
# 'ব্যাক ডেটে' পাওয়ার নিতে বিশ্বস্ত সহযোগীর টিম শহিদুলের গোপন আস্তানায়
# টাকা পাচারের সুবিধার্থে আপাতত এশিয়াতেই অবস্থানের সিদ্ধান্ত
হাজার কোটি টাকার অবৈধ স্থাবর সম্পদ বিদেশে বসেই বিক্রি করে অর্থ পাচারের এক অভিনব ও বিপজ্জনক কৌশল হাতে নিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক সদস্য শহিদুল ইসলাম। ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিভিন্ন বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ শুল্ক সুবিধা দিয়ে অর্জিত এই বিশাল কালো টাকার সাম্রাজ্য বাঁচাতে গত ২৫ মে থাই এয়ারওয়েজের ফ্লাইট টিজি ৩২২ বিমানে করে দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে সপরিবারে ব্যাংককে পাড়ি জমান এই চতুর কর্মকর্তা। নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা সূত্র নিশ্চিত করেছে, বর্তমানে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে একটি বিলাসবহুল হোটেলে অবস্থান করে দেশে থাকা নিজস্ব সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করছেন তিনি। আদালতের মাধ্যমে সম্পদ ক্রোক বা বাজেয়াপ্ত হওয়ার আইনি জটিলতা এড়াতে এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আনুষ্ঠানিক কঠোর পদক্ষেপের আগেই এই বিপুল সম্পত্তি দ্রুত নগদায়ন করাই এখন তার প্রধান লক্ষ্য।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শহিদুল ইসলামের অনিয়ম ও দুর্নীতির দীর্ঘদিনের অংশীদার এবং এই বিপুল সম্পদ দেখভালকারী একটি বিশেষ বিশ্বস্ত গ্রুপ সম্প্রতি ঢাকা ত্যাগ করে শহিদুলের গোপন আস্তানার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। এই সহযোগীরা দেশ থেকেই বিশেষ আইনি নথিপত্র তৈরি করে নিয়ে গেছে, যার মূল লক্ষ্য হলো পুরাতন বা পেছনের (ব্যাকডেটেড) কোনো তারিখ দেখিয়ে শহিদুলের কাছ থেকে সমস্ত সম্পত্তির 'পাওয়ার অব অ্যাটর্নি' বা আম-মোক্তারনামা নিজেদের নামে লিখিয়ে নেওয়া। এই জালিয়াতি সিন্ডিকেটের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন শহিদুল ইসলামের দুই ভাই সেলিম ও জাকির, এবং তার চার শ্যালক—কাজী মুক্তাদীর ইবনু মিনান, কাজী মুতামিদ ইবনে মিনান, কাজী মুত্তাকী ইবনে মিনান ও কাজী মুস্তাকীম ইবনে মিনান। এই বিশ্বস্ত সহযোগীরাই এখন দেশের বড় বড় রিয়াল এস্টেট ব্যবসায়ী ও ডেভেলেপার কোম্পানিগুলোর সাথে গোপনে দরদাম চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্থাবর সম্পত্তি যেমন ফ্ল্যাট, প্লট ও বাড়ি একসাথে উপযুক্ত ক্রেতা খুঁজে বিক্রি করতে বেশ দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। তাই শহিদুল ইসলাম আপাতত অস্ট্রেলিয়া বা কানাডায় যাওয়ার পূর্বপরিকল্পনা স্থগিত করেছেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে আপাতত এশিয়ারই কোনো একটি নিরাপদ দেশে অবস্থান করবেন, যাতে তার সম্পদ বিক্রির সহযোগী সিন্ডিকেট ও সম্ভাব্য বড় ক্রেতাদের সাথে সরাসরি বা গোপনে সাক্ষাৎ করা সহজ হয়। এছাড়া এশিয়ার মধ্যে অবস্থান করলে সম্পদ বিক্রির শত শত কোটি টাকা অতি সহজে ও নিরাপদে পরিচিত আন্তর্জাতিক হুন্ডির চ্যানেলে পাচার করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে এই চক্র। ব্যাংককের পর তার পরবর্তী অবস্থান হতে পারে কম্বোডিয়া, লাওস কিংবা মলদোভার মতো কোনো দেশ।
অনুসন্ধানকারীরা শহিদুলের অবৈধ সম্পদের খোঁজে নেমে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য পাচ্ছেন। নতুন ও পুরাতন অনুসন্ধানে মিলিয়ে রাজউকের পূর্বাচলের আমেরিকান সিটির আনুমানিক ১০৪ কাঠার মূল্যবান জমি বিক্রির প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। এর পাশাপাশি নতুন অনুসন্ধানে জানা গেছে, অভিজাত ও সুরক্ষিত জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পের ২ নম্বর সেক্টরে শহিদুল ইসলামের নামে ৫ কাঠার আবাসিক প্লট এবং ১৬ নম্বর সেক্টরে সাড়ে ৪ কাঠার আরও একটি মূল্যবান কমার্শিয়াল প্লটের সন্ধান মিলেছে। এছাড়া মেরুল বাড্ডা সংলগ্ন আফতাবনগর আবাসিক এলাকায় দুটি দামী প্লট এবং রামপুরার বনশ্রী আবাসিক এলাকায় নিজস্ব একটি বহুতল বাড়িসহ আরও তিনটি প্লটের অকাট্য তথ্য অনুসন্ধানকারীদের হাতে এসেছে।
তার পূর্বের দৃশ্যমান ও গোপন সম্পদের বিশাল সাম্রাজ্যের মধ্যে রয়েছে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার জি ব্লকে ১০০ কোটি টাকা মূল্যের 'শেল কবিতা' নামক ২০টি ফ্ল্যাটের পুরো ১০তলা ভবন এবং বাংলামোটরের স্বজন টাওয়ারের দুটি বাণিজ্যিক ফ্ল্যাট। এছাড়া শাহবাগ ও নিউমার্কেটের চার কোটি টাকার দোকান, মিরপুর আরামবাগ আবাসিক এলাকায় স্ত্রীর নামে থাকা ৩০ কোটি টাকার ভবন এবং চার শ্যালকের নামে কাগজে-কলমে হস্তান্তর করা ইস্টার্ন হাউজিংয়ের ২০টি ফ্ল্যাটও এই আমমোক্তারনামা জালিয়াতির মাধ্যমে বিক্রির তালিকায় রয়েছে। সাভারের মধুমতি মডেল টাউনের ৩৫ কাঠার রাজকীয় লাল ইটের বাংলোবাড়ি 'সেঁজুতি' এবং ৩২০ কাঠার পাঁচটি বিশাল বাণিজ্যিক প্লট ও খামার, যার বাজারমূল্য প্রায় ৯০ কোটি টাকা, সেগুলোও এই চক্রের মাধ্যমে নগদায়নের চেষ্টা চলছে। এমনকি রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্প, ডুমনি মৌজার পিংক সিটি, পিতলগঞ্জ, দিঘলিয়া, বাড়িয়াছনি ও গাজীপুরের কালিগঞ্জে থাকা শত বিঘা মূল্যবান জমিও এই পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে দেশের বড় বড় ডেভেলেপার কোম্পানির কাছে বিক্রি করে সেই টাকা হুন্ডির মাধ্যমে এশিয়ায় শহিদুলের কাছে পাঠানোর ছক চূড়ান্ত করা হয়েছে।
বর্তমানে দেশের বড় বড় গোয়েন্দা সংস্থা ও দুর্নীতি দমন কমিশন তার এই বিপুল সম্পদের ফাইল নিয়ে নাড়াচাড়া করলেও এখনো কোনো দৃশ্যমান আইনি নিষেধাজ্ঞা বা ক্রোকের আদেশ না আসায় সেই শৈথিল্যের পুরো সুযোগ নিচ্ছেন শহিদুল। এনবিআরের সাবেক এই শীর্ষ কর্মকর্তার এমন আন্তর্জাতিক জালিয়াতি, ব্যাকডেটেড পাওয়ার অব অ্যাটর্নি তৈরি এবং হুন্ডির মাধ্যমে দেশীয় সম্পদ বিদেশে বসে নগদায়ন করার এই নতুন কৌশল এখন দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমার বার্তা /জেএইচ

