ই-পেপার বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩

৩৬ জুলাই : জাতির মুক্তির দিন

শামসুল আলম:
০৫ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩৬

ক্যালেন্ডারেরও সীমাবদ্ধতা আছে। সে মাস গুনতে জানে, দিন গুনতে জানে, কিন্তু মানুষের জেগে ওঠার হিসাব রাখতে পারে না। তার পাতায় জুলাই একত্রিশ দিনেই শেষ হয়। তারপর আগস্ট আসে, সেপ্টেম্বর আসে, বছর ফুরোয়। কিন্তু ইতিহাস মাঝে মাঝে ক্যালেন্ডারের নিয়ম মানে না। মানুষের বুকের ভেতর তখন আর-একটি সময় জন্ম নেয়—যার তারিখ ছাপাখানায় মুদ্রিত হয় না, কিন্তু জাতির স্মৃতিতে অমোচনীয় হয়ে থাকে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ৩৬ জুলাই তেমনই একটি দিন। এটি কোনো মাসের অতিরিক্ত দিন নয়; এটি এক জাতির অদম্য সংকল্পের প্রতীক।

ইতিহাসের এই নতুন তারিখ একদিনে জন্ম নেয়নি। এর পেছনে ছিল দীর্ঘ সতেরো-আঠারো বছরের লড়াই, নির্যাতন, ক্লান্তি, ক্ষোভ, অপমান, বঞ্চনা এবং নীরব প্রতিরোধ। যে সময়ে নির্বাচন ছিল, কিন্তু মানুষের বিশ্বাস ক্ষয়ে গিয়েছিল; আদালত ছিল, কিন্তু বিচার নিয়ে প্রশ্ন উঠত; সংবাদমাধ্যম ছিল, কিন্তু বহু কলম নিজের ছায়াকেও ভয় পেত। কত মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, কত পরিবার মামলা ও হয়রানির ভারে নুয়ে পড়েছে, কত তরুণ নিজের দেশেই ভবিষ্যৎ খুঁজে পায়নি, কতজন নির্বাসনের জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে—এসবের পূর্ণ হিসাব কোনো সরকারি নথিতে নেই। রাষ্ট্রের দলিলের বাইরে আরেকটি দলিল থাকে; তার নাম মানুষের স্মৃতি।

তবু মানুষের আশ্চর্য গুণ হলো, সে দীর্ঘতম অন্ধকারেও ভোরের গন্ধ পায়। জুলাইয়ের শুরুতে কেউ হয়তো কল্পনাও করেনি, একটি প্রজন্ম অল্প কিছু দিনের মধ্যে শুধু একটি সরকারের বিরুদ্ধে নয়, ভয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাবে। রাজপথে তখন কেবল দাবির মিছিল ছিল না; ছিল আত্মমর্যাদার প্রত্যাবর্তন। মানুষ বুঝতে শুরু করেছিল—স্বাধীনতার অর্থ শুধু একটি পতাকা নয়, স্বাধীনতার অর্থ কথা বলার অধিকার, প্রশ্ন করার অধিকার, ভোট দেওয়ার অধিকার এবং মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার অধিকার।

সেই দিনগুলোতে ইতিহাস যেন বারবার ফিরে আসছিল। মনে পড়ত ফরাসি বিপ্লবের কথা। বাস্তিল দুর্গের কথা। একসময় যে দুর্গকে অজেয় মনে করা হতো, শেষ পর্যন্ত সেটিই জনগণের ক্রোধের সামনে টিকে থাকতে পারেনি। ইতিহাসের এই শিক্ষা থেকেই একদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলাম—“গণভবন ঘেরাও করুন, বাস্তিল দুর্গের মতো।” অনেকে বিস্মিত হয়েছিলেন, কেউ উদ্বিগ্নও হয়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের একটি নিয়ম আছে—যে ক্ষমতা জনগণকে ভয় দেখিয়ে টিকে থাকে, একসময় সেই ক্ষমতাই জনগণকে ভয় পেতে শুরু করে। তখন পতন শুধু সময়ের অপেক্ষা।

১৮ জুলাই আরেকটি কথা লিখেছিলাম—“বাস্তিল পতনের আলামত দেখা যাচ্ছে। বিজয় আসছে।” আজ ফিরে তাকিয়ে মনে হয়, সেটি ভবিষ্যদ্বাণী ছিল না; ছিল ইতিহাসের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ওপর বিশ্বাস। কারণ পৃথিবীর সব গণআন্দোলনের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে—শুরুতে তাদের অসম্ভব বলে মনে হয়, মাঝপথে তাদের বিপজ্জনক বলা হয়, আর শেষে সবাই বলে, “এ তো অবশ্যম্ভাবী ছিল।”

পরদিন আবার লিখলাম—“চেঞ্জ কিন্তু হয়ে যাবে। কেবল লড়ে যান। শেষমেশ আপনারাই বিজয়ী।” সে কথাগুলো লিখেছিলাম মূলত তরুণদের উদ্দেশে। কিন্তু পরে বুঝেছি, আসলে আমরাই তাদের কাছ থেকে সাহস ধার নিয়েছিলাম। তারা তখন সতেরো-আঠারো কিংবা কুড়ি বছরের তরুণ। অথচ রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর সামনে তারা যে দৃঢ়তা দেখিয়েছে, তা কোনো পাঠ্যবই শেখাতে পারে না। তাদের চোখে ভয় ছিল, কিন্তু ভয়ের চেয়েও বড় ছিল বিশ্বাস।

এই আন্দোলনের সবচেয়ে সুন্দর দিক ছিল প্রজন্মের দূরত্বের ভেঙে পড়া। বয়সে আমরা অনেকেই তাদের বাবা, চাচা, কিংবা বড় ভাই হওয়ার মতো। কিন্তু রাজপথে সেই পরিচয়গুলো অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। সেখানে সবাই ছিল সহযোদ্ধা। তারা নতুন ভাষা শিখিয়েছে, আমরা পুরোনো ইতিহাসের গল্প বলেছি। কখনো তারা প্রশ্ন করেছে, কখনো দ্বিমত করেছে, কখনো তর্কে জিতেছে, কখনো আমাদের থামিয়েছে। আবার প্রয়োজন হলে একই স্লোগানে, একই কাতারে দাঁড়িয়েছে। তখন বুঝেছি, সংগ্রাম মানুষের বয়স কমিয়ে দেয়। জন্মসনদের অঙ্ক এক জিনিস, ইতিহাসের অঙ্ক আরেক।

রাতগুলো ছিল সবচেয়ে কঠিন। দিনের বেলায় রাজপথ, সন্ধ্যায় উদ্বেগ, আর গভীর রাতে গ্রেপ্তার, গুম কিংবা অভিযানের আশঙ্কা। প্রতিটি ফোনকল অজানা দুঃসংবাদের ভয় নিয়ে আসত। তবু ভোর হলে আবার মানুষ বেরিয়ে আসত। যেন অদৃশ্য কোনো শক্তি তাদের ঘর থেকে রাস্তায় ডেকে আনছে। কেউ শহীদের ছবি বুকে নিয়ে, কেউ ব্যান্ডেজ বাঁধা হাতে, কেউ শুধু একটি পতাকা হাতে। তখন মনে হতো, আন্দোলনের আসল শক্তি স্লোগানে নয়; মানুষের নৈতিক বিশ্বাসে।

এমনই এক সন্ধ্যায়, “গণভবন ঘেরাও” কথাটি আবার আলোচনায় এল। কয়েকজন তরুণ উৎকণ্ঠিত হয়ে বলল, “ভাই, এখনই বলবেন না। আগে আমরা মানুষকে নামতে দিই।” আমি তাদের কথা শুনলাম। মনে হলো, ইতিহাস কেবল সাহসীদের দিয়েই তৈরি হয় না; ধৈর্যশীলদের দিয়েও হয়। সেদিন আরও একবার শিখলাম—একটি সফল গণআন্দোলনের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো পারস্পরিক আস্থা। কেউ একা বিজয়ী হয় না; বিজয় সবসময় সম্মিলিত হয়।

জুলাই তখন আর কেবল একটি মাস নয়। সে ধীরে ধীরে একটি চেতনায় রূপ নিচ্ছে। মানুষের কথাবার্তায়, স্লোগানে, চোখের ভাষায়, এমনকি নীরবতাতেও একটি বিশ্বাস স্পষ্ট হয়ে উঠছে—এই পথের শেষ বিজয় ছাড়া অন্য কোথাও নয়।

সেই বিজয়ের নাম তখনও কেউ জানত না। কিন্তু ইতিহাস নীরবে তার নতুন ক্যালেন্ডারের প্রথম পাতা লিখতে শুরু করেছে, তখনও কেউ জানত না—সেই ক্যালেন্ডারের শেষ তারিখটি কত হবে। কেবল এটুকু বোঝা যাচ্ছিল, জুলাই আর সাধারণ কোনো মাস নেই। তার দিনগুলো ঘড়ির কাঁটায় নয়, শহীদের রক্তে গণনা হচ্ছে।

রাজপথ তখন প্রতিদিন নতুন করে মানুষকে পরীক্ষা নিচ্ছে। সকালের কর্মসূচি সন্ধ্যার মধ্যে বদলে যাচ্ছে। যে ছেলেটিকে দুপুরে স্লোগান দিতে দেখা গেছে, সন্ধ্যায় খবর এসেছে সে হাসপাতালে। যে মেয়েটি বন্ধুদের নিয়ে ব্যারিকেড তুলেছিল, রাতের মধ্যে তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তবু আশ্চর্য, ভয়ের এই অবিরাম চাষাবাদের মধ্যেও মানুষের সাহস ফুরিয়ে যাচ্ছিল না। বরং প্রতিটি আঘাত যেন আরও বহু মানুষকে ঘর থেকে বের করে আনছিল।

আমি তখন বারবার একটি কথাই ভাবছিলাম—প্রতিটি সফল গণআন্দোলনের দুটি শক্তি থাকে। একটি রাজপথ, অন্যটি বয়ান। রাজপথ মানুষকে একত্র করে; বয়ান মানুষকে টিকিয়ে রাখে। শাসকের হাতে থাকে অস্ত্র, প্রশাসন, প্রচারযন্ত্র; কিন্তু জনগণের হাতে থাকে কেবল বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসকে জীবিত রাখার জন্য এমন একটি ভাষা দরকার ছিল, যা ক্লান্ত মানুষকেও আবার দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।

এই ভাবনা থেকেই ২ আগস্ট লিখেছিলাম—“জুলাই মাস টেনে দেওয়া হলো বিজয় অবধি। আজ ৩২, কাল ৩৩… এভাবে বিজয়ে গিয়ে শেষ হবে মুক্তির ক্যালেন্ডার।” কথাটি লেখার সময় মনে হয়নি, একটি নতুন তারিখের জন্ম দিচ্ছি। মনে হয়েছিল, কেবল একটি মনোবল জাগিয়ে রাখার চেষ্টা করছি। কিন্তু মানুষ কখন কোন শব্দকে নিজের করে নেয়, তা লেখকও আগে থেকে জানেন না।

অদ্ভুত দ্রুততায় সেই ভাষা ছড়িয়ে পড়ল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, রাজপথে, দেয়ালের লেখায়—সবখানে মানুষ বলতে শুরু করল, “আজ ৩২ জুলাই”, “আজ ৩৩ জুলাই”। কেউ মজা করে বলেনি। সবাই যেন এক নীরব চুক্তিতে পৌঁছেছিল—বিজয় না হওয়া পর্যন্ত আগস্ট আসবে না। ক্যালেন্ডারের পাতায় আগস্ট থাকতে পারে, কিন্তু সংগ্রামের ক্যালেন্ডারে এখনও জুলাই। আমি আজও মনে করি, এ ছিল আন্দোলনের এক অনন্য মনস্তাত্ত্বিক বিজয়। শাসক সময়কে দীর্ঘ করতে চেয়েছিল; জনগণ সময়কেই নিজের পক্ষে নিয়ে নিল।

এরই মধ্যে আন্দোলনের ভাষাও বদলে গেল। বহু দাবির ভিড় সরিয়ে সামনে এল একটি মাত্র দাবি। আন্দোলনের দীর্ঘ পথচলায় এমন একটি মুহূর্ত আসে, যখন ইতিহাস নিজেই অপ্রয়োজনীয় বাক্য ঝরিয়ে দেয়। তখন আর অনুচ্ছেদ লাগে না; একটি বাক্যই যথেষ্ট। সেই সময় লিখেছিলাম—“এক দফা দাও। রাজপথ ছেড়ো না। ঘেরাও করো।” কথাগুলো ছিল কোনো ব্যক্তিগত সাহস দেখানোর জন্য নয়; বরং বিচ্ছিন্ন জনস্রোতকে একটি স্রোতধারায় মিলিয়ে দেওয়ার আহ্বান। রাতে সমন্বয়কদের সাথে একাধিক আলোচনায় রাজী করালাম, হাসিনা পতনের এক দফা ঘোষণা করা হবে বিকালে।

গণভবনের প্রসঙ্গ উঠলেই বাস্তিলের কথা আবার মনে পড়ত। বাস্তিল কেবল একটি দুর্গ ছিল না; ছিল মানুষের মনে গেঁথে দেওয়া ভয়ের প্রতীক। গণভবনও আমার কাছে ঠিক তেমনই একটি প্রতীক হয়ে উঠেছিল। আমি বারবার বলতাম, “প্রাসাদ দখলই উদ্দেশ্য নয়; ভয়কে দখলমুক্ত করাই উদ্দেশ্য।” কারণ কোনো গণআন্দোলনের সবচেয়ে বড় বিজয় ভবন দখলে নয়, মানুষের মন থেকে ভয় সরিয়ে দেওয়ায়।

এই সময়ে ছাত্রদের সঙ্গে আমাদের অসংখ্য আলোচনার কথা আজও মনে পড়ে। আমি হয়তো একটু তাড়াতাড়ি এগোতে চাইতাম, তারা বলত, “আরও একটু অপেক্ষা করি।” কখনো আমি ইতিহাসের উদাহরণ টেনে বলতাম, সুযোগ এলে দ্বিধা করা চলে না। তারা আবার বাস্তব পরিস্থিতির কথা মনে করিয়ে দিত। আজ ভাবি, এই কথোপকথনগুলোই ছিল আন্দোলনের প্রকৃত শক্তি। সেখানে কোনো অহংকার ছিল না; ছিল শেখা এবং শেখানোর এক বিরল সংস্কৃতি।

রাজপথের পাশাপাশি আরেকটি নীরব যুদ্ধ চলছিল রাষ্ট্রের ভেতরেও। আমি তখন প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য এবং প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের উদ্দেশে লিখেছিলাম—“চাকরি ছাড়তে বলছি না; জনগণের পাশে দাঁড়ান। আপনারা সরকারের নয়, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। দেশের মালিক জনগণ।” এ ছিল কারও বিরুদ্ধে আহ্বান নয়; রাষ্ট্রের মৌলিক দর্শনের কথাই স্মরণ করিয়ে দেওয়া। কারণ সরকার পরিবর্তিত হয়, কিন্তু প্রজাতন্ত্র থেকে যায়।

৩১ জুলাই লিখেছিলাম—“খুনির কাছে বিচার চাওয়া নয়। জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে পদত্যাগ করুন। নইলে গণঅভ্যুত্থানে বিদায়।” পরদিন আবার লিখলাম—“মিছিলটা কিন্তু বিজয়ের হবে।” আজ ফিরে তাকিয়ে মনে হয়, কথাগুলো আসলে আমার একার ছিল না। সেগুলো ছিল তখনকার রাজপথের স্পন্দন। আমি কেবল সেই স্পন্দনের ভাষা ধার নিয়েছিলাম।

এদিকে শহর আরও অস্থির হয়ে উঠছিল। কারফিউ, গুলির শব্দ, ধোঁয়ায় ঢেকে যাওয়া আকাশ, রক্তমাখা রাজপথ—সব মিলিয়ে ঢাকা যেন এক অদ্ভুত নগরী। কিন্তু সেই নগরীতেই দেখেছি, একজন শহীদ হলে দশজন তার জায়গা নিচ্ছে। একজন আহত হলে শতজন পতাকা তুলে ধরছে। রাষ্ট্রের হাতে ছিল আধুনিক অস্ত্র; জনগণের হাতে ছিল এক টুকরো পতাকা আর একরাশ বিশ্বাস। ইতিহাসের বিচারে বহুবার দেখা গেছে—অস্ত্র যুদ্ধ জিততে পারে, কিন্তু মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে পরাজিত করতে পারে না।

ক্রমে মনে হতে লাগল, জুলাই যেন নিজেই নিজের সমাপ্তি লিখতে অস্বীকার করছে। একত্রিশ পেরিয়ে গেছে, তবু মানুষের মুখে আগস্ট শব্দটি নেই। কোথাও লেখা হচ্ছে ৩৪ জুলাই, কোথাও ৩৫ জুলাই। তখন আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্ম নিল—এই ক্যালেন্ডারের শেষ পাতা কোনো ছাপাখানা ছাপবে না; সেটি লিখবে বিজয় নিজেই।

আর ইতিহাস, ধীর পায়ে, সেই শেষ সংখ্যাটির দিকে এগিয়ে চলল—৩৬ জুলাই।

ইতিহাসের কিছু সকাল সূর্য ওঠার আগেই আলো ছড়ায়। ৫ আগস্ট ছিল তেমনই একটি সকাল। শহর তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি, অথচ মানুষের চোখে ঘুম ছিল না। রাস্তায় বেরিয়ে আসা প্রতিটি মানুষ যেন অনুভব করছিল—আজকের দিনটি আর অন্য দিনের মতো নয়। এত দীর্ঘ পথ হেঁটে এসে ইতিহাস যেন একেবারে দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েছে। রাতেই আবেদন রেখেছিলাম ,”ফজর পড়েই আল্লাহর নাম নিয়ে চলে আসুন রাজপথে- বাংলাদেশ রক্ষায়- আগামী প্রজন্মের জন্য একটি ন্যায়ভিত্তিক গণতান্ত্রিক দেশ প্রতিষ্ঠায়। আপনার অংশগ্রহনই নিশ্চিত করতে পারে বিজয়। আল্লাহ সহায় হউন।” ফজরের সময় বন্ধু শীষকে ছাদে ওঠালাম, শহরের পরিস্থিতি, পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর দিক থেকে গাড়ি, মিছিল আসছে কি না জানতে। মোটামুটি নয়টার দিকে সায়েদাবাদ মহাখালী পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল। চানখাঁরপুলে গুলি হলো, ভয় আতঙ্কে শেষে স্রষ্টার কাছেই নিবেদন, “আল্লাহ তুমি সহায় হও—কাজটা সহজ করে দাও।”

দুপুরের দিকে সময়ের গতি অদ্ভুত হয়ে গেল। মিনিটগুলো যেন আর মিনিট রইল না; প্রতিটি সেকেন্ড ইতিহাসের ওজন বহন করতে লাগল। খবর আসছে, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। গুজব আর সত্য একে অপরকে ধাওয়া করছে। এমন উত্তাল মুহূর্তে কেবল একটি সূত্রের ওপর ভর করে আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলাম—দুপুর ১টা ৫৯ মিনিটে, আর মাত্র দুটি শব্দ—“চলে গেছে।” তখনও অনেকের কাছে সেটি ছিল অবিশ্বাস্য। কিন্তু ইতিহাসের কিছু সংবাদ খুব দীর্ঘ বাক্যে লেখা হয় না। কখনও কখনও মাত্র দুটি শব্দই একটি যুগের অবসান ঘোষণা করে। এএফপিতে কপি করলো, পরে তারা পুরস্কার পেয়েছে এই সংবাদের জন‍্য। বিদ‍্যুতের চেয়েও দ্রুত গতিতে দেশ থেকে দেশান্তরে ছড়িয়ে গেলো খবর - “হাসিনা পালিয়ে গেছে”!

তখন মনে হলো দেশ তো চালাতে হবে, নেতৃত্ববিহীন রাখা যাবে না, কোনো পরামর্শ ও তথ‍্যসূত্র ছাড়াই নিজ দায়িত্বে লিখে ফেললাম, “ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অস্থায়ী সরকার আসছে।” আলহামদুলিল্লাহ, পরে তাই হয়েছিল!

সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়নি, কোনো মানুষ জয়ী হয়েছে। মনে হয়েছিল, জয়ী হয়েছে মানুষের অধিকার। ফিরে আসার পথ খুলে গেছে বাকস্বাধীনতার, ভোটাধিকারের, আইনের শাসনের, গণতন্ত্রের। দীর্ঘ অন্ধকারের পর একটি জাতি আবার মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। যে স্বপ্ন নিয়ে রাজপথে নেমেছিল অগণিত তরুণ, যে স্বপ্ন বুকের ভেতর লালন করেছিলেন অসংখ্য মা-বাবা, শিক্ষক, শ্রমিক, কৃষক, পেশাজীবী—সেদিন সেই স্বপ্ন প্রথমবারের মতো বাস্তবের আলো দেখেছিল।

কিন্তু বিজয়ের আনন্দের মধ্যেও কিছু মুখ বারবার সামনে এসে দাঁড়ায়। যে ছেলেটি আর বাড়ি ফিরল না। যে মেয়েটি হাসপাতালের বিছানায় একটি হাত হারিয়েও বলেছিল, “দেশটা যেন ভালো থাকে।” যে বাবা সন্তানের লাশ কাঁধে নিয়ে নির্বাক দাঁড়িয়ে ছিলেন। যে মা আজও দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন। যাঁরা শহীদ হয়েছেন, তাঁরা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার চিরন্তন আলোকবর্তিকা। আমরা মহান আল্লাহর কাছে তাঁদের সকলের জন্য জান্নাতুল ফিরদাউস প্রার্থনা করি। তাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীন নাগরিক-পরিসর যেন কখনো অপব্যবহৃত না হয়—এই হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা।

শ্রদ্ধা জানাই সেই অসংখ্য নামহীন মানুষকেও, যাঁদের কথা সংবাদপত্রের শিরোনামে খুব কম এসেছে। যারা গুলিবিদ্ধ হয়ে আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। যারা দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। যারা ব্যবসা হারিয়েছেন, ঘর হারিয়েছেন, জীবিকার পথ হারিয়েছেন। যারা বছরের পর বছর চাকরি পাননি, পদোন্নতি হারিয়েছেন, মিথ্যা মামলা কাঁধে নিয়ে জীবন কাটিয়েছেন। যারা দেশ ছেড়ে প্রবাসে অনিশ্চয়তার জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। যারা কারাগারে, যারা গুমের অন্ধকারে, যারা ভয়ে মুখ বন্ধ রেখেও অন্তরে স্বাধীনতার আগুন বাঁচিয়ে রেখেছিলেন—এই বিজয় তাঁদেরও।

এই দীর্ঘ পথচলায় আমার নিজেরও একটি ব্যক্তিগত উপলব্ধি আছে। জুলাই আমাকে আমার হারিয়ে যাওয়া যৌবন ফিরিয়ে দিয়েছে। জন্মসনদে বয়স বাড়ে, কিন্তু আদর্শের সংগ্রামে মানুষের বয়স কমে যায়। সতেরো-আঠারো-উনিশ বছরের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে দিন-রাত কাটাতে কাটাতে বুঝেছি, তারুণ্য আসলে একটি মানসিক অবস্থা। তারা আমাকে নতুন সময়ের ভাষা শিখিয়েছে; আমি তাদের পুরোনো সংগ্রামের গল্প বলেছি। কখনো তারা আমাকে থামিয়েছে, কখনো আমি তাদের তাগিদ দিয়েছি। আমরা কেউ কারও অনুসারী ছিলাম না; আমরা ছিলাম একই স্বপ্নের সহযাত্রী।

আজ, বিজয়ের দুই বছর পরে, আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এখন কী? ইতিহাসের কঠিন সত্য হলো, স্বৈরাচার উৎখাত করা যত কঠিন, তার চেয়েও কঠিন একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণ করা। ক্ষমতায় যারা আছেন, তাঁদের মনে রাখতে হবে—জনগণ ক্ষমতা অর্পণ করে, মালিকানা নয়। বিরোধী দলগুলোকেও মনে রাখতে হবে—গণতন্ত্রের শক্তি প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করা নয়; মতভেদকে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে ধারণ করা। প্রতিষ্ঠানকে দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন, প্রশাসন, গণমাধ্যম—সবকিছুর ভিত্তি হতে হবে স্বাধীনতা, জবাবদিহি ও আইনের শাসন।

আমাদের এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে হবে, যেখানে আর কোনো শাসক কখনো কল্পনাও করতে না পারে যে জনগণের ভোট, অধিকার, কণ্ঠস্বর বা মর্যাদা কেড়ে নিয়ে বছরের পর বছর ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব। এমন রাষ্ট্র গড়তে হবে, যেখানে সরকারের পরিবর্তন হবে নির্বাচনের মাধ্যমে, রক্তপাতের মাধ্যমে নয়; যেখানে বিরোধিতা রাষ্ট্রদ্রোহ নয়, গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত; যেখানে তরুণেরা দেশ ছেড়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখবে না, বরং দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখবে।

একদিন হয়তো কোনো শিশু তার দাদাকে জিজ্ঞেস করবে, “দাদু, ক্যালেন্ডারে তো ৩৬ জুলাই বলে কোনো দিন নেই। তবে তোমরা কেন সে দিনের কথা বলো?” দাদা হয়তো মৃদু হেসে বলবেন, “বাবা, ক্যালেন্ডার মানুষ বানায়; কিন্তু ইতিহাস বানায় মানুষের সাহস। ৩৬ জুলাই সেই সাহসেরই আরেকটি নাম।”

আজ তাই ৩৬ জুলাই কেবল একটি স্মরণদিবস নয়; এটি আমাদের বিবেকের আয়না। আমরা যেন শহীদদের রক্তকে স্মৃতিসৌধে বন্দি না করি, আহতদের ত্যাগকে সহানুভূতির বাক্যে সীমাবদ্ধ না রাখি, গণতন্ত্রকে কেবল স্লোগানে পরিণত না করি। তাদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হবে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে স্বাধীনতা আর কখনো কারও দয়ার দান হবে না—এটি হবে প্রতিটি নাগরিকের জন্মগত অধিকার।

মোহিনী চৌধুরীর সেই অমর পংক্তিগুলো আজ নতুন অর্থে ফিরে আসে—

যাঁরা জীর্ণ জাতির বুকে জাগালো আশা,

মৌন মলিন মুখে জোগালো ভাষা;

