মিয়ানমার গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত, ক্ষুদ্র জাতিগুষ্ঠির সশস্ত্র দলগুলোর সাথে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সংঘাত চলমান থাকা অবস্থায় ২৮ মার্চ মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। প্রথম ভূমিকম্পের ১২ মিনিট পর ৬ দশমিক ৪ মাত্রার আরেকটি ভূকম্পন হয়। ভূমিকম্পে মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়, সাগাইং, রাজধানী নেপিডোসহ কয়েকটি শহরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, কয়েক হাজার ঘরবাড়ি ও সেতু ভেঙে গেছে, সড়ক-মহাসড়কে ফাটল দেখা দিয়েছে। ভুমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মিয়ানমারের সামরিক সরকার ছয়টি অঞ্চলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এই ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত তিন হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু এবং ৪ হাজার ৫০০ আহত হয়েছে, তবে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন করে ক্ষমতা দখলের পর থেকে সেখানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। চলমান সংঘাতের কারনে মিয়ানমারে অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, গৃহযুদ্ধে ৩০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। দেশটির প্রায় দুই কোটি মানুষের বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দরকার। এ পরিস্থিতিতে ভূমিকম্পের কারনে দেশটিতে মানবিক সংকট পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়েছে।
মিয়ানমারের ভুমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো মূলত সংখ্যাগরিষ্ঠ ভামার জাতিগুষ্ঠির মানুষ বসবাস করে। প্রায় দুই বছর ধরে সীমান্ত জুড়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সাথে থ্রি ব্রাদারহুড এলায়েন্সের যোদ্ধাদের সংঘর্ষে সেনাবাহিনী পিছু হটছিল, বিদ্রোহীরা মান্দালয়ের আশেপাশের এলাকায় তাদের শক্তি বাড়িয়ে চলছিল ও তাদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত ছিল। ঠিক এই সময়ে ভূমিকম্প পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে। জান্তাবিরোধী প্রতিরোধ যোদ্ধারা এই ভয়াবহ ভূমিকম্পের কারনে দুই সপ্তাহের আংশিক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছে। ‘জাতীয় ঐক্য সরকার জানায় যে, পিপলস ডিফেন্স ফোর্স ৩০ মার্চ থেকে ভূমিকম্প-কবলিত এলাকায় পরিচালিত সামরিক অভিযানে দুই সপ্তাহের বিরতি বাস্তবায়ন করবে। তবে সে সময় তারা তাদের প্রতিরক্ষামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে। তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় নিরাপত্তা, পরিবহন এবং অস্থায়ী উদ্ধার ও চিকিৎসা শিবির স্থাপন নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ এবং এনজিওগুলোকে সহযোগিতা করবে বলে জানায়। উদ্ধার অভিযান এবং অন্যান্য ত্রাণ কাজ সহজতর করার লক্ষ্যে এ যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়।
ভূমিকম্প দুর্গত এলাকায় ত্রাণ কার্যক্রম সহজতর করার জন্য মিয়ানমার জান্তা সরকারও চলমান গৃহযুদ্ধে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছে। ২ এপ্রিল থেকে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত ২০ দিনের জন্য এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকবে। জান্তা বাহিনীর বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, চলমান প্রেক্ষাপটে বিদ্রোহীদের রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ করা বা পুনরায় সংগঠিত হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। অন্যথায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতি সমবেদনা প্রকাশের লক্ষ্যে এবং পুনর্বাসন কাজ সহজ করতে এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয়া হয়।
মিয়ানমারে শক্তিশালী ভূমিকম্পের আঘাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর দেশটির ক্ষমতাসীন সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে মানবিক সাহায্য পাঠানোর অনুরোধ করেছে। জান্তা সরকারের মুখপাত্র জাও মিন তুন জানায় যে, মিয়ানমার আশা করছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ভুমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্থ অঞ্চলে দ্রুত মানবিক সাহায্য পাঠাবে। সাধারণত এই ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর মিয়ানমার খুব কমই বৈদেশিক সাহায্যের আবেদন করে। সংকট গুরুতর হওয়ার প্রেক্ষিতে জান্তা সরকার সাগাইং, মান্দালয়, ম্যাগওয়ে, উত্তর-পূর্ব শান রাজ্য, নেপিডো ও বাগো এই ৬টি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে।
চলমান পরিস্থিতিতে মিয়ানমার এক সপ্তাহের জাতীয় শোক পালন করেছে। জাতীয় শোকের অংশ হিসেবে মিয়ানমারে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। মিয়ানমারে দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়ে ভূমিকম্পের কারনে উদ্ধার তৎপরতা ও জরুরি সহায়তার কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে। মান্দালয়ের স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে রাস্তায় ও খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছে। রাস্তাঘাটে লাশের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে এবং হাসপাতালগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় জাতিসংঘ মিয়ানমারের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ৮০ লাখ মার্কিন ডলারের তহবিল সহায়তা চেয়ে আবেদন জানিয়েছে।
প্রতিবেশী দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে বাংলাদেশ দ্রুত সাহায্যের হাত বাড়ায়। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুসের নির্দেশনায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত মানবিক সহায়তা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ৩০ মার্চ বাংলাদেশ বিমানবাহিনী একটি সি-১৩০ জে পরিবহন বিমান এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি কাসা সি-২৯৫ ডব্লিউ পরিবহন বিমানে মিয়ানমারে প্রথম দফার চিকিৎসক দল ও ১৬ টন জরুরি ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে ইয়াঙ্গুনে যায় এবং ত্রাণসামগ্রী হস্তান্তর করে। জরুরি ত্রাণ সামগ্রী হিসেবে ওষুধ, তাঁবু ও শুকনো খাবার পাঠানো হয়। ০১ এপ্রিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর তিনটি পরিবহন বিমানের মাধ্যমে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য দ্বিতীয় দফায় ১৫ টন ত্রাণ সামগ্রী পাঠানো হয়, এতে শুকনো খাবার, পানি, ওষুধ, স্বাস্থ্যসামগ্রী এবং তাবু রয়েছে। ভূমিকম্প-পরবর্তী অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য ৩৪ জন উদ্ধারকারী ও ২১ জন চিকিৎসক সহ মোট ৫৫ জন সদস্য মিয়ানমারের ভয়াবহ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোতে জুবু থিরি টাউনশিপ এবং নেপিদো এলাকার কয়েকটি ভবনে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। এই কার্যক্রমে মিয়ানমারের স্থানীয় প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিস বিভাগ সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান করছে। স্থানীয় জনগণ উদ্ধারকারী দলের জন্য খাদ্য ও পানি সরবরাহ করে মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের চিকিৎসক দলটি বালা থেইড্ডি এলাকায় নির্মাণাধীন ৫০ শয্যা বিশিষ্ট একটি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করেছে।
বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশের এই চরম সংকটময় সময়ে দ্রুত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে আবারও মানবিক মূল্যবোধকে সমুন্নত করল। রাখাইনের জনগণও বর্তমানে খাদ্য, ঔষধ ও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের অভাবে রয়েছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী আরাকান আর্মিকে কোণঠাসা করতে মূল ভূখণ্ড থেকে সরবরাহ বন্ধ করে রেখেছে। এই সংকট মোকাবেলায়ও বাংলাদেশ থেকে রাখাইনে সাহায্য নিয়ে একটি চালান গিয়েছে। ৪ এপ্রিল ব্যাংককে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ শীর্ষ সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য একটি মানবিক চ্যানেল স্থাপনের জন্য বিমসটেক অঞ্চলের নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। রাখাইন রাজ্যের সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর পরিপ্রেক্ষিতে রাখাইন রাজ্যে আসন্ন দুর্ভিক্ষের বিষয়ে ইউএনডিপি’র সতর্কবার্তার মধ্যে, রাখাইন থেকে আরো বাস্তুচ্যুতি বন্ধ করার জন্য জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে রাখাইনে একটি মানবিক চ্যানেল স্থাপন করা যেতে পারে। মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে স্থায়ীভাবে প্রত্যাবর্তনের জন্য একটি উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে রাখাইনে স্থিতিশীলতা আনতে মিয়ানমারকে আরো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে জানান প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনুস।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনায় বাংলাদেশ মিয়ানমার সম্পর্ক এবং রোহিঙ্গা সংকট সমাধান প্রক্রিয়া গতি পেয়েছে। বাংলাদেশে আশ্রিত ৮ লাখ রোহিঙ্গার তালিকা থেকে প্রথম ধাপে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে রাজি হয়েছে মিয়ানমার। ৬ষ্ঠ বিমস্টেক শীর্ষ সম্মেলনের সময় এক বৈঠকে মিয়ানমারের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউ থান শোয়ে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার উচ্চ প্রতিনিধি ড. খলিলুর রহমানকে এ বিষয়ে অবহিত করে। ২০১৮ সাল থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ছয় ধাপে মিয়ানমারকে এই তালিকা দিয়েছিল। এদের মধ্যে আরও ৭০ হাজার রোহিঙ্গার চূড়ান্ত যাচাই বাছাই এখনো চলমান রয়েছে। এটিই রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘস্থায়ী সমাধানে প্রথম বড় একটি পদক্ষেপ। শুধু এই আড়াই লাখ নয়, বাকী সাড়ে ৫ লাখ রোহিঙ্গার তালিকাও দ্রুততার সঙ্গে যাচাই-বাছাই করা হবে বলে জানা গেছে। বেশ দেরিতে হলেও রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে যা আশাব্যঞ্জক।
চলমান এই সংকট বাংলাদেশের জন্য প্রতিবেশী দেশ ও জনগণের কাছে আসার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি বাংলাদেশকে মিয়ানমারের সাথে রাজনৈতিক, সামরিক, বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং জনগণের সাথেও যোগাযোগ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ মিয়ানমার এই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যেকার সমস্যা দ্রুত সমাধানের মাধ্যমে সম্পর্কের উত্তরোত্তর উন্নয়ন হোক এটাই প্রত্যাশা।
লেখক: মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক।
আমার বার্তা/ব্রি. জে. (অব.) হাসান মো. শামসুদ্দীন/এমই