বাংলাদেশ সবার সঙ্গেই সম্পর্ক রাখবে। দেশের মানুষের স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে আমরা চাই সব দেশ এখানে বিনিয়োগ করুক। বর্তমান সরকারের যে ইশতেহার রয়েছে, তা বাস্তবায়নে আমরা বদ্ধপরিকর। এর জন্য ভারত, চীনসহ সব দেশের সঙ্গেই আমাদের যোগাযোগ, ব্যবসায়িক ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় থাকবে।’
আমার বার্তা/এমই