আজি রক্তকমলে গাঁথা মাল্যখানি

বিজয়লক্ষ্মী দেবে তাঁদেরই গলে।

যাঁরা স্বর্গগত, তাঁরা এখনও জানে—

স্বর্গের চেয়ে প্রিয় জন্মভূমি।

এসো স্বদেশব্রতের মহাদীক্ষা লভি,

সেই মৃত্যুঞ্জয়ীদের চরণ চুমি।

আমরা মাথা নত করি তাঁদের সামনে। আর নীরবে প্রতিজ্ঞা করি—যে জুলাই বিজয় না হওয়া পর্যন্ত শেষ হয়নি, সেই জুলাইয়ের চেতনাও যেন কখনো শেষ না হয়।

লেখক : বিশ্লেষক ও লেখক, সিনিয়র সচিব।

আমার বার্তা/ শামসুল আলম/এমই

মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকারঃ রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই

২০২১ সালে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী ক্ষমতা গ্রহণের  পর দেশটিতে গৃহযুদ্ধ  ছড়িয়ে

অনাবাসযোগ্য ঢাকার আর্তনাদ: দায় কার, মুক্তির পথ কোথায়?

"যে শহর যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়নি, সেই শহরই যদি মানুষের বসবাসের জন্য বিশ্বের অন্যতম কঠিন

নারীর ক্ষমতায়নে ফ্যামিলি কার্ড

গৌরনদী উপজেলার ছোট্ট একটি গ্রামের নাম বাটাজোর। নদীর কাছাকাছি মাটির ঘরে থাকত পারুল আখতার। তার

বন্যা মোকাবেলায় খাল খনন কর্মসূচি যুগান্তকারী পদক্ষেপ, বাস্তবচিত্র ফুটে উঠেছে

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এই দেশের সভ্যতা, কৃষি, অর্থনীতি এবং জনজীবন গড়ে উঠেছে নদী, খাল ও
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ডিএমপির ২৪ ঘণ্টার অভিযানে ৪১৮ জন গ্রেপ্তার, উদ্ধার বিদেশি পিস্তল-গুলি

গভীর সমুদ্রে ইঞ্জিন বিকল, ১৮ জেলেসহ ফিশিং বোট উদ্ধার করলো কোস্ট গার্ড

উত্তেজনার মধ্যে ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূতের ভিসা বাতিল করল যুক্তরাষ্ট্র

লিভারপুল অধ্যায় শেষে এবার তুরস্কের ক্লাবে যাচ্ছেন সালাহ

সুনামগঞ্জে হঠাৎ গ্যাস সংকট, রান্না বন্ধ, সিএনজি পাম্পে হাহাকার

পথ হারালে এই জাদুঘরে এসে পথ খুঁজে নেবো: ড. ইউনূস

শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস, স্কুল বন্ধ ঘোষণা

ইরান যুদ্ধ যত দীর্ঘ তত লাভ তেল কোম্পানিগুলোর, কে কত আয় করল?

ছুটির আনন্দে ঘরমুখী মানুষের ঢল, গাজীপুরে মহাসড়কে তীব্র চাপ

মানব পাচারকারীদের মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপের নির্দেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

ন্যায়বিচার-গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী জুলাই: ড. ইউনূস

ভারী বৃষ্টি-উজানের ঢলে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপরে

৩৬ জুলাই : জাতির মুক্তির দিন

জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

৫ আগস্ট ঘটে যাওয়া নানান ঘটনা

শেখ হাসিনার বক্তব্য দেওয়ার প্রসঙ্গে অবস্থান স্পষ্ট করল ভারত

সাব্বিরকে নিয়েই মালয়েশিয়ার বিপক্ষে দল ঘোষণা বাংলাদেশের

মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকারঃ রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই

টেকনাফের ৫ কোটি টাকা মূল্যের ১ কেজি ক্রিস্টাল মেথ জব্দ

বাগেরহাটের মোংলায় উপকূলীয় এলাকায় পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট স্থাপন